কোটি টাকার গাড়ি যখন ভাঙাড়ি

ব্রিটিশ আমলে একটা চালু প্রবাদ ছিল ‘কোম্পানি কা মাল, দরিয়ামে ঢাল’। যেহেতু ব্রিটিশ শাসন শুরু করেছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং এ দেশের লোকদের দেখা হতো নেহাত উপনিবেশের প্রজার মতো। ফলে সরকারি পণ্যকে দেশীয়রা নিজেদের ভাবতে পারতেন না। দুর্ভাগ্যবশত, ইংরেজ বিতাড়িত হলো, মহান মুক্তিযুদ্ধে আমরা একটা স্বাধীন দেশ পেলাম, কিন্তু সরকারি সম্পদের প্রতি জনগণের অধিকার আর ভালোমন্দের ধারণা তেমন একটা পাল্টায়নি। নানা রকম আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আর কর্ম-অদক্ষতায় সরকারি সম্পদের বিপুল অপচয় যেন নিয়ম হয়ে পড়েছে। এর এক উদাহরণ দেখা গেল চট্টগ্রাম কাস্টমসে কোটি কোটি টাকার গাড়িকে ভাঙাড়িতে পরিণত করার ঘটনায়।

দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে জানা গেছে, চট্টগ্রাম কাস্টমসে বিদেশ থেকে বিভিন্ন সময় আসা গাড়ি বছরের পর বছর পড়ে থাকে। গাড়ির পর্যাপ্ত ডকুমেন্টস না থাকা কিংবা আমদানিকারক খালাস না নেওয়ার কারণে, কাস্টমস ছাড়পত্র না পাওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে বন্দরের ইয়ার্ডে পড়ে থাকায় এসব গাড়ি ব্যবহারের উপযোগিতা হারায়। দেখা গেছে, এসব গাড়ি জাহাজ কাটার যন্ত্র দিয়ে কেটে টুকরো টুকরো করা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই ৬০টি গাড়ি টুকরো টুকরো করে কাটা হয়েছে। এসব গাড়ি কাটা হয়ে গেলে টুকরোগুলো নিলামের মাধ্যমে বিক্রি হবে। শতকোটি টাকার গাড়ি বিক্রি হবে কেজির দরে। প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, চট্টগ্রাম কাস্টমসের নিলাম শেডে দেখা গেছে লোহার টুকরোর বিশাল স্তূপ। পাশেই চলছিল গ্যাস দিয়ে প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, ড্রাম ট্রাক, এসি বাস, পিকআপসহ বিভিন্ন ধরনের গাড়ি কাটার কাজ। শ্রমিকরা জানান, ২৫ জুন থেকে তারা এগুলো কাটার কাজ করছেন। ১৫ জুলাইয়ের মধ্যে কাটা শেষ হলে তারা শিপইয়ার্ডে চলে যাবেন।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের উপকমিশনার (নিলাম) সাইদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখানে ১০ থেকে ১৫ বছর আগের গাড়িও রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে আমদানিকারক গাড়িগুলো খালাস না নেওয়ায় এসব গাড়ি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। পরে কাস্টমসের নিলাম কমিটি (বিআরটিএ, পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিসসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধি) এই গাড়িগুলো স্ক্র্যাপ হিসেবে নিলামে বিক্রির অনুমোদন দেয়। এজন্য ১৮২টি গাড়ির মধ্যে বর্তমানে ৭৫টি গাড়ি কাটা হচ্ছে। বাকি গাড়িগুলোও পর্যায়ক্রমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ কিন্তু আরও আগে উদ্যোগ নিলে এগুলো স্ক্র্যাপ না করে ব্যবহারযোগ্য হিসেবে নিলামে বিক্রি করা যেত বলে দাবি করে বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিক্যালস ইমপোর্টার্স অ্যান্ড ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বারবিডা)। সংগঠনটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল হক চৌধুরী বাবর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই গাড়িগুলো এত বছর বন্দরের ইয়ার্ডে না রেখে নির্ধারিত সময়ের পর নিলামের উদ্যোগ নিলে দেশের রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত হতো না। তখন আমদানিকারকরা নিলামের মাধ্যমে কাস্টমস আইনের আওতায় এগুলো কিনে ব্যবহার করতে পারতেন।’ কাস্টমস বিডার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ইয়াকুব চৌধুরী বলেন, ‘এই ৭৫টি গাড়ি যথাসময়ে নিলাম করা গেলে প্রায় দুই কোটি টাকা রাজস্ব পেত সরকার। এখন কেজির দরে নিলামে বিক্রি করতে হবে।’

কাস্টমস কর্র্তৃপক্ষ দাবি করছে, এই গাড়িগুলো এবং এদের যন্ত্রাংশ ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় তারা নিলাম না করে এগুলো ধ্বংস করে দিচ্ছেন। তবে এই অনুপযোগী হওয়ার দায় কর্র্তৃপক্ষ কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। কাস্টমসের আইন অনুসারে কোনো পণ্য বন্দরে অবতরণের ৩০ দিনের মধ্যে আমদানিকারক ডেলিভারি না নিলে কর্র্তৃপক্ষ তা নিলাম করতে পারে। কিন্তু আইনি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার সঙ্গে কর্র্তৃপক্ষের উদাসীনতা যুক্ত হয়ে এসব পণ্য দিনের পর দিন পড়ে থেকে নষ্ট হয়। একদিকে কাস্টমস ইয়ার্ডের জায়গা এসব জিনিসে দখল হয়ে থাকে, উপরন্তু সরকার বঞ্চিত হয় কোটি কোটি টাকার আয় থেকে। এ অবস্থা কোনোভাবেই কাম্য নয়।