ফুটবল বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতাকে সবাই চেনেন। জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোজা বিশ্বকাপ আসরে ২৪ ম্যাচে ১৬ গোল করে নিজেকে অমর করে রেখেছেন। অথচ মাত্র দুটি বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে ১৪টি ম্যাচ খেলেই ১২ গোল করেছেন ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পে। বিশ্বকাপ ইতিহাসে তার চেয়ে বেশি গোল করা ফুটবলার আছেন মাত্র ৫ জন। ২০১৮ বিশ্বকাপের অভিষেক আসরেই মাত্র ১৯ বছর বয়সে হয়েছেন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। পরের বার গত আসরে খেলেছেন ফাইনালে। ২০১৮ আসরে ৪টির পর ২০২২ বিশ্বকাপে এমবাপ্পে বল জালে পাঠান তার দ্বিগুণ, ৮ বার। জিতে নেন গোল্ডেন বুট। অথচ ইউরোর এমবাপ্পেকে দেখে বোঝার উপায়ই নেই যে তিনি বিশ্বের সেরা ফরোয়ার্ডদের একজন। ইউরোর দুই আসর মিলিয়ে ৮ ম্যাচ খেলে ফেললেও এমবাপ্পে গোল করেছেন মোটে ১টি, সেটিও আবার এবারের আসরে পোল্যান্ডের বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে।
২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে ১৯ বছরের এমবাপ্পে প্রথম ম্যাচেই সুযোগ পেয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে শুরুর একাদশে। দ্বিতীয় ম্যাচে পেরুর বিপক্ষে তার করা গোলেই জয় পায় ফ্রান্স। ওটিই বিশ্বকাপ মঞ্চে এমবাপ্পের প্রথম গোল। একই সঙ্গে গড়েন বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ ফরাসি ফুটবলার হিসেবে গোলের কীর্তি। শেষ ষোলোয় আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ৪-৩ গোলের ঐতিহাসিক জয়ের ম্যাচে দুই পায়ে করেন জোড়া গোল। এর পর উরুগুয়ে ও বেলজিয়ামকে হারিয়ে ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে আবার বল জালে জড়ান তখনকার এ তরুণ। তাতে ফুটবল সম্রাট পেলের পর দ্বিতীয় কিশোর হিসেবে বিশ্বকাপ ফাইনালে গোল করার কীর্তি গড়েন এমবাপ্পে।
চ্যাম্পিয়ন হিসেবে ২০২২ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের ৩ ম্যাচেই করেন ৪ গোল। শেষ ষোলোয় পোল্যান্ডের জালেও দুইদফা বল পাঠান। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ ফাইনালে দেখান নিজের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক রূপ, করেন হ্যাটট্রিক। টাইব্রেকারে এমবাপ্পে ও ফ্রান্সকে রুখে দিয়েছিলেন এমি মার্তিনেজ। নয়তো পেলেকে টপকে বয়স ২৪ হওয়ার আগেই দুটি বিশ্বকাপ জেতা হয়ে যেত এখনকার ফরাসি অধিনায়কের। তবে বিশ্বকাপ গোলসংখ্যায় তিনি ছুঁয়েছেন ফুটবল সম্রাটকে।
অথচ বর্তমান ফুটবল বিশ্বের সেরা ফরোয়ার্ডদের একজন কিলিয়ান এমবাপ্পে ইউরো এলেই কেন যেন চুপসে যান। ২৫ বছর বয়সী এমবাপ্পে গত ২০২০ ইউরো থেকে ফ্রান্সের আক্রমণভাগ সামলে আসছেন। ওই মৌসুমে তিনি ম্যাচ খেলেন ৪টি। গ্রুপ পর্বে জার্মানি ও হাঙেরির বিপক্ষে বিবর্ণ থাকার পর পর্তুগালের বিপক্ষে একটি গোলে বল যোগান দেন। শেষ ষোলোর ম্যাচে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষেও পান আরেকটি অ্যাসিস্ট। কিন্তু গোলের দেখা পাননি কোনো ম্যাচে।
এবারের ইউরোতে প্রথম ম্যাচেই অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে নাক ভেঙে ফেলেন। তবুও মাঠে ছিলেন পুরোটা সময়। আত্মঘাতী গোলে ফ্রান্স জেতে ওই ম্যাচ। দ্বিতীয় ম্যাচে ডাচদের বিপক্ষে তাকে মাঠে নামাননি দেশম। গোলশূন্য ড্র হয় ওই ম্যাচ। পোল্যান্ডের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করা ম্যাচের ৫৬ মিনিটে পেনাল্টি থেকে ইউরো ক্যারিয়ারের প্রথম গোলের দেখা পান এমবাপ্পে। শেষ ষোলোর ম্যাচেও বেলজিয়ামের বিপক্ষে গোলখরা কাটাতে পারেননি ফ্রান্স অধিনায়ক। এ যাত্রায়ও ভারটঙ্গহানের আত্মঘাতী গোলে শিঁকে ছেড়ে ফ্রান্সের। ১-০ গোলে জয়ে ওঠে কোয়ার্টারে।
এখন পর্যন্ত ৪ ম্যাচে ৩৭৪ মিনিট মাঠে ছিলেন এমবাপ্পে। ২০ বার গোল করার সুযোগ পেলেও সফল হয়েছেন ওই একবারই, পেনাল্টি থেকে। রিয়াল মাদ্রিদে পাড়ি জমানোয় স্পেনই এখন দ্বিতীয় বাড়ি কিলিয়ান এমবাপ্পের। অধিনায়কের আর্মব্যান্ড পরে সেই স্পেনের বিপক্ষেই আজ রাতের ইউরো সেমিফাইনালে নিজের অপবাদ ঘোচানোর সুবর্ণ সুযোগ তার সামনে। ফ্রান্স কি পাবে বিশ্বকাপের এমবাপ্পেকে! নাকি ইউরোর ‘ফ্লপ’ এমবাপ্পে চেয়ে চেয়ে দেখবেন স্পেনের জয়োল্লাস। রাত ১টায় ম্যাচ শুরু ঘন্টা দেড়েক পরেই ফয়সালা হয়ে যাবে এ দ্বন্দ্বের।