তিস্তা প্রকল্পে চীন আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারে

কূটনীতিক ও সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে অধ্যাপনার মধ্য দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। কাজ করেছেন জাতিসংঘে। সম্প্রতি ভারত সফর শেষে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর নিয়ে বেশ আলোচনা চলছে। একদিকে ভারতকে রেল ট্রানজিট সুবিধা প্রদান, অন্যদিকে তিস্তা প্রকল্পে চীন-ভারত উভয়ের আগ্রহ নিয়ে তৈরি হয়েছে বিতর্ক।  এসব বিষয় নিয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন অভিজ্ঞ এই কূটনীতিক।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদকীয় বিভাগের সাঈদ জুবেরী।

দেশ রূপান্তর : তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নে সহায়তার জন্য চীন ও ভারত উভয় দেশ প্রস্তাব দিয়েছে। অবশ্য প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘অবশ্যই আমি বিবেচনা করব কোন প্রস্তাবটা দেশের মানুষের কল্যাণে আসবে, আমি সেটাই করব।’ এই বিষয় নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

এম হুমায়ুন কবির : তিস্তাতে দুই দেশই তো আগ্রহ দেখিয়েছে। আগে চীনারা দেখিয়েছে, তারপরে ভারত দেখিয়েছে। এখানে কয়েকটা অপশন হতে পারে। একটা হচ্ছে যে, দুই দেশই তাদের প্রকল্প প্রস্তাবনা আমাদের সামনে উপস্থাপন করল। তখন মেরিট ব্যাসিসে মূল্যায়ন করে যাকে দেওয়া যায়। এটা আমি বলছি প্রফেশনালি যদি করা হয় তাহলে সেভাবে করা যেতে পারে। কিন্তু এখন এটা বুঝতে অসুবিধা নেই যে, এর মধ্যে খানিকটা রাজনীতিও ঢুকে পড়েছে। সেই কারণেই ভারত আমাদের প্রকল্পে আগ্রহ দেখাচ্ছে। একটা টেকনিক্যাল টিম পাঠানোর ব্যাপারে তো মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সফরের সময় দুই দেশ ঐকমত্যে পৌঁছেছে। কাজেই এখন আমার ধারণা যে চীনারা আগে আগ্রহ দেখালেও এক্ষেত্রে ভারত যেহেতু আগ্রহী হয়েছে এবং সেখানে টেকনিক্যাল টিম পাঠানোর মতো প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছে আমার ধারণা চীনারা হয়তো বা এখানে বেশিদূর এগোতে চাইবে না। কারণ তারা ভারতের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যাবে এটা আমি মনে করছি না। হতে পারে চীন এ ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারে। ভারত টেকনিক্যাল টিম পাঠাবে, তারা হয়তো একটা প্রস্তাবনা তৈরি করবে। কিন্তু সেখানে আর্থিক সংশ্লেষ কোথা থেকে আসবে সেটা তো আমরা এখনো জানি না। কাজেই যদি যথাযথ আর্থিক আয়োজন না করা যায় তাহলে হয়তো প্রজেক্টটা ঝুলে যেতে পারে। তবে সরকার কাকে  দেবে এটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।

দেশ রূপান্তর : তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে চীন সরকারের আর্থিক সহায়তায় সমীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু ভারতের আগ্রহ তৈরি হওয়ার পরে বিষয়টা একটু জটিল হলো। এক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কি যথাযথ কূটনৈতিক সক্ষমতার পরিচয় দিতে পারছে? ভারত তার চাওয়াগুলো যেভাবে আদায় করে নিচ্ছে, প্রশ্ন উঠেছে-  বাংলাদেশ তার বিনিময়ে কী পাচ্ছে?

এম হুমায়ুন কবির : এখানে দুটি বিষয়। একটা হচ্ছে পলিটিক্যাল উইল এবং পলিটিক্যাল অ্যাবিলিটি। আর ওদের সঙ্গে কূটনীতিকভাবে নেগোসিয়েশনের কাজটা করা। এখন এই দুই স্তরে যদি সমন্বয় না থাকে তাহলে আপনার দক্ষ কূটনীতিকরা থাকলেও তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তেই চলতে হয়। এসব ক্ষেত্রে যদি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রধান ভূমিকা পালন করে এবং সেই ক্ষেত্রে পেশাগত কূটনীতিকদের খুব একটা কাজ করার সুযোগ থাকে না। 

দেশ রূপান্তর : আপনি বলতে চাচ্ছেন যে আমাদের প্রফেশনাল জায়গায় কোনো ঘাটতি নেই কিন্তু রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে আমাদের নানা রকম পরিস্থিতি আছে। ব্যাপারটা কি সে রকম?

এম হুমায়ুন কবির : আসলে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের আলোকেই বা তার ভিত্তিতেই তো পেশাগত কূটনীতি কাজ করবে। এখন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বা পলিটিক্যাল উইলের ওপর ডিপেন্ড করে এবং পলিটিক্যাল উইল যদি ডিসাইড করে নেয় যে এই প্রকল্প একে দেব বা ওকে  দেব, সেখানে আপনার তো আর নেগোশিয়েট করার খুব জায়গা থাকে না।

দেশ রূপান্তর : একটা ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও বাস্তবতা আছে। আবার অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং স্বার্থের বিষয় রয়েছে। সেক্ষেত্রে কি বাংলাদেশ যথাযথভাবে ভূমিকা রাখতে পারছে? 

এম হুমায়ুন কবির : এখানে সক্ষমতার জায়গাটা তো আছে। দুটো ক্ষেত্রে সক্ষমতা লাগে। একটা হচ্ছে আর্থিক সক্ষমতা আর আরেকটা হচ্ছে প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা। ভারতের সঙ্গে আমাদের অভিজ্ঞতার বাস্তবতাটাই বলি, তারা ২০১০ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে আমাদের প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলারের লোন নানাভাবে দিয়েছে। কিন্তু আমরা এখনো পর্যন্ত, প্রায় ১৫ বছর হয়ে যাচ্ছে, আমরা উভয়ে মিলে এখনো ২ বিলিয়ন ডলারও খরচ করতে পারিনি। তার মানে হচ্ছে টাকা ব্যবহার এবং টাকা সংশ্লেষের ক্ষেত্রে দুটো কাজেই দক্ষতার ঘাটতি আছে বলে এই অবস্থায় মনে করা যেতে পারে। কাজেই এ রকম সিচুয়েশন যদি হয় তাহলে বুঝতেই পারছেন যে টাকা অ্যাভেইলেবল হলেই হবে না। এর জন্য যথাযথ প্রকল্প লাগবে, সেই প্রকল্প সময়মতো বাস্তবায়িত হতে হবে। তাহলে আপনি টাকাটা কাজে লাগাতে পারবেন। তা না হলে টাকা দেওয়া হলেও এবং প্রতিশ্রুতি দিয়েও আলটিমেটলি প্রকল্প বাস্তবায়নের সুফল যে আমরা পাই তা কিন্তু নয়। আরেকটা বিষয়, যে প্রকল্পই হোক না কেন সেটা উভয় দেশের স্বার্থের জন্য যেন উপাদেয় হয় এটা বাঞ্ছনীয়।

দেশ রূপান্তর : প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরে দুদেশের মধ্যে রেল কানেক্টিভিটি বা ট্রানজিটসহ দশটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়। এ নিয়ে কথা উঠলে, প্রধানমন্ত্রী ট্রানজিট দেওয়ায় কী ক্ষতি হচ্ছে প্রশ্ন করে বলেছেন, ‘আমাদের ট্রান্স-এশিয়ান হাইওয়ে, ট্রান্স-এশিয়ান রেলের সঙ্গে যুক্ত হতে হবে।’ কথা প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেছেন ‘ইউরোপের দিকে তাকান, সেখানে কোনো বর্ডারই নেই, কিছুই নেই।’ ভবিষ্যতে এই অঞ্চলের মানুষের অবাধ চলাচলের কোনো সম্ভাবনা কি দেখেন?

এম হুমায়ুন কবির : প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে মন্তব্য করা আমার ঠিক হবে না। কিন্তু আমি কন্টেক্সটের দিকে একটু দৃষ্টি দিতে চাই। আমরা দক্ষিণ এশিয়াতে, দক্ষিণ এশীয় ইউনিয়ন করার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলাম সার্কের আওতায়। সার্কের কাঠমান্ডু সম্মেলন হয়ে গেল, সেই সম্মেলনেও কিন্তু রেল যোগাযোগ এবং জ্বালানি পরিবহন ও লেনদেনের বিষয়টি শেষ পর্যন্ত আলোচনায় ছিল। কিন্তু সেটা আমরা বাস্তবায়ন করতে পারিনি। এখন আমরা যখন ইউরোপের কথা বলছি, ইউরোপের ২৭ দেশ মিলে কিন্তু সেটা বাস্তবায়ন করে ফেলেছে। তারপর আসেন বাংলাদেশ, চীন, ভারত ও মিয়ানমার ইকোনমিক করিডর (বিসিআইএম ইসি) প্রতিষ্ঠার বিষয়ে ১৫ সালে আমরা কাগজ সই করেছি। তারপরে প্রায় ৯ বছর ধরে তো আমরা একটুও এগোতে পারিনি। আরও একটা বলি, ২০০৪ সালে ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট হওয়ার প্রস্তাব গৃহীত হয় কিন্তু ২০ বছরেও আমরা সামনে এগোতে পারিনি। কাজেই এই দৃষ্টান্তগুলো আমাদের কাছে যে বাস্তবতাটা তৈরি করে সেটা হচ্ছে যে, আমরা যেভাবেই ব্যাখ্যা করি না কেন, এখানকার বাস্তবতাটা কিন্তু ইউরোপীয় বাস্তবতা নয়। দ্বিতীয় আরেকটা বিষয় উল্লেখ করা দরকার, বাংলাদেশের দিক থেকে এটার কৃতিত্ব মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিতে পারেন। সেটা হলো, বাংলাদেশ ২০১০ সালে মংলা এবং চট্টগ্রাম বন্দর উন্মুক্ত করার মধ্য দিয়ে দক্ষিণ এশিয়াতে একটা উন্মুক্ত আঞ্চলিকতার সূত্রপাত বা কাজ শুরু করেছে। এর পেছনে ফিলোসফিটা হচ্ছে যে, আমি অন্যদের জন্য আমার ইনফ্রাস্ট্রাকচার উন্মুক্ত করলাম, একইভাবে অন্যেরাও আমার জন্য তাদের পরিকাঠামো আছে সেটা উন্মুক্ত করবে। দক্ষিণ এশিয়াতে এই উন্মুক্ত আঞ্চলিকতার দর্শন কি গত ১৪ বছরে দেখতে পেরেছি? বাংলাদেশের সঙ্গে নেপালের বাণিজ্য হয়, ভুটানের বাণিজ্য হয়। বাংলাদেশি ট্রাক কি নেপাল বা ভুটানে পাঠাতে পারি? নেপালি ট্রাক কি বাংলাদেশে আসতে পারে? কাজেই আপনি জাস্টিফাই করার জন্য বলতে পারবেন অনেক কথা। কিন্তু এখানকার বাস্তবতাটা মনে রাখতে হবে। আমরা যা করছি সেটাকে জাস্টিফাই করে আপনি সমস্যার সমাধান করতে পারবেন না এবং মানুষের প্রশ্নের জবাবও কিন্তু আপনি দিতে পারবেন না।

দেশ রূপান্তর : আট বছর আগে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময় দুদেশের সম্পর্ক চিরাচরিত অর্থনৈতিক সম্পর্ক থেকে কৌশলগত সহযোগিতায় উত্তরণ হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এবারের বেইজিং সফরে চীন এ সম্পর্ককে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে ‘নিবিড় কৌশলগত অংশীদারত্বে’ রূপ দিতে চাচ্ছে। এটা একটু ব্যাখ্যা করেন।

এম হুমায়ুন কবির : এগুলোকে আপনি বলতে পারেন যে, শব্দ দিয়ে আসলে জিনিসটাকে আকর্ষণীয় করা। আসলে সম্পর্ক দুদেশের জন্য যখন উপাদেয় হবে, দুদেশের জন্য যদি সেটা কল্যাণজনক হয় এবং দুদেশের মানুষ যদি তাতে উপকৃত হয় তাহলে আপনি সম্পর্কটাকে স্ট্র্যাটেজিক বলেন, বা সুপার স্ট্র্যাটেজিক বলেন যেকোনো জায়গায় ব্যাখ্যা করতে পারবেন। কাজেই এই শব্দ কাঠামো দিয়ে কিন্তু সম্পর্ক বোঝা যায় না। কারণ, শব্দের চেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে; মানুষ তো আর জয়েন্ট স্টেটমেন্ট পড়ে না, সে দেখে যে এর সঙ্গে বন্ধুত্বের নিদর্শনটা কী আমার সাথে। যদি সেটা ইতিবাচক হয় তবে বোঝে যে হ্যাঁ, এর সঙ্গে সম্পর্ক করে আমার ভালো হয়েছে। আর যদি না হয় তবে মানুষের মুখে নানা রকম প্রশ্ন আসে। এটা আমদের কূটনীতিক যারা আছেন তারা আমরা বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করি, আকর্ষণীয় করার চেষ্টা করি। কিন্তু আমার কাছে যেটা প্রধান বিষয় হবে, যার সঙ্গেই করি সেটা যেন আমার দেশের জাতীয় স্বার্থটাকে রক্ষা করে উভয়পক্ষের জন্য উপাদেয় হয় এ রকম কাজই করা দরকার। চীনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ভালোই আছে, খারাপ তো দেখছি না। আমি উন্নয়নের যে অভিযাত্রায় আছি সেখানে আমরা বিভিন্ন রকম সহযোগিতা চাই। সেখানে চীন আমাকে সহায়তা দিচ্ছে, দেয়, এখনো দিচ্ছে হয়তো ভবিষ্যতেও আমরা নিতে পারব তাতে কোনো অসুবিধা নেই। এটাকে আমরা ওয়েলকাম জানাই।

দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের ব্যাপারে ভারতের এক রকম রিঅ্যাকশন দেখা যায়, কিন্তু চীন সে রকম অর্থে ভারতের ব্যাপারে রিঅ্যাকশন দেয় না। আবার বাংলাদেশও চীনের প্রশ্নে ভারতকে এক রকম প্রিভিলেজ দেয়, এমনটা মনে হয়। সব মিলিয়ে এই বিষয়টাকে কী মনে হয়? ভারতের তুলনায় বাংলাদেশে তো চীনের বিনিয়োগ অনেক বেশি...। সব মিলিয়ে বিষয়টি কি চেক অ্যান্ড ব্যালেন্সে আছে?

এম হুমায়ুন কবির : চেক অ্যান্ড ব্যালেন্সের জায়গায় যাব না। আমরা চেষ্টা করছি। বাংলাদেশে যে সরকারই থাকুক, সব সরকারই একই কাজ করছে। আমরা ভারতের সঙ্গে একটা কাঠামোর ভিত্তিতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বজায় রাখি, চীনের সঙ্গে আরেকটা কাঠামোর ভিত্তিতে সম্পর্ক রাখি। তবে সাম্প্রতিককালে যেহেতু এখানে ভূ-রাজনৈতিক বিবর্তন দ্রুত হচ্ছে এবং যেহেতু চীন এবং ভারতের মধ্যে একটা প্রতিদ্বন্দ্বিতা দৃশ্যমান হচ্ছে, সে কারণে দুপক্ষেরই একটা মনোযোগ আছে যাতে বাংলাদেশকে তারা নিজের পক্ষে পায় এবং সে চেষ্টাটা তারা করে। প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর যদি দেখেন, সেখানে কিন্তু মূল সুর ওই কৌশলগত। অর্থাৎ ভারত কৌশলগতভাবে দেখানোর চেষ্টা করছে যে বাংলাদেশ আমার পক্ষে আছে। এখন চীনারাও হয়তো সেই কাজ করতে পারে। চীনের যেসব বিষয় আছে সেগুলোতে বাংলাদেশের সমর্থন চাইতে পারে। কিন্তু আমি কি আসলেই ভারতকে সমর্থন করি বা চীনকে করি? আমি বলছি যে সরকার নিরপেক্ষ, সব সরকারের আমলেই এটা হয়; কিন্তু এখন বিষয়টা বেশি আলোচিত হচ্ছে। আমরা কিন্তু দুপক্ষের কোনো পক্ষেই যেতে আগ্রহী না এবং ওদের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জড়িয়ে ভুগতে আগ্রহী না। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ঢুকলে আমি বিপদগ্রস্ত হব এবং সেই লড়াইয়ের মধ্যে গিয়ে নিজেকে সামলানোর সেই সক্ষমতাও আমার নেই। কাজেই বাংলাদেশের দিক থেকে যে  ব্যালেন্সের কথা বলছিলেন সেই ব্যালেন্সেরও ক্ষমতা নেই। আমরা দ্বিপক্ষীয় ফ্রেমের মধ্যে বাংলাদেশ-ভারত, বাংলাদেশ-চীন ঐভাবে রেখে আমরা ডিল করব। তাদের মধ্যে যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আছে সেই সমীকরণে আমরা আদৌ ঢুকব না এবং তাতে ঢোকার আগ্রহ আছে বলে আমি মনেও করি না।

দেশ রূপান্তর : সব সরকারের সময়ে এক রকম প্রতিক্রিয়া আমরা দেখিনি। যেমন, এর আগে অন্য দল যখন ক্ষমতায় ছিল তখন তারা ভারতকে ট্রানজিট দেয়নি। তারা আবার তাইওয়ানকে এখানে ট্রেড সেন্টার করার অনুমোদন দিয়েছিল, যা নিয়ে কথা উঠেছিল। ফলে সব সরকার যে এক রকম প্রতিক্রিয়া দেখায়, তথ্য সেটা বলছে না। বরং এই সরকারকে ভারতের দিকে হেলে থাকার সমালোচনা সত্ত্বেও সব পক্ষের সঙ্গেই এক রকম কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যে আছে বলে মনে হচ্ছে। আপনি কী মনে করেন?

এম হুমায়ুন কবির : আসলে বাস্তবতাটা একটু ভিন্ন। যেমন ধরেন, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক তো এক জায়গায় দাঁড়িয়ে নেই, সম্পর্ক তো বিবর্তন হচ্ছে। কাজেই বিবর্তনের প্রেক্ষাপটে জিনিসগুলো দেখতে হবে। আবার আপনি ধরেন ১৯৯১ সালে বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল তখন বিএনপি বাংলাদেশের বাজার উন্মুক্ত করে ফর দ্য ফার্স্ট টাইম। তখন যে ট্রানজিটের যে ব্যাপারটার কথা উঠেছিল, সে সময় ভারতের অর্থনৈতিক সক্ষমতা এখনকার মতো ছিল না এবং বাংলাদেশের সক্ষমতাও অপেক্ষাকৃত কম ছিল। ফলে তার উভয়পক্ষেরই চাহিদা কম ছিল। কাজেই সেটা তখন হয়নি। তবে সিদ্ধান্ত যে ভুল হয় না, তা তো না। যেমন, ২০০৪-৫ সালে যখন মিয়ানমার থেকে গ্যাস আমদানির জন্য ভারত বলছিল তখন বাংলাদেশ যদি রাজি হতো তাহলে আমরা এত ক্ষতির মুখে পড়তাম না।

দেশ রূপান্তর : মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের যে সমস্যাগুলো আছে। আগে রোহিঙ্গারা এসেছে, এখন তো গুলি এসে পড়ছে। দেশটির সঙ্গে ভারত এবং চীন খুব নিবিড়ভাবে জড়িত আছে। এমন পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চ পর্যায়ের রাষ্ট্রীয় সফরে প্রসঙ্গটিকে কি যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে? 

এম হুমায়ুন কবির : মিয়ানমারে কী হচ্ছে এটা নিয়ে আমার ধারণা আলোচনা হয়েছে। কিন্তু আমরা যে ধরনের কূটনীতি করি, আমাদের কূটনীতি হচ্ছে গায়ে পড়লে আমরা কূটনীতি করি। এটাকে আমি বলব প্যাসিভ ডিপ্লোম্যাসি খুব একটা অ্যাক্টিভ ডিপ্লোম্যাসি না।

দেশ রূপান্তর : মিয়ানমার তো গায়ে এসে পড়েছে... নাকি গুলি আসার পরও বলা হবে গায়ে পড়েনি?

এম হুমায়ুন কবির : আমাদের যদি অবস্থান দেখেন, আমরা মিয়ানমারে কী হচ্ছে সেটার ব্যাপারে দূরে থাকার চেষ্টা করি। তাদের সৈন্য পালিয়ে এসেছে, আমরা তাদের আবার ফেরত দিয়ে দিচ্ছি। কিন্তু আমাদের এখানে যে ওদের ১০ লাখ লোক এসে পড়ে আছে তাদের ফেরত নেওয়ার প্রসঙ্গ ঝুলে আছে। কাজেই বাংলাদেশ নীতিগত কারণে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করছে। 

দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রকল্প ও অবকাঠামোতে চীনের এবং ভারতের অংশগ্রহণ আছে। দেখা যাচ্ছে, এর মধ্যে উপকূলীয় এলাকাতে চীনের উপস্থিতি বেশি, আবার সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে ভারতের উপস্থিতি এবং আগ্রহ বেশি। আপনার এ বিষয়ে কী পর্যবেক্ষণ?

এম হুমায়ুন কবির : আমি সে রকম মনে করছি না। ভারতের আগ্রহের জায়গা তাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, ফলে আমাদের উত্তরের জায়গাগুলোতে তাদের আগ্রহ। তো সেজন্য মোস্ট অফ দ্য প্রকল্প যদি দেখেন ভারতের শিলিগুড়ি বা চট্টগ্রাম থেকে খাগড়াছড়ির মধ্য দিয়ে নিয়ে যাওয়া, এদিকে আখাউড়া হয়ে আগরতলা যাওয়া। এখন যেটা দর্শনা থেকে হাঁসমারা এলাকা পর্যন্ত যাবে, এগুলো সবই তাদের প্রায়োরিটির অংশ। এখানে আমাদের চেয়ে তাদের ভূমিকা বেশি। অন্যদিকে, চীনারাও এখানে যেগুলো করছে সেটা আমাদের প্রয়োজনে করছে। এখন যেমন পায়রা বন্দর কেন্দ্র করে আরেকটা বড় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাবার জন্য সরকার চীনের কাছে সহায়তা চাইতে পারে। এটাও কিন্তু আমাদের ভেতরকার প্রয়োজন। কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে যেটা বলছি সেখানে তাদের সুবিধা বেশি, আমাদের সুবিধা কম। তবে, সেখানেও যে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য যে হয় না, তা না। কিন্তু কথা হচ্ছে সেই ব্যবসা-বাণিজ্যে আমাদের ঘাটতি আছে। ফলে সেখানে পুরো সুবিধা আমরা পাচ্ছি না। বলা হয় নেপাল-ভুটানে রেল সংযোগ পেলে ব্যবসা-বাণিজ্য অনেক হবে। আমার প্রশ্ন হচ্ছে আমরা কি অন্যদিক দিয়ে চিন্তা করি? ভুটান এবং নেপালের কিন্তু ভারতের সঙ্গে এফটিএ করা। কাজেই ভুটানের ৯৫% আর নেপালের ৮০% ট্রেড কিন্তু হয় ওইটা দিয়ে। তো আমার জন্য স্পেসটা কোথায় ওখানে? আমাদের সঙ্গে কি ওদের ফ্রি ট্রেড আছে? কাজেই এগুলো চিন্তার জায়গা। আমরা চোখে দেখছি আর বলে দিচ্ছি, সেটা না। একটু গভীরভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করতে হবে। তবেই আপনি বুঝতে পারবেন যে, কে সুবিধা পাবে আর কে পাবে না।

অনুলিখন : মোজাম্মেল হৃদয়