সিনেমাটোগ্রাফি পেশাকে কখনোই গ্লোরিফাই করা হয় না

বিজ্ঞাপন হোক কিংবা সিনেমা সব মাধ্যমেই নিপুণ হাতে সামলান ক্যামেরার কাজ। তার নৈপুণ্যে পর্দায় ফুটে ওঠে দারুণ সব দৃশ্য। বলছিলাম সিনেমাটোগ্রাফার তাহসিন রহমানের কথা, যিনি ইতিমধ্যেই ‘বলি’, ‘পেট কাটা ষ’ ও ‘সামথিং লাইক অ্যান অটোবায়োগ্রাফি’ করে দারুণ প্রশংসা কুড়িয়েছেন। তার সিনেমাটোগ্রাফিতে সদ্য মুক্তি পাওয়া ‘তুফান’ দেশ ও দেশের বাইরে রীতিমতো ঝড় তুলেছে। তার সঙ্গে কথা বলেছেন ইমরুল নূর

তুফানে যুক্ত হওয়া ও অভিজ্ঞতা

এই সিনেমাটিতে যুক্ত হওয়া মূলত রায়হান রাফির মাধ্যমেই। আমি চেয়েছিলাম আমাদের ওটিটিতে একসঙ্গে কাজ হোক কিন্তু সে জানাল, বড় পর্দাতেই হবে। এরপর ‘তুফান’-এর ঘোষণা এলো এবং রাফি চাইল আমি যেন এই প্রজেক্টটা করি। অভিজ্ঞতার কথা যদি বলি, সেটা এক কথায় চমৎকার। কারণ, ‘তুফান’ অনেক বড় স্কেলের সিনেমা, যেটা এর আগে আমাদের এখানে হয়নি এবং আমিও করিনি। বিজ্ঞাপনে বড় স্কেলের সেট নিয়ে কাজ করলেও সেটা এক কিংবা দুই দিনের কিন্তু এই সিনেমাটি ছিল প্রায় এক মাসের। প্রি-প্রোডাকশনে আমরা দেড় থেকে দুই মাসের মতো সময় দিয়েছি, এরপর লোকেশনে এক মাস। এরপর শুটিং। এখানে অনেক আর্টিস্ট ছিলেন, যার কারণে শিডিউল মেলাতে আমাদের খুব বেগ পোহাতে হয়েছে। ঈদে রিলিজ দিতে হবে এ রকম একটা চাপ তো ছিলই। সবকিছু মিলিয়ে ভালোভাবেই শেষ করতে পেরেছি।

সিনেমাটোগ্রাফারের চোখে শাকিব খান

তার সঙ্গে এটাই আমার প্রথম কাজ। একসঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতাও ছিল দারুণ। তিনি ভীষণ বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন অভিনেতা। তিনি জানেন কখন কোনটা করতে হবে বা কী করতে হবে কিংবা কীভাবে ডায়ালগ ডেলিভারি দিতে হবে। তাকে খুব বেশি গাইড করতে হয় না। তিনি প্রস্তুতি নিয়েই সেটে আসেন এবং পরিচালকের নির্দেশনানুযায়ী কাজ করেন। তার নিজস্ব কোনো মত থাকলে সেটা শেয়ার করেন, এটা এভাবে করা যায় কি না! সেটে প্রত্যেকটা শিল্পীকে যথেষ্ট সম্মান করেন এবং সবার সঙ্গে আলোচনা করে কাজটা কীভাবে ভালো করা যায় সেটা নিয়ে পরামর্শ করেন।

ভিশন ও চ্যালেঞ্জ

একজন সিনেমাটোগ্রাফারের ভিশন নির্ভর করে সে কী ধরনের প্রজেক্ট করছে তার ওপর। মূলত যে পরিচালক যেই ভিশনটা দেখে সিনেমাটোগ্রাফারের কাজ হচ্ছে, সেই ভিশনটাকে পর্দায় উপস্থাপন করা। এটা হচ্ছে প্রধান, তারপর ব্যক্তিগত কিছু ভিশন তো থাকেই একেকজনের।

আর চ্যালেঞ্জের বিষয়টা হচ্ছে, কীভাবে নিজের কাজকেই বেটার আউটপুট দিয়ে ছাড়িয়ে যাওয়া যায়। যেমন ‘বলি’তে কাজ করেছি কুয়াকাটায়। এ রকম রিমোট লোকেশনে কাজ করা ছিল এক ধরনের চ্যালেঞ্জ। তারপর করলাম ‘সামথিং লাইক অ্যান অটোবায়োগ্রাফি’ যেটা একদমই একটা পার্সোনাল প্রজেক্ট। এটার শুট হয়েছে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর বাসায়। এ কাজটা আমার জন্য একদম অন্যরকম একটা অভিজ্ঞতা বা চ্যালেঞ্জ ছিল।

পথ চলা

একজন সিনেমাটোগ্রাফারের যাত্রাটা শুরু হয় মূলত কলম ও কাগজ থেকে। এ বিষয়টা যতটা না ক্রিয়েটিভ, তার চেয়েও বড় বিষয় হচ্ছে এটার ব্যবস্থাপনা। ক্রুদের পরিচালনা করা, ম্যানেজমেন্ট, একটা সেট রান করা জানতে হয়। তারপর রয়েছে আইডিয়া ক্র্যাক করা, রিসার্চ করা এবং সমস্যার সমাধান। আমাদের দেশে অনেক ধরনের ইকুইপমেন্ট নেই, যার কারণে কাজের প্রয়োজনে আমাদের অনেক সময় অনেক কিছু ক্রিয়েট করতে হয়। আমার যাত্রা শুরু হয় ফটোগ্রাফি থেকে। যেহেতু ফটোগ্রাফি করতাম, আমার নজর থাকত ক্যামেরার দিকে। আমি যখন ২০০৮-০৯ সালে জানতামই না যে একজন সিনেমাটোগ্রাফারের কাজ কী! তখন মনে হতো, একজন পরিচালকই সব, যেটা সাধারণ দর্শকরাও মনে করেন, একজন পরিচালক বা প্রযোজকই সব। আমি যখন কাজ শুরু করি তখন বুঝতে পারলাম, পরিচালকই সব না। সিনেমাটোগ্রাফার হচ্ছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একজন, যিনি ক্যামেরার পেছনে থাকেন কিন্তু একটা সেটে কী হবে না হবে সেটার গুরুত্বপূর্ণ সব সিদ্ধান্ত দেন তিনি। যার কথা অনুযায়ী ক্যামেরা মুভমেন্ট, লাইট সেট, লুক সেট এমনকি কস্টিউম থেকে শুরু করে দেয়ালের রং সবকিছু যার সঙ্গে আলোচনা করে পরিচালক সিদ্ধান্ত দেন তিনি হচ্ছে সিনেমাটোগ্রাফার। আমি শুরুতে মোর্শেদ বিপুল ভাইয়ের থেকে কাজ শিখেছি। রাশেদ ভাই (আয়নাবাজির সিনেমাটোগ্রাফার), কামরুল হাসান খসরু (দেবী, হাওয়ার সিনেমাটোগ্রাফার) ভাইদের কাজ দেখা শুরু করি, তাদের স্টাইল ফলো করতে শুরু করি।

সিনেমাটোগ্রাফিতে তরুণদের অনাগ্রহ

তরুণরা এই পেশায় আসতে চায় না, তার মধ্যে একটা প্রধান কারণ হচ্ছে, এই পেশাটাকে কখনোই গ্লোরিফাই করা হয় না। আমাদের ভালো ভালো সিনেমাটোগ্রাফার আছেন কিন্তু তাদের সেভাবে মিডিয়া গ্লোরিফাই করে না। তাদের কোনো পোর্ট্রটে নেই বা তাদের সম্পর্কে সেভাবে কোনো কিছুই নেই। এটা না পাওয়ার কারণে সাধারণ মানুষ আসলে তাদের সম্পর্কে খুব একটা জানে না যে তারা আসলে কী করে বা কীভাবে কাজ করে। এটা আমরা ইন্ডাস্ট্রির মানুষরা জানি কিন্তু সাধারণ মানুষ জানে না। আরেকটা বিষয় হচ্ছে ফিল্ম নিয়ে পড়াশোনা। আমাদের এখানে তো ফিল্ম ইনস্টিটিউট নেই। এটা না থাকার কারণে আমরা জানি না যে কোনটা কার রোল বা কার কাজ। এজন্যই মূলত কেউ আসতে চায় না এই পেশায়। তরুণদের কাছে আমার পরামর্শ হতে পারে, বি অ্যা ফটোগ্রাফার ফার্স্ট অ্যান্ড থিংক অ্যাবাউট দ্য ফ্রেম।