সাদা দালানের পাঁচতলা চিলেকোঠার ফাঁকে বসবাস করে এক চড়ুই পরিবার। পরিবারে চার সদস্য। বাবা ও মা। সঙ্গে তাদের দুই বাচ্চা। একটা ছেলে, আরেকটা মেয়ে। মেয়েটা ছোট। কাল সকালে সে বায়না ধরেছিল, নুডলস আর ওনথন খাবে।
বাবা বলেন, আচ্ছা দেখি কোথায় পাওয়া যায়। অপেক্ষা করো।
বাবা জানেন, এ জিনিস পাওয়া খুবই কঠিন। শুধু কঠিনই না, অনেকটা অসম্ভবও বটে। তবুও বাবা মুখের ওপর না করে দেন না। পরিবারের কেউ কিছু চাইলে সাধ্যমতো চেষ্টা করেন তা পূরণের। কিন্তু মেয়ের এ আবদার কীভাবে পূরণ করা যায় ভেবে পাচ্ছেন না বাবা চড়ুই। এসব খাবার তো অভিজাত খাবারের দোকানে খাওয়া হয়। ওসব খাবারের দোকানও থাকে সুরক্ষিত। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কালো গ্লাস লাগানো। উঁকি দিয়ে দেখার সুযোগ পর্যন্ত নেই।
এদিকে দুদিন গড়িয়ে তিন দিন হয়ে গেল, এখনো বাচ্চার আবদার পূরণ হলো না। চড়ুই বাচ্চাও কিছুতেই ভুলছে না। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। দুপুর থেকে অভিমান করে কিছু খাচ্ছে না। তার নুডলস আর ওনথন চাই-ই চাই।
বাবা চড়ুই খুব বেকায়দায় পড়ে গেলেন। আদরের বাচ্চা। মন খারাপ থাকলে কার ভালো লাগে? কিন্তু উপায় কী? কোনো কূলকিনারা পাচ্ছেন না বাবা চড়ুই।
মা চড়ুইকে বলেন, চলো দুজনে মিলে বাইরে ঘুরে দেখি। কিছু হয় কিনা।
মা চড়ুই বলল, শুধু শুধু চেষ্টা করে কোনো লাভ নেই। তোমার বাচ্চা যে জিনিসের আবদার করেছে তা কি পাওয়ার মতো জিনিস?
বাবা চড়ুই বলল, বাচ্চাটাকে দেখলে খুব মায়া হয়। সকাল থেকে কিছু খায়নি। চলো চেষ্টা করে দেখি। প্রতিদিন আমরা যে খাবার খেয়ে বেঁচে থাকি তার কোনোটিই তো আমরা উৎপাদন করি না। কোনো না কোনোভাবে পেয়ে যাই। স্রষ্টার ওপর ভরসা করে চলো চেষ্টা করি। বলেই বাবা ও মা চড়ুই উড়াল দিল।
বিকেলের পাকা রোদে উড়তে উড়তে ক্লান্ত হয়ে গেল দুজন। দেখতে পেল একটা দালানের ছাদে অনেক গাছ ও শেড দিয়ে সাজানো।
মা চড়ুই বলল, চলো এখানে একটু জিড়িয়ে নিই।
দুজনে একটা গাছের ওপর বসল। বাঁশগাছ। বড় টবে লাগানো। পাশের গাছে দেখতে পায়, এক জোড়া শালিক বসে আছে।
আরে কিছুদিন আগে ঝড়ের সময় বিপদে পড়া সেই শালিক জোড়া না? ‘চলো কাছে যাওয়া যাক।’ বলেই চড়ুই দুটি শালিকদের কাছে গেল। কুশল বিনিময়ের পর অনেক কথা হয়। জানতে পারে এ জায়গাটাকে বলা হয় রুফটপ রেস্টুরেন্ট। ছাদের ওপর গাছে ঘেরা খোলামেলা প্রাকৃতিক পরিবেশে সময় কাটানোর পাশাপাশি খাওয়া-দাওয়ার জন্য এটি তৈরি। এখানে এসে লোকজন দেশি-বিদেশি নানা পদের দামি দামি খাবার খায়। শালিকের কথা শুনে চড়ুই বাবা মায়ের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। বাচ্চার বায়না পূরণের সুযোগ আসছে বুঝি। সম্ভাবনার ধূসর আকাশে আলোর ঝিলিক উঁকি দেয়। শালিকের কাছে আরও জানতে পারে, এখানে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, বাটার নান, চিকেন তন্দুরি, ফিশ বল, কাটলেট, ফ্রাইড রাইস ইত্যাদি নানা রকমের খাবার খায় বেড়াতে আসা লোকজন। শালিকরা প্রায়ই এখানে আসে। লোকেরা যখন খাওয়া শেষে চলে যায়, টেবিলের নিচে পড়ে থাকা বিভিন্ন খাবারের উচ্ছিষ্ট মজা করে খেতে পারে। শালিকদের জিজ্ঞেস করে, এখানে ওনথন, নুডলস খায় না লোকেরা?
শালিক বলে, হ্যাঁ, মাঝে মাঝে খায়।
বলতে না বলতেই কয়েকজন লোক এসে বসল টেবিলে। ওয়েটার আসে খাবারের অর্ডার নিতে।
থাই স্যুপ, চিকেন চায়নিজ নুডলস, ওনথন, পুডিং অর্ডার করে তারা।
চড়ুই বাবা-মা দুজনে খুশিতে ডানা দিয়ে হাইফাই করে। দ্রুত চলে যায় নিজেদের বাসায়। বাচ্চা দুটো মোটামুটি ভালোই উড়তে শিখেছে। ওদের সঙ্গে করে নিয়ে আসে রুফটপ রেস্টুরেন্টে। পাশেই চুপটি করে বসে থাকে গাছের ফাঁকে। লোকগুলো খাওয়া শেষে চলে গেলেও বেশ অনেকক্ষণ ধরে ওয়েটার বা কেউ আসছে না।
চড়ুই বাবা বাচ্চাদের বলল, সবাই একসঙ্গে ওখানে যাওয়া যাবে না। তাহলে মানুষের নজরে পড়ে যাব। তোমরা এখানে থাক। বলেই উড়ে গিয়ে টেবিলে বসল।
প্লেটে এখনো বেশ পরিমাণে নুডলস ও ওনথনের অংশ পড়ে আছে। দ্রুত ঠোঁট দিয়ে নিয়ে গিয়ে দু’বাচ্চাকে খাওয়ায়। সঙ্গে মা চড়ুইও যোগ দিল।
দুজনে টেবিল থেকে ঠোঁটে করে নিয়ে বাচ্চাদের মুখে তুলে পরম আদরে নুডলস ও ওনথন খাওয়ালো। চড়ুই ছানারা খুশিতে নাচতে লাগল।