কাস্টমসে ফলের নিলাম

প্রায় আড়াই কোটি টাকায় ২৮২ টন ফল বিক্রি

নিলাম বোর্ডের সামনে প্রায় ৭৫ জন বিডার (যারা দর হাঁকান) একের পর এক দর হাঁকাচ্ছেন। তারা ৫০ হাজার দিয়ে ডাক শুরু করলেও সর্বশেষ দর ১৫ লাখ ৬৫ হাজারে যেতে ১৬৭ বার ডাকতে হয় বিডারদের। একটি দর থেকে আরেক দরে যেতে ৫ হাজার করে বাড়িয়েছেন তারা। আর এভাবেই গত তিন দিন ধরে চলমান কাস্টমস নিলাম শেডে থাকা ৬ কোটি ৩৯ লাখ টাকা মূল্যের ২৮২ মেট্রিক টন আপেল, কমলা ও খেঁজুরের নিলাম করে পাওয়া গেছে ২ কোটি ৩২ লাখ ২০ হাজার টাকা।  

২৩ হাজার ৪৬২ কেজি কমলার একটি লটের ভিত্তিমূল্য ৪০ লাখ ৭৬ হাজার ১৫৪ টাকা নির্ধারণ করেছে চট্টগ্রাম কাস্টমের নিলাম কমিটি। ৫০ হাজার টাকা দিয়ে শুরু হওয়া এই পণ্যের ডাক ৫ হাজার করে বাড়াচ্ছে বিডাররা। এভাবে ১৬৭ বার ডাকার পর যখন তা ১৫ লাখ ৬৫ হাজারে গিয়ে ঠেকেছে। পরবর্তীতে আর কেউ ডাকবে কিনা জানতে চাইলেও কেউ আর ডাকছে না। শুধু মিশরীয় এই কমলার লটের ক্ষেত্রেই নয়, আপেল ও খেঁজুরসহ প্রায় সব পণ্যের নিলামেই এভাবেই দর হাঁকান বিডাররা। চট্টগ্রাম কাস্টমস নিলাম শাখায় কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোরশেদ নিলামটি পরিচালনা করছেন। 

তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা দাম দ্রুত বাড়িয়ে হাকালেই পারে। কিন্তু তারা তা করেন না। যদি করতো তাহলে নিলাম কার্যক্রম দ্রুত শেষ হতো।’

বিডাররা তা করেন না কেন জানতে চাইলে মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম নামের একজন বিডার বলেন, ‘নিলামের নিয়মই হলো কম কম করে দর বাড়ানো। যেহেতু এখানে প্রতিদ্বন্দ্বী রয়েছে তাই আমরা বেশি দর ডাক দেই না। ধীরে ধীরে দাম বাড়ানো হতে থাকে।’

কিন্তু নিলামে পণ্যের মালিকানা পেলেও তারা এখনই পণ্য পাচ্ছে না। নিলাম স্পটেই পেঅর্ডার হিসেবে জমা দিতে হচ্ছে সর্বোচ্চ মূল্যের ২০ শতাংশ অর্থ। নিলাম ডাকে পণ্যের মালিকানা কাগজে কলমে পেলেও বাস্তবে এসব পণ্য পেতে আরো প্রায় ১৫ দিন সময় লাগতে পারে। 

এ বিষয়ে কাস্টমস নিলাম শাখার উপ-কমিশনার সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘বিধি অনুযায়ী বন্দরের রেফার কনটেইনার ( ফ্রিজার কনটেইনার) থাকা এসব পণ্য উদ্ভিদ সংঘ নিরোধ কেন্দ্র ও আনবিক শক্তি কমিশন থেকে ব্যবহার উপযোগী সনদ লাগবে। আর এসব সনদ পেতে অফিসিয়াল নিয়ম অনুযায়ী প্রায় ১০ দিনের বেশি লেগে যায়।’

এ বিষয়ে কথা হয় নিলামে দুই লটের কমলার ডাক পাওয়া বিডার মোশাররফ হোসাইন মাসুমের সাথে। তিনি বলেন, নিলাম শেষে কাস্টমস উদ্ভিদ সংঘ নিরোধ কেন্দ্র ও আনবিক শক্তি কমিশনের কাছে চিঠি লিখবে। পরবর্তীতে ওই দুই সংস্থা এসব পণ্য পরীক্ষা নিরীক্ষা করে রিপোর্ট দিবে। সেই রিপোর্ট আবার কাস্টমস হয়ে ছাড়পত্র সার্টিফিকেট বন্দরে যাবে। তবেই বন্দর থেকে এসব পণ্যের ডেলিভারি পাওয়া যাবে। আর এগুলো করতে প্রায় ১৫ থেকে ২০ দিন লেগে যায়। আবার কখনো কখনো এর চেয়ে বেশি সময়ও লাগে।’

কিন্তু এগুলো তো পচনশীল পণ্য। এসব পণ্য একমাস পরে তো ঠিক নাও থাকতে পারে। এমন প্রশ্নের জবাবে মোশাররফ হোসাইন মাসুম বলেন, এজন্যই তো ঝুঁকিতে পণ্যগুলো নিলামে কিনতে হয়। যদিও এগুলো বন্দরের ইয়ার্ডের ভেতরে রেফার কনটেইনারে (যেসব কনটেইনারে বিদ্যুৎ সংযোগ রয়েছে, অর্থাৎ এসব কনটেইনার একেকটি ফ্রিজ) থাকে। তারপরও অনেক সময় মালামাল খারাপও পাওয়া যায়। 

এসব ফল কি ফলমন্ডিতে আসে? এমন প্রশ্নের উত্তর জানতে কথা হয় কদমতলী ফলমন্ডি ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুল আলমের সাথে। তিনি বলেন, ‘নিলামে কেনা ফলগুলোর গুনগত মান ভালো হয় না। তাই এসব ফল ফলমন্ডিতে আসে না। দেশের বিভিন্ন এলাকায় এসব ফল চলে যায়।’

এদিকে ফলের গুণগত মানের পরীক্ষা করে থাকে উদ্ভিদ সংঘ নিরোধ কেন্দ্র ও আনবিক শক্তি গবেষনা কেন্দ্র। এ বিষয়ে কথায় উদ্ভিত সংঘ নিরোধ কেন্দ্রের উপ-পরিচালক ড. শাহ আলমের সাথে। তিনি বলেন, কাস্টমস থেকে আমাদের চিঠি দেয়ার পর আমাদের পরিদর্শক বন্দরের ইয়ার্ডে গিয়ে এসব পণ্য পরীক্ষা করেন। এগুলো খাওয়ার উপযোগী হলে আমরা ব্যবহারের সনদ দেই, অন্যথায় দেই না।

দাম কতো উঠলো

তিন দিনের নিলামে ২৫ টন খেঁজুরের সংরক্ষিত মূল্য এক কোটি ৮৪ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হলেও নিলামে দাম উঠেছে ৭০ লাখ টাকা। এছাড়া ২৫ টন মিশরীয় কমলার সংরক্ষিত মূল্য ৪৩ লাখ টাকা হলেও নিলামে ১৭ লাখ ১০ হাজার টাকা, ২৩ টন ফ্রেশ আপেলের সংরক্ষিত মূল্য ৪১ লাখ টাকার স্থলে নিলামে ১৩ লাখ ১৬ হাজার টাকা, ৪৭ টন আপেলের সংরক্ষিত মূল্য ৮৫ লাখ টাকা হলেও নিলামে ৩২ লাখ, ২৩ টন আপেলের সংরক্ষিত মূল্য ৪১ লাখ টাকার স্থলে নিলামে উঠেছে ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকা, ২৩ টন অপর আপেলের লটের সংরক্ষিত মূল্য ৪১ লাখ টাকার স্থলে নিলামে উঠেছে ১৪ লাখ ৪০ হাজার, ২৩ টনের আরেক আপেলের লটের সংরক্ষিত মূল্য ৪১ লাখ টাকার স্থলে নিলামে উঠেছে ১৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা, ২৩ টনের ফ্রেশ কমলার সংরক্ষিত মূল্য ৪০ লাখ টাকার হলেও নিলামে দাম উঠেছে ১৫ লাখ ৬৫ হাজার, ২৩ টন লাল আপেলের সংরক্ষিত মূল্য ৪১ লাখ টাকার স্থলে নিলামে উঠেছে ১৫ লাখ ৩০ হাজার এবং ৪৭ টন লাল আপেলের লটের সংরক্ষিত মূল্য ৮২ লাখ টাকা হলেও নিলামে দাম পাওয়া গেছে ২৭ লাখ ৬০ হাজার। গত তিনদিনে ১৫টি লটের নিলাম হলেও ৫টি লটে কোনো বিডার পাওয়া যায়নি। 

সংরক্ষিত মূল্য কি বাজার মূল্য? এমন প্রশ্নের জবাবে কাস্টমস নিলাম শাখার উপ-কমিশনার সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘নিলাম কমিটি পণ্যের মান যাচাই করে একটি মূল্য নির্ধারণ করেন। আর সেই মূল্যই হলো সংরক্ষিত মূল্য। আমরা নিলামের সময় বিডারদের এই মূল্যটি বলে থাকি এবং সেই অনুযায়ী বিডাররা ডাক দিয়ে থাকেন।’ 

নিলাম শাখার কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সংরক্ষিত মূল্য যাই হোক না কেন উপস্থিত বিডারদের মধ্যে সর্বোচ্চ যে দর পাওয়া যাবে সেই দরেই তা বিক্রি করতে হবে। 

উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানি করা এসব পণ্য ৩০ দিনের মধ্যে আমদানিকারক ডেলিভারি নেয়নি। নিয়ম অনুযায়ী বন্দর থেকে এসব পণ্যের তালিকা কাস্টমসে পাঠানো হয়। কাস্টমস কর্তৃপক্ষ যাচাই বাছাই করে নিলামের আয়োজন করে। নিলামে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান ছাড়াও বিভিন্ন ব্যক্তিও অংশ নিতে পারে।