পদ রক্ষা ও আটকানোর খেলা চলছে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ উত্তর ও দক্ষিণে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমান কমিটির শীর্ষ নেতারা নিজেরাই এ খেলার জন্ম দিয়েছেন। তাদের একটি অংশ কমিটির অন্য নেতাদের সঙ্গে প্রস্তাবিত কমিটি নিয়ে আলোচনা-পরামর্শ করেননি। গুরুত্ব দেওয়া হয়নি ঢাকার দলীয় সংসদ সদস্যদেরও। ফলে ঢাকার দুই কমিটির বর্তমান ও সাবেকদের একটি অংশ ঢাকা মহানগরের শীর্ষ নেতাদের বিরোধিতায় নেমেছে। সভাপতি-সাধারণ সম্পাদককে পদচ্যুত করে সম্মেলন আয়োজনের ধাক্কাধাক্কিতে নেমেছে। বিবদমান দুপক্ষই অদ্ভুত পরিস্থিতির জন্য একে অন্যকে দায়ী করছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত মাসে ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগের অধীন থানা ও ওয়ার্ডগুলোর প্রস্তাবিত খসড়া কমিটি কেন্দ্রে জমা দেওয়া। উত্তরের সভাপতি শেখ বজলুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক এসএম মান্নান কচি, দক্ষিণের সভাপতি আবু আহমেদ মন্নাফী ও সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির এসব খসড়া কমিটি জমা দেন।
উত্তরের ২৬টি থানা ও ৬৪টি ওয়ার্ড, দক্ষিণের ২৪টি থানা ও ৭৫টি ওয়ার্ডের প্রস্তাবিত কমিটি কেন্দ্রীয় দপ্তরে জমা দেওয়া হয়। প্রস্তাবিত কমিটিতে চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী, মাদক কারবারি, ফুটপাত-জমি দখল, ক্যাসিনোকাণ্ডে জড়িত ও হত্যা মামলার আসামিদের নাম এসেছে বলে দাবি তোলেন নগর আওয়ামী লীগের সাবেক ও বর্তমান নেতাদের একটি অংশ। বিপুল অর্থ লেনদেন হয়েছে বলেও তারা অভিযোগ করেছেন।
শুধু তাই নয়, নগর আওয়ামী লীগের দক্ষিণের প্রস্তাবিত কমিটিতে ওয়ারী থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদে একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীর নাম প্রস্তাব করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। বর্তমান নেতারা সাবেক নেতাদের অনুসারীদের বাদ দিয়েছেন এমন অভিযোগও পাওয়া গেছে। জমা পড়া প্রস্তাবিত কমিটিতে কে পদ পেয়েছেন, কে বাদ পড়েছেন তা জানাজানি হওয়ায় মহানগর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে সাবেক নেতারা বেশ তৎপর হয়ে উঠেছেন।
এ সম্পর্কে বর্তমান পদে থাকা মহানগর আওয়ামী লীগের চার শীর্ষ নেতাসহ অন্যান্য নেতা অভিন্ন ভাষায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রস্তাবিত কমিটি আটকে দিতে সাবেক নেতাদের একটি সিন্ডিকেট গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেনদেনের ব্যাপারে মিথ্যা অভিযোগ উত্থাপন করছেন। তারা বলেন, গণমাধ্যমে যারা কথা বলছেন, তারা সবাই মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক নেতাদের অনুসারী। ২০, ৪০ ও ৫০ লাখ টাকার বিনিময়ে প্রস্তাবিত কমিটিতে পদ কেনাবেচা হয়েছে এমন অভিযোগ গণমাধ্যমে উঠে এসেছে সাবেক নেতাদের ইন্ধনে।
চার শীর্ষ নেতাই লেনদেনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাদের দাবি, মহানগরের সাবেক কিছু নেতা ও তাদের অনুসারীরা লেনদেনের অভিযোগ এনে প্রস্তাবিত কমিটির পদ পাওয়া নেতাদের আটকাতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। তাই তাদের বিরুদ্ধে পদবাণিজ্যের অভিযোগ তোলা হয়েছে।
জানা গেছে, বিলুপ্ত সারুলিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি হাজি মোহাম্মদ আলী লিখিত অভিযোগে বলেছেন, ৬৭ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি পদে তার নাম প্রস্তাবের বিনিময়ে ২০ লাখ টাকা দাবি করেছেন মহানগর দক্ষিণের সভাপতি আবু আহমেদ মন্নাফী। কিন্তু তিনি টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় বিপুল অর্থের বিনিময়ে চিহ্নিত চাঁদাবাজ, পারিবারিকভাবে বিএনপির রাজনীতিতে সম্পৃক্ত এবং দক্ষিণ আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত জয়নাল আবেদিন হাজারীকে ওই পদে প্রস্তাব করা হয়েছে। বিপুল অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে মন্নাফী কদমতলী থানার সাধারণ সম্পাদক পদে ৪৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আকাশ কুমার ভৌমিক এবং যাত্রাবাড়ী থানার সাধারণ সম্পাদক পদে শান্ত নূর ওরফে শান্তর নাম প্রস্তাব করেছেন বলেও চাউর হয়েছে। শান্তর বিরুদ্ধে এলাকায় চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও ভূমিদস্যুতার অভিযোগ রয়েছে।
৪৮ নম্বর ওয়ার্ডের বিদায়ী সভাপতি গিয়াসউদ্দিন গেসুর অভিযোগ, তিনি আবারও একই পদে আসতে দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবিরকে নগদ ১৫ লাখ টাকা এবং দুটি দলীয় কর্মসূচিতে মাছ সরবরাহসহ আরও ৫ লাখ টাকা দিয়েছিলেন। এখন তার বদলে আরেকজনের নাম প্রস্তাব করায় ২০ লাখ টাকা ফেরত চান তিনি।
অভিযোগ আছে, দক্ষিণের ৪৯ নম্বর ওয়ার্ডে গাজী শামিমের কাছে ১৫ লাখ টাকা চাওয়া হয়েছে। তিনি মন্নাফীর হাতে ৩ লাখ টাকা দিয়েছেন। চাহিদামতো টাকা না পাওয়ায় প্রস্তাবিত কমিটিতে রাখা হয়নি তাকে।
তবে আবু আহমেদ মন্নাফী অভিযোগ অস্বীকার করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে কমিটি দেওয়া হয়েছে কেউ প্রমাণ করতে পারলে পদ থেকে ইস্তফা দেব।’
প্রস্তাবিত কমিটি নিয়ে আর্থিক বড় লেনদেনের অভিযোগ মিথ্যা দাবি করা হলেও কিছু অনিয়মের সত্যতা পাওয়া গেছে। মন্নাফীর ছোট ছেলে ইমতিয়াজ আহমেদ গৌরব ও হুমায়ুন কবিরের ভাই কাউন্সিলর হাজি মকবুল হোসেনের কিছু অনিয়মের চিত্র পাওয়া গেছে। মূলত আধিপত্য রাখতে গিয়ে মূলত বিতর্কিত হয়েছেন।
প্রস্তাবিত কমিটি নিয়ে পদবাণিজ্যের অডিও রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। একটি অডিওতে শোনা গেছে, মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ বজলুর রহমানকে ফোন করে দক্ষিণখান থানার ৪৭ নম্বর ওয়ার্ড নেতা আকবর আলী পদ পেতে ১০ লাখ টাকা দেওয়ার বিষয়ে কথা বলছেন। তবে শেখ বজলুর রহমানের দাবি, ভাইরাল হওয়া অডিও রেকর্ডটি খন্ডিত। দুই সেকেন্ডের মতো কথা বাদ দিয়ে এডিট করা হয়েছে। এ নিয়ে তিনি সাইবার সিকিউরিটি আইনে মামলা করবেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আসমান থেকে ফেরেশতা নামিয়ে এনে কমিটি করা হলেও তারা সেই ফেরেশতাকেও শয়তান বানিয়ে ফেলবে।’
প্রস্তাবিত কমিটির নিয়ে বর্তমান ও সাবেক নেতাদের অভিযোগ পাল্টা অভিযোগ নিয়ে দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কিছু অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে। তবে লাখ লাখ টাকা লেনদেনের খবরের সত্যতা খুব কমই পাওয়া গেছে।
পদ পাওয়া ও পদবঞ্চিত অন্তত ৩০ জন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দক্ষিণের সভাপতির ছেলে ও সাধারণ সম্পাদকের ভাই প্রস্তাবিত কমিটিতে হস্তক্ষেপ করে কিছু অনিয়ম করেছেন। খোঁজ নিয়ে আরও জানা গেছে, থানা ও ওয়ার্ড কমিটি নিয়ে ধাক্কাধাক্কির মূলে রয়েছেন মহানগরের বর্তমান দুই কমিটি বাতিল করে নতুন সম্মেলনের প্রত্যাশা করা বর্তমান ও সাবেক নেতাদের একটি অংশ। এরই অংশ হিসেবে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ বড় করে তুলে প্রস্তাবিত কমিটির নেতাদের পদ পাওয়া ঠেকাতে চান। মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক এ নেতারা তাদের অনুসারীদের স্থানীয় ইউনিটগুলোর প্রস্তাবিত কমিটিতে পদে রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন, এটিও তাদের ক্ষোভের কারণ।
প্রস্তাবিত কমিটি নিয়ে যেসব সাবেক নেতা উঠেপড়ে লেগেছেন, তারা হলেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ, বর্তমান কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন মহি ও সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কামাল হোসেন, দক্ষিণের ৪৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সাধারণ সম্পাদক গিয়াসউদ্দিন গেসু, শাহবাগ থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হামিদ খান, সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ মোশাররফ হেসেন, ১৯ নম্বর ওয়ার্ড কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সরোয়ার হোসেন, ১৩ নম্বর ওয়ার্ড সাবেক সাধারণ সম্পাদক জসীম উদ্দীন, ২০ নম্বর ওয়ার্ড সাবেক সভাপতি মনোয়ার হোসেন মনু, ৩২ নম্বর ওয়ার্ড সাবেক সাধারণ সম্পাদক নাঈম ও উত্তরের বর্তমান যুগ্ম সম্পাদক হাবিবুর রহমান হাবিব।
জানতে চাইলে মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি কেন নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলব। আমি তো সাবেক নেতা। এসব অভিযোগ আমাকে লজ্জিত করে।’
তবে শাহবাগ থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হামিদ খানের দাবি, ‘মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক টাকার লেনদেন করে প্রস্তাবিত কমিটিতে পদ দিয়েছেন এটা দিবালোকের মতো সত্য। আমাদের ইন্ধন দেওয়ার দরকার নেই।’
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন মহি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রস্তাবিত কমিটি জমা দিতে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক যেদিন আওয়ামী লীগ সভাপতি রাজনৈতিক কার্যালয়ে যান, সেদিন সেখানে অনিয়মের বিষয়টি কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে বলেছি। এর বাইরে কাউকে ইন্ধন দেওয়া, বিরুদ্ধে বলা কিছুই করিনি।’
২০২২ সালের অক্টোবরে মহানগরীর থানা-ওয়ার্ড সম্মেলনের এক বছর আট মাস পর প্রস্তাবিত কমিটি কেন্দ্রে জমা দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ বজলুর রহমান বলেন, ‘মহানগরের কমিটি ঘোষণা করলে প্রতিবারই কথা ওঠে। তবে আমাদেরও ভুলত্রুটি হতে পারে।’
অর্থের বিনিময়ে পদ দেওয়ার অভিযোগ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে অভিযোগও আছে, আবার অভিযোগটার বিরুদ্ধেও পাল্টা অভিযোগ আছে। আমার পেছনে হাবিব হাসান (উত্তরের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক) সাহেব কলকাঠি নেড়েছেন।’
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সভাপতি আবু আহমেদ মন্নাফী বলেন, ‘আর কী লিখবেন? আমি কত হাজার কোটি টাকা পেয়েছি, এটাই তো বলবেন? যেহেতু সাংবাদিকদের রাষ্ট্রে বাস করি। তাই যা ঘটেনি সেটাও বলা হয়।’
অভিযোগ তো আপনাদের নেতাকর্মীরাই করেছেন এর জবাবে মন্নাফী বলেন, ‘কারও স্বার্থ আছে। তাই কেউ না কেউ করাচ্ছে। হয়তো কেউ বঞ্চিত বা যাদের নামে প্রচুর পরিমাণে কলঙ্ক আছে। কত লোক আসছে আমি টাকা না নিয়ে ফিরিয়ে দিয়েছি, এটাও জানে কর্মীরা। গিয়াস নামে একজন আছে। হাবু-বাবু কাউন্সিলর আছে। ওরা আসতে পারেনি। তাই অভিযোগ। কিন্তু ওদের নামে তো অনেক অনেক অভিযোগ।’
ঢাকা মহানগরের থানা-ওয়ার্ড কমিটি নিয়ে অভিযোগ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কমিটি কেন্দ্রে জমা পড়েছে। এখন যাচাই-বাছাই করে বিতর্কমুক্ত কমিটি অনুমোদন দেবে কেন্দ্র।’
দলের আরেক সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বলেন, ‘আমাদের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে জিজ্ঞাসা করুন। আমি এসবের মধ্যে নেই।’