ঝন্টুকে এফডিসির দারোয়ান বলেছিলেন, এইখানে কিয়ের লিগা আইছস?

দেলোয়ার জাহান ঝন্টু। চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক, গীতিকবি, সুরকার, চিত্রনাট্যকার, কাহিনিকার, চলচ্চিত্র সম্পাদক, চিত্রগ্রাহক, সংগীত পরিচালক এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা তিনি। সম্প্রতি এসেছিলেন দেশ রূপান্তরের প্রধান কার্যালয়ে। আড্ডার এক পর্যায়ে তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, আমরা জানি, ১৯৬৪ সালে আপনি প্রথম এফডিসিতে যান। তখন গিয়েছিলেন কোনো একটি ছবির শুটিং দেখতে। সেই গল্পটা সংক্ষেপে আমাদের বলবেন?

দেলোয়ার জাহান ঝন্টু বলেন, এফডিসির গেটে আসার পর দারোয়ান বলে এইখানে কিয়ের লিগা আইছস? যাহ্ ...! আমার বয়সটা বোঝেন? ১৯৬৫ সালে মেট্রিক দেই। এর মানে তখন পড়তাম ক্লাস টেনে। এরপর আমি সেইখান থিকা চইলা গেলাম। পরে লুকাইয়া লুকাইয়া আরেক জায়গা দিয়া এফডিসিতে ঢুকলাম। দেখলাম জহির রায়হানের একটা ছবির শুটিং হইতাছে। নামটা মনে নাই। ক্যামেরাম্যান ছিলেন সাধন রায়। সেই সময়ের একজন বিখ্যাত ক্যামেরাম্যান। তার অনেক ছাত্র আছে, যারা পরবর্তী সময়ে নাম কুড়িয়েছেন। যখন নায়করা শট দেবে, তখন লাইট মাপার জন্য একটা যন্ত্র নিয়া নাকের সামনে ধরে, মুখের সামনে ধরে। সামনে দাঁড়ানো একজন সহকারী ক্যামেরাম্যান। সহকারীদের তিনি বলতাছে ঐটা নিয়া আয়, ঐটা ব্যাক কর, টিল ডাউন, সফট সফট। এসব কথার কিছুই বুঝতেছি না। আমি ভাবতেছি, ঐটা দিয়া তিনি কী করতাছেন (দুই হাত এক করে দেখালেন)? এখন তো এসব বুঝি। 

দেখলাম সোলার, না না বেবি, লাইটের মধ্যে সবচেয়ে ছোট হইলো ‘বেবি’। ‘সোলার’ সেকেন্ড আর ‘পাঞ্জা’ সবার বড়। তো সেইটা সফট, হার্ড করতাছে (হাতের আঙুল ঘুরিয়ে দেখালেন)। এরপর তিনি জহির রায়হানের উদ্দেশে বললেন স্যার আমি রেডি, আপনি টেক করেন? আমি সেই লোককে বললাম, ভাই একটা কথা জিগাই? তিনি একটু উচ্চকণ্ঠে বললেন কী? আমি বললাম ঐ যে নাকের সামনে মেশিনটা ধরে, ঐইডা কী? তিনি ধমক দিয়ে বললেন ঐটা বুঝবি না। সর এইখান থিকা ঠিক এই ভাষায় বলল। তার ডায়ালগটা কিন্তু এখনো মনে আছে। এরপর তো ঢাকা থেকে কুমিল্লা চলে গেলাম। এরপর কুমিল্লা হাইস্কুল থেকে মেট্রিক দিলাম। আবার আমার মা বদলি হইয়া ঢাকায় আসলো। তিনি সেন্ট্রাল জেলের মেট্রন ছিলেন। এরপর তো চলে আসলো একাত্তর সাল। মার্চ মাসের ৭ তারিখে রেসকোর্স ময়দানে গেলাম বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনতে। মিছিলের পর মিছিল আসতাছে। আমার কাঁন্ধেও লাঠি। ভাষণ শুনলাম। রক্ত গরম হইয়া গেল। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুইনা রক্ত গরম হয় না, এই রকম মানুষ নাই। অবশ্য রাজাকার আর মুসলিম লীগ ছাড়া। এরপরই আমার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বেড়াতে গেলাম। শুনলাম ভৈরব পার হইয়া পাক আর্মিরা চইলা আসছে। আমরা ভাবলাম, আশুগঞ্জের পরই তো ব্রাহ্মণবাড়িয়া। আর্মি আসতে কতক্ষণ? তখন মা-বাবা আর শহরে থাকল না। সেখান থেকে ৩ মাইল দূরে, এক আত্মীয়ের গ্রামের বাড়িতে গেলাম। তারা আর কদিন রাখব আমাদের? সবাই এক রুমে বইসা ঝিমাই আর ঘুমাই। ৭-৮ দিন পর শুনলাম, পাক আর্মিরা ব্রাহ্মণবাড়িয়া তো আসছেই, এখন গ্রামেও আসব সরাইলের দিকে। 
এরপর সেইখান থিকা আমরা আরেক আত্মীয়ের বাড়িতে চইলা গেলাম। যাইতে যাইতে অনেক ভিতরে গেলাম। সেইখানে একটা গ্রাম আছে। নাম সাতগাঁও। (আঙুল দিয়ে দেখালেন) এই যে, এইটা সাতগাঁও আর ঐটা ভারত। বলতে গেলে এইটা নোম্যানস ল্যান্ড। যে বাড়িতে গেলাম, তার আশপাশে কোনো হাটবাজার নাই। ৩-৪ মাইল দূরে। একদম সীমান্ত, ভারতের জায়গাটার নাম বামুটিয়া। সেইখানে হাটবাজার আছে। সেখানে নিরাপত্তার কোনো বালাই নাই। সবাই সেখান থিকা বাজার করে। যখন শুনলাম, পাক আর্মিরা চইলা আসতেছে তখন মা-বাবা বলল তোমরা এইখান থিকা চইলা যাও। আমি, আমার ২ বড় ভাই, একজন সারোয়ার জাহান স্বাধীনতার পরে ক্যাপ্টেন হইছিলো আর সংগীত পরিচালক আনোয়ার জাহান নান্টু। আর ছোট ভাই ইফতেখার জাহান, সেও পরিচালক আর খালাত ভাই আতাউর রহমান টুনু আমরা চলে গেলাম আগরতলার দিকে। এরপর বর্ডার ক্রস করে বামুটিয়া বাজারে আসলাম। লোকজন তো শুধু আমাদের দিকে তাকায়। বলে আপনেরা কি হেইপার থিকা আইছেন? কই যাইবাইন? আমি বললাম যামু কই, জানি না। আগে আগরতলা টাউনে যাই। আগরতলার অধিকাংশ মানুষ কিন্তু ব্রাহ্মণবাড়িয়ার। এরপর তো অনেক ঘটনা...। সেখান থেকে আমরা কলেজটিলা গেলাম। পাহাড়ের অনেক ওপরে। সেটি আগরতলার সবচেয়ে বড় কলেজ। সেখানে দেখলাম, লোকে লোকারণ্য। কুমিল্লা আর ঢাকার পরিচিত অনেকের সঙ্গে দেখা হলো। সেখান থেকে অনেকেই চলে গেলাম দেরাদুনে ট্রেনিংয়ে । বেসিক ট্রেনিং নিলাম। 

আমরা গান বাজনাও জানতাম। সে কী যে দুর্বিষহ জীবন...! কোনোভাবে থেকে-খেয়ে বেঁচেছিলাম। একটা মজার ঘটনা আছে। একদিন ভারতীয় আর্মিরা জিপ দিয়া আমাদের নিয়া গেল- পাহাড়ের অনেক ওপরে। জায়গাটার নাম- ওমটি। সেখানে আমরা গান গাইব। মুক্তিযোদ্ধারা অনেক খুশি হইল। একসময় আমরা স্টেজে উঠলাম। অনেক গান হচ্ছে। সুজিত কুমার নামে একজন ছিলেন চট্টগ্রামের। মেহেদি হাসানের গান খুব ভালো গাইতেন। তিনি মেহেদি হাসানের একটি গান গাইছেন- মুঝে তুম নজর সে, দিরাতে রহো... এতটুকু গাওয়ার পরই ভারতীয় আর্মিরা ধমক দিয়ে গান থামালেন। বললেন- স্টপ, স্টপ দিস ননসেন্স। আমরা সবাই তো অবাক। ভাবলাম, এটা পাকিস্তানি মেহেদি হাসানের গান এই কারণে হয়তো উত্তেজিত হয়েছে। কিন্তু সবার উদ্দেশে সে হিন্দিতে একটি কথা বলল। (দেলোয়ার জাহান ঝন্টুও হিন্দিতে বললেন)। যার বাংলা হচ্ছে তোমরা এখানে এসেছো দেশ স্বাধীন করার জন্য। দেশ শত্রুমুক্ত করার জন্য। তোমরা সবাই বাংলাদেশি। এখানে কোনো উর্দু, হিন্দি গান হবে না। শুধু বাংলা গান হবে। রক্ত গরম হয়ে যায়, এইরকম গান গাও। দেশপ্রেম কাকে বলে ...! এভাবেই মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় পার করলাম।

বিস্তারিত পড়ুন এখানে