কাগজপত্র প্রিন্ট করার জন্য একেকটি লেজার প্রিন্টার ১৫ লাখ ৫৯ হাজার টাকা দিয়ে কিনেছে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি)। অথচ বাজারে একই মানের প্রিন্টারের দাম সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। একইভাবে রাউটার, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, স্লিপ প্রিন্টার, এসিসহ বিভিন্ন পণ্য বাজার দরের চেয়ে কেনা হয়েছে অনেক বেশি দামে। এসব মালপত্র বিভিন্ন পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে সরবরাহ ও স্থাপন করেছে বিদ্যুৎ বিতরণকারী রাষ্ট্রীয় সংস্থাটি।
‘প্রি-পেমেন্ট ই-মিটারিং ইন ঢাকা ডিভিশন আন্ডার রুরাল ইলেকট্রিফিকেশন প্রোগ্রাম (ফেইজ-১)’ নামে একটি প্রকল্পের আওতায় ১১টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জন্য এসব মালপত্র কিনেছে আরইবি। এর মধ্যে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ওয়েশন গ্রুপ লিমিটেড (ডব্লিউজিএল) পাঁচটি এবং হেক্সিং ইলেকট্রিক্যাল কোম্পানি লিমিটেড (এইচইএল) ছয়টি সমিতিতে মালপত্র সরবরাহ করেছে। একই প্রকল্পের আওতায় একই কাজের জন্য দুই ধাপে এসব মালপত্র কেনা হলেও প্রতিষ্ঠান দুটির দামের ক্ষেত্রে রয়েছে বিশাল পার্থক্য।
দেশের ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জন্য আরইবি বিভিন্ন সময়ে যেসব মালপত্র কিনে থাকে, সেগুলোর সব তথ্য যাচাই করলে বিপুল পরিমাণ অনিয়ম দুর্নীতির চিত্র উঠে আসবে বলে অভিযোগ করেছেন আরইবির অন্তত তিনজন কর্মকর্তা।
যোগাযোগ করা হলে আরইবির চেয়ারম্যান অজয় কুমার চক্রবর্তী দেশ রূপান্তরকে বলেন, তিনি একটা জরুরি মিটিংয়ে আছেন। আরইবির সদস্য (বিতরণ ও পরিচালন) দেবাশীষ চক্রবর্তীর সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি।
এ বিষয়ে দেবাশীষ চক্রবর্তী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি অন্য সেকশনের। তাই বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে খোঁজ নিয়ে দেখব।’
১১টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মধ্যে ছয়টি সমিতিতে মালপত্র সরবরাহের মূল্যতালিকা দেশ রূপান্তরের হাতে এসেছে। এর মধ্যে তিনটি সমিতিতে ডব্লিউজিএল ৫০টি এইচপি ব্র্যান্ডের ডেস্কটপ কম্পিউটার (কোর আই ফাইভ) সরবরাহ করেছে। প্রতিটি কম্পিউটারের দাম ৫ লাখ ৭২ হাজার ৮৬২ টাকা হিসাবে মোট ২ কোটি ৮৬ লাখ ৪৩ হাজার টাকা নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। অথচ বাজারে ওই মানের একটি কম্পিউটারের দাম ৬০-৬৫ হাজার টাকা। অন্যদিকে একই প্রকল্পে এইচইএল তিনটি সমিতিতে ৪০টি একই ধরনের কম্পিউটার সরবরাহ করেছে মাত্র ৫৭ হাজার টাকা করে। যার মোট মূল্য ২২ লাখ ৮০ হাজার টাকা।
বিল পরিশোধের পর গ্রাহককে রসিদ দেওয়ার জন্য বেশ কয়েকটি প্রিন্টার কিনেছে আরইবি। এর মধ্যে ডব্লিউজিএল তিনটি সমিতিতে ৬১টি প্রিন্টার সরবরাহ করেছে প্রায় ১ কোটি ১২ লাখ ৮০ হাজার টাকায়। প্রতিটি প্রিন্টারের দাম পড়েছে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৯০৯ টাকা। অথচ বাজারে মানভেদে এ ধরনের প্রিন্টারের দাম ১৫ হাজার থেকে ৩২ হাজার টাকা। তিনটি সমিতিতে ৪০টি প্রিন্টার সরবরাহ করেছে এইচইএল। তাদের প্রতিটি স্লিপ প্রিন্টারের দাম মাত্র ১৬ হাজার ৩৭০ টাকা।
২৫টি লেজার প্রিন্টার সরবরাহ করেছে ডব্লিউজিএল। প্রতিটির দাম ধরা হয়েছে ১৫ লাখ ৫৯ হাজার টাকা। যার বাজারমূল্য মানভেদে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। অন্যদিকে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা করে ২০টি লেজার প্রিন্টার সরবরাহ করেছে এইচইএল।
২৫টি নেটওয়ার্ক রাউটার সরবরাহ করে ১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা নিয়েছে ডব্লিউজিএল। প্রতিটি রাউটারের দাম পড়েছে ৫ লাখ ৮০ হাজার টাকা। একই ধরনের ২০টি রাউটার সরবরাহ করেছে এইচইএল। প্রতিটির মূল্য নিয়েছে ৩৫ হাজার ৩৯৫ টাকা। এর বাজারমূল্য মানভেদে ৩০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৬০ হাজার টাকা।
এইচপি ব্র্যান্ডের একেকটি ল্যাপটপের দাম (কোর আই ফাইভ, ১৫ ইঞ্চি) প্রায় ৪ লাখ ৮৬ হাজার টাকা নিয়েছে ডব্লিউজিএল। অথচ জেনুইন অপারেটিং সিস্টেমসহ এই মানের ল্যাপটপের বাজারমূল্য ৯০-৯৫ হাজার টাকা। আর এইচইএল সরবরাহ করেছে ১ লাখ ১ হাজার ৭৬১ টাকা করে ৩৮টি ল্যাপটপ।
অন্যদিকে ডব্লিউজিএল দেড় টনের গ্রি ব্র্যান্ডের ২৯টি এসি সরবরাহ করে দাম নিয়েছে ১ লাখ ৭ হাজার টাকা করে। প্রকৃতপক্ষে এর বাজারমূল্য ৬৫-৭০ হাজার টাকা। তবে অন্যান্য ব্র্যান্ডের দেড় টনের এসির দাম এর প্রায় অর্ধেক। এইচইএল ২০টি এসি সরবরাহ করে প্রতিটির দাম নিয়েছে ৩৬ হাজার ৮০০ টাকা।
এসব মালামাল কেনায় ‘শুভংকরের ফাঁকির’ কৌশল হিসেবে প্রতিটি পণ্যের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার সরবরাহের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কম্পিউটারের সঙ্গে উইনডোজ অপারেটিং সিস্টেমের একটি নিবন্ধনকৃত সফটওয়্যার সরবরাহ করা হয়েছে। কিন্তু যে ব্র্যান্ডের কম্পিউটারটি কেনা হয়েছে তাতে প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান নিবন্ধনকৃত ওই সফটওয়্যার ফ্রি দিয়ে থাকে। একইভাবে স্লিপ প্রিন্টার, রাউটার এবং লেজার প্রিন্টারের সঙ্গে সফটওয়্যার কেনা বাবদ ব্যয় দেখানো হলেও বাস্তবে সেখানে যে সফটওয়্যার ব্যবহার হয়, তাও প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ফ্রি সরবরাহ করে।
প্রকল্পের পরিচালক ছিলেন আরইবির বর্তমান পরিচালক (কারিগরি) মো. রফিকুল ইসলাম। গতকাল দুপুরে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দরপত্রের মাধ্যমে মালপত্রগুলো কেনা হয়েছে, যেখানে অনেক বেশি প্রতিযোগিতা হয়েছিল। এখানে কিছু আইটেমের দাম বেশি মনে হলেও কোনো কোনো আইটেমের দাম বাজারদরের চেয়ে অনেক কম। যেমন একটা মিটার স্থাপন করতে ন্যূনতম ৩০০ টাকা দরকার। কিন্তু এখানে ঠিকাদার এই কাজটি মাত্র সাড়ে ৪ থেকে সাড়ে ৫ টাকায় করেছে। যথাযথ নিয়ম মেনে সব আইটেম মিলে সর্বনিম্ন দরদাতাকেই কাজ দেওয়া হয়েছে। এখানে কোনো ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতি হয়নি।’
তবে সরবরাহকারী দুটি প্রতিষ্ঠানের দাম পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ডব্লিউজিএলের পণ্যের দাম এইচইএলের চেয়ে অনেক বেশি। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে এইচইএলের দাম বেশি হলেও সেটা বাজারমূল্যের কাছাকাছি। যেমন ডব্লিউজিএলের সিঙ্গেল ফেজ ও থ্রি ফেজ মিটারের দাম যথাক্রমে ২ হাজার ২৯৬ এবং ৯ হাজার ৭৯৯ টাকা। অন্যদিকে এইচইএলের সরবরাহ করা মিটারের দাম যথাক্রমে ২ হাজার ৫৭৪ এবং ১১ হাজার ৫২ টাকা। আবার মিটার স্থাপনে এইচইএল মিটারপ্রতি ৫৬ থেকে ১৬০ টাকা পর্যন্ত নিয়েছে। অন্যদিকে ডব্লিউজিএল নিয়েছে ৪ দশমিক ২৬ থেকে ৫ দশমিক ৪৬ টাকা।
তবে এত কম দরে মিটার স্থাপন বাস্তবে কখনোই সম্ভব ছিল না। এর পেছনে অসৎ উদ্দেশ্য আছে বলে অনেকে মনে করেন।
আবার তিনটি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মীদের প্রশিক্ষণ বাবদ ডব্লিউজিএল নিয়েছে ২৮ লাখ ৩২ হাজার টাকা। অন্যদিকে এই প্রশিক্ষণ বাবদ এইচইএল মাত্র ১ লাখ ৯২ হাজার টাকা নিয়েছে। অন্যদিকে আরইবির কার্যালয়ে নেটওয়ার্কিংয়ের জন্য এইচইএলকে ২ লাখ ১৩ হাজার টাকা দেওয়া হয়। আর ডব্লিউজিএলকে দিতে হয়েছে ৫৮ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। তবে এসব কাজের প্রকৃত দর কত, তা জানতে পারেনি দেশ রূপান্তর।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ‘আইটেম ওয়াইজ’ দর এবং গুণগত মান যাচাই করে ন্যায্য মানদন্ডের ভিত্তিতে সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজ দেওয়াই হলো দেশের আইনি বিধান। সামগ্রিকভাবে যার দর কম তাকে কাজ দিতে হবে এমন কোনো বিধান আইনে নেই। প্রকল্প পরিচালক এটা করতে পারেন না। এখন তারা নিজেদের মতো ব্যাখ্যা দিলে তো হবে না। এটা চরম অযৌক্তিক ও অন্যায়।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ তথ্য যদি সঠিক হয়, তাহলে এটা পুকুর চুরি নয় বরং সাগর চুরি। পণ্যের প্রকৃত বাজার মূল্যের সঙ্গে আরইবির কেনাকাটায় যে বিশাল তারতম্য, তাতে রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাৎ করা হয়েছে এখানে। দরপত্র প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িতদের যোগসাজশ ছাড়া এটা করা অসম্ভব। সঠিক তদন্তের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় এনে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’
তিনি বলেন, ‘যে প্রক্রিয়ায় সর্বনিম্নদাতাকে কাজ দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে সেই দরপ্রক্রিয়াটিই প্রশ্নবিদ্ধ। দরপত্রের সঙ্গে যারা যুক্ত, তাদের স্বার্থ জড়িত এখানে। বাজারদর যাচাই না করে তারা কেন এটা গ্রহণ করলেন? ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের জন্য এক ধরনের যোগসাজশে এ ধরনের দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। তবে দরপত্র প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িতদের চেয়ে বেশি দায়ী প্রতিষ্ঠানটির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা দরকার।’
২০০৫ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত আরইবির দরপত্র মূল্যয়ন কমিটির একজন সদস্য অধ্যাপক ড. আব্দুল মান্নান দেশ রূপান্তরকে বলেন, দুর্নীতি রোধ করে জনগণের অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রেগুলেশন-৩-এর আওতায় প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ন্যায্যমূল্যে মানসম্মত পণ্য কেনার বিধান রয়েছে। কোনো দরদাতা কোনো পণ্যের দাম বাজারদরের চেয়ে অনেক কম বা বেশি দিলে তিনি অযোগ্য বিবেচিত হবেন। কারণ তার ওই পণ্যের সম্পর্কে ধারণা নেই। পাশাপাশি এ দুই ক্ষেত্রেই দরদাতা এবং দরপত্র প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িতদের অসৎ উদ্দেশ্য থাকে। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে আইন এবং বিধি পরিবর্তনের মাধ্যমে কিছু ফাঁকফোকর সৃষ্টির ফলে দরপত্র প্রক্রিয়ার প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যর্থ দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পটি ২০১৯ সালে শেষ হয়। তখন এসব মালপত্রের দাম আরও কম ছিল। কারণ তখন ডলারের সঙ্গে টাকার বিনিময়মূল্য ছিল ৮৪, যা এখন ১১৮ টাকা।
প্রকল্পটির আওতায় ছয়টি সমিতির জন্য মালপত্র কেনা ও স্থাপন এবং প্রশিক্ষণ বাবদ ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৫৬ কোটি টাকা। যার মধ্যে তিনটি সমিতির জন্য ১০১ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এ অর্থ সমিতিগুলোকে সুদসহ আরইবিকে পরিশোধ করতে হবে। অথচ এসব মালপত্র কেনাকাটার সব প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন করেছে আরইবি। সব কাজ শেষে বিভিন্ন সমিতি এসব মালপত্র বুঝে নিয়েছে আরইবির নির্দেশে।