পৃথিবীর সেরা কিছু প্রতিভা আমাদের আছে কিন্তু প্রতিভাই সবকিছু নয়: ব্রায়ান লারা

শামার জোসেফের বীরত্বে জানুয়ারিতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ঐতিহাসিক টেস্ট জয়ের পর আবেগে অশ্রুসজল হয়ে পড়েছিলেন ক্রিকেটের বরপুত্র ব্রায়ান লারা। অতীত দুঃখ ভুলে খুশিতে আত্মহারা লারা তখন বলে উঠেছিলেন, ‘তরুণ, অনভিজ্ঞ কিন্তু শেষ লিখে দিল। আজ ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের মাথা উচু করে দাঁড়াবার পালা, আজ ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের মাথা উচু করে দাঁড়াবার পালা।’ অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ২৭ বছরের শাপমোচনের খুশিতে ধারাভাষ্যকক্ষে চোখ থেকে আনন্দ অশ্রু ঝড়াতে ঝড়াতেই কথাগুলো বলছিলেন লারা।

আগামীকাল লর্ডসে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম টেস্ট খেলতে নামবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের একেবারেই আনকোড়া একটি টেস্ট দল। যে দলটিতে আছেন এমন দশজন ক্রিকেটার যাদের আন্তর্জাতিক টেস্ট খেলার অভিজ্ঞতা ১০ ম্যাচেরও কম। এ দলটি নিয়ে অবশ্য বেশ গর্বিত লারা। তার প্রত্যাশা, এই তরুণদের নিজস্ব স্টাইল এবারও কাজে আসবে।

ত্রিনিদাদের সন্তান ব্রায়ান লারা। তার জন্মের মাত্র ৭ বছর আগে ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীন হয় ত্রিনিদাদ ও টোবাগো। ইতিহাস তাই খুব গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেট বরপুত্রের কাছে। ছোট বয়সে ব্যাটের পাশাপাশি বইও সঙ্গী হয় তার। নিজের মাটির কিংবদন্তিদের সম্পর্কে জানেন। জর্জ হ্যাডলি, লিয়েরি কন্সট্যান্টাইন, বিখ্যাত ৩ ডব্লিউ- উইকস-ওয়ালকোট-ওয়ারেল, এবং অবশ্যই গ্যারফিল্ড সোবার্স। এমনভাবে লারা বেড়ে উঠেছেন যে প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড হলে বিষয়টি শুধু ক্রিকেটেই আটকে থাকতো না। লারার ভাষ্যে, ‘মাঠে এবং মাঠের বাইরে ইংল্যান্ডকে ঘিরে ইতিহাসের কমতি নেই। যখন এমন পরিস্থিতির সামনে আপনি পড়বেন এবং পুরনো লড়াইগুলোর স্মৃতি আপনাকে নাড়া দেবে আপনার সামনে সবকিছু পরিস্কার হয়ে যাবে। ইংল্যান্ডকে মোকাবেলা করতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের রঙের গুরুত্ব তখনই কেবল বোঝা যায়। আর আপনি মর্মে মর্মে অনুধাবন করবেন এটি শুধু ক্রিকেট নয়, তার চেয়ে একটু বেশি কিছু।’

এই ইংলিশদের বিপক্ষে উইলোবাজি করেই কিংবদন্তিতে পরিণত হন ব্রায়ান লারা। অ্যান্টিগার ১৯৯৪’র এপ্রিলে মাইক অ্যাথারটনের ইংল্যান্ড দলের বিপক্ষে গ্যারি সোবার্সের গড়া টেস্টে সর্বোচ্চ ইনিংসের রেকর্ড ভেঙে ৩৭৫ রান করেছিলেন তিনি। ইংল্যান্ডেই ওয়ারউইকশায়ারের হয়ে কাউন্টি খেলতে নেমে ডারহামের বিপক্ষে উপহার দেন ৫০১ রানের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সর্বোচ্চ ইনিংসে। ম্যাথু হেইডেন ৩৮০ রানের ইনিংস খেলার মাসছয়েক না পেরোতেই ২০০৪ এর এপ্রিলে সেন্ট জনসে একমাত্র ব্যাটসম্যান হিসেবে আন্তর্জাতিক টেস্টে কোয়াড্রিপল সেঞ্চুরি বা ৪০০ রান করেন। সেবার তার ব্যাটের আগুনে পুড়তে হয় মাইকেল ভনের ইংল্যান্ড দলকে। এ সব স্মৃতিই লারা তুলে ধরেছেন নতুন আত্মজীবনী ‘লারা: দ্যা ইংল্যান্ড ক্রোনিকলস’ এ।

ইতিহাস গড়া ৩৭৫ রানের ইনিংস খেলার পর ব্রায়ান লারা

লারা বলেন, ’১৫-২০ বছর ধরে বিশ্বের সেরা দলটি ছিল আমাদের। অন্যরা আমাদের কাছ থেকে শিখত। ক্রিকেটে ফিটনেসের গুরুত্ব তারা বুঝতে পেরেছে আমাদের দেখেই। ৭০ ও ৮০’র দশকে আমরাই সবচেয়ে ফিট দল ছিলাম। তারা প্রযুক্তি, কৌশল আর একাডেমি তৈরি করে নিজেদের খেলোয়াড়দের পর্যায় উন্নত করেছে। আমরাই শুধু আগের ধাঁচেই রয়ে গেছি। আশা করে গেছি আরেকজন ভিভ রিচার্ডস, আরেকজন কার্টলি অ্যামব্রোস আসবেন। কিন্তু এখনকার ক্রিকেট ওভাবে চলে না। আমি এখনো বিশ্বাস করি পৃথিবীর সেরা কিছু প্রতিভা আমাদের রয়েছে কিন্তু প্রতিভাই সবকিছু নয়।’

ইংল্যান্ডে তিন ম্যাচের সিরিজ খেলতে আসা ক্যারিবীয় দলটির বোলিং ইউনিটে শামার জোসেফ, আলজারি জোসেফ, জেডন সিলসদের ওপর পূর্ণ আস্থা আছে লারার। তিনি কমতি দেখছেন অনভিজ্ঞ ব্যাটিং লাইনআপে। লারা বলেন, ‘সবাই নিকোলাস পুরানকে, শাই হোপকে টেস্ট দলে দেখতে চায়, আমিও চাই। তবে আমাদের যা আছে তাই নিয়ে খেলতে হবে। আর আমাদের আছে একঝাঁক নবীন প্রতিভা যারা ওয়েস্ট ইন্ডিজকে প্রতিনিধিত্ব করতে চায়, যারা টেস্ট ক্রিকেটটা খেলতে চায়। আশা করি এই তরুণদের নিজস্ব ধরনটা বেরিয়ে আসবে এবং তারা সফল হবে।’

১৯২৮ সাল থেকে চলে আসা ‍দুদেশের এ সিরিজটির নাম রিচার্ডস বোথাম সিরিজ। ১৬৩টি টেস্ট খেলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ৫৯টিতে, ইংল্যান্ডের ৫১টিতে। তবে গত ২৪ বছরে মাত্র ৭টি টেস্টে জিতেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ আর হেরেছে ২৩টিতে।