হোটেল ইন্টারকন্টিনেটালের সামনে দিয়ে একটু এগোতেই একজন পুলিশ আমাদের এগোতে নিষেধ করলেন। বুঝলাম যানবাহনে এই ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’ পার হয়ে শাহবাগ যাওয়ার আশা বৃথা। রিকশাওয়ালা চাচাকে তার পাওনা মিটিয়ে হেঁটেই এগোতে থাকলাম। পুলিশ বক্সের কাছে যাত্রীদের নামিয়ে দিচ্ছিল বাসগুলোর কন্ট্রাক্টর। অধিকাংশ যাত্রীই পরিস্থিতি বুঝে চুপচাপ নেমে যাচ্ছিলেন।
গত কয়েকদিন আন্দোলনের সঙ্গে পরিচিত তারা। জানেন, আন্দোলনকারীরা রাস্তা ছেড়ে দেবে না। কিন্তু এক অশীতিপর বৃদ্ধা, তার মনে হয় খুব একটা বাড়ির বাইরে বের হওয়া হয়ে ওঠে না, আপত্তি জানালেন। কেন বাস শাহবাগ যাবে না? শাহবাগের ভাড়া তো নিলে? কন্টাক্টর ঝটপট বৃদ্ধার টাকা ফেরত দিয়ে বলল, টাকা দেওয়া লাগবে না আপনার। কিন্তু এগোতে গিয়ে বাস পুড়াতে পারব না। এ ভয় অবশ্য বাস মালিক শ্রমিকের নতুন নয়। আন্দোলন জমাতে হলে সব আন্দোলনকারীদেরই একটা ধারণা যে, দুই একটা বাস পোড়াতে হবে।
কোটা বিরোধী আন্দোলনে অবশ্য তেমনটি দেখা যায়নি এখনও। তাতে কি আজ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তেমন নমনীয় ভাব দেখা যাচ্ছে না। আন্দোলনকারীরাই বা কতক্ষণ নমনীয় থাকবে তার ঠিক আছে? তাই বাস কন্টাক্টরের এমন আগাম সতর্কতা। যা হোক, বাস থেকে নেমে মুহূর্মুহু স্লোগানের শব্দ শুনে বৃদ্ধা হয়ত কিছু আঁচ করলেন। পুলিশ বক্সের নিকটে দাঁড়ানো একজন পুলিশ বৃদ্ধাকে জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় যাবেন? বৃদ্ধা ‘বারডেম’ জানালে, ফুটপাত ধরে হেঁটে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন ওই পুলিশ সদস্য।
সেই পথ ধরে শাহবাগ মোড়ের পথে এগিয়ে যাওয়ার সময় দেখলাম, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের রাস্তায় চলছে আন্দোলনকারী ও পুলিশ বাহিনীর দ্বৈরথ। আন্দোলনাকারীদের সম্মিলিত ‘গো ব্যাক’ স্লোগানের তোপে পুলিশ বাহিনী একটু একটু করে পিছিয়ে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানা পার হতেই পুলিশ বাহিনী আর পেছাতে অস্বীকৃতি জানালো। আন্দোলনকারীরাও শাহবাগ মোড় থেকে পুলিশবাহিনী সরাতে পেরে মনে হয় খুশি হলো। তারা আর এগোনোর কথা না ভেবে শাহবাগের মোড়ে ফিরে এসে মূল দলে ভিড়ে গেল।
শাহবাগ মোড়ে তখন জ্বালাময়ী স্লোগান চলছে, ‘রক্তের বন্যায় ভেসে যাবে অন্যায়’; ‘সারা বাংলায় খবর দে, কোটা প্রথার কবর দে’, ‘আমার সোনার বাংলায় কোটা প্রথার ঠাঁই নাই’ প্রভৃতি। শাহবাগ মোড়ে গিয়ে দেখলাম, ঢাকা ক্লাবের সামনে থেকেই যান চলাচল বন্ধ করে দিচ্ছে পুলিশ। জটলা একটু এগোলাম কৌতূহলী হয়ে। দেখি সবাই তারা আন্দোলনকারী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য ছবি তুলছেন। আর কে না জানে, আজকালকার আন্দোলনে সংগঠনে এক বড় ভূমিকা পালন করছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।
যাদের শাহবাগ মোড় পার হয়ে এলিফ্যান্ট রোড বা সায়েন্স ল্যাবের দিকে যেতে হবে তারা হেঁটেই মোড়টা পার হওয়ার চেষ্টা করছিলেন। তাদের কাছে অবশ্য এই ফটোসেশন ভালো লাগল না। যদিও মুখে কিছু বললেন না কেউ। আমিও পা বাড়ালাম। একটু এগোতেই বারডেমের পাশ ঘেঁসে গড়ে ওঠা চায়ের দোকানে চারজন আন্দোলনকারীকে চা পান করতে দেখলাম। স্লোগানে গলা মেলালে গলা শুকিয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক। তাদের একজন বললেন, এটা (হাতের চা) শেষ করে টিউশনিতে যাব। শেষ করে আসব। আরেকজন বললেন, আমার আজ নেই। প্রথমজন বললেন, না রে, এক্সাম চলছে। যেতে হবে। তৃতীয় একজন বলে উঠলেন, এক্সামের সময়ই ব্লকেড দেওয়া দরকার। তাইলে কানে পানি যাবে সবার। এতক্ষণে মুখ খুললেন, চতুর্থজন, উল্টোটাও হতে পারে।
তাড়া ছিল বলে আলোচনা কোথায় দাঁড়ায় তা আর জানা হলো না। শাহবাগের দক্ষিণ ভাগ অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের দিক থেকে যে রাস্তাটি এসে মিশেছে সেটিও একইভাবে মোটরসাইকেলে পরিপূর্ণ দেখলাম। রিকশাওয়ালারা আগেই ঘুরিয়ে নিয়েছে তাদের রিকশাগুলো। তার মধ্যেও কীভাবে যেন একটা মালামাল পূর্ণ রিকশা ঢুকে গেল, চেষ্টা করেছিল পশ্চিম দিকে এলিফ্যান্ট রোডের দিকে যেতে। চারদিক থেকে আন্দোলনকারীরা এলো। দুই তিনজন চড়াও হলো রিকশাওয়ালার ওপর। ‘তুই কি মনে করে রিক্সা ঢুকাইলি এর মধ্যে?’ এই মারে তো সেই মারে।
যা হোক, রিকশাওয়ালা সে যাত্রা বেঁচে গেল নেতাগোছের একজনের মধ্যস্ততায়। তিনি রিকশাটা বের করে দিলেন আর যেদিক দিয়ে ঢুকেছিল রিকশাটা সেদিকে মাঠার গাড়ি বসিয়ে জোরদার করে দিলেন। দেখলাম আন্দোলনকারীরা হকার বা ভ্যানগাড়িতে আমড়া, পেয়ারা, চিপস, আচার বিক্রিকারীদের আটকাচ্ছে না। বরং তাদের দোকানগুলো এমনভাবে বসিয়ে দিচ্ছে যেন সহজে তা পার হওয়া না যায়। এর ফলে এই ভ্রাম্যমাণ দোকানিদের বিক্রিতে কিছু লাভই হচ্ছে। ভোগান্তি হচ্ছে যাত্রীদের। তাদের পায়ে হেঁটে চলার পথটুকুও নেই। এর ফাঁক দিয়ে কোনো রকমে পায়ে হেঁটে মোড় পার হয়ে আরেকটি রিকশায় উঠে গন্তব্যে চলছে বিরক্ত, বাকশূন্য মানুষ। আমি তাদের অনুসরণ করলাম। রাস্তার ডিভাইডারের লোহার বেড়ার ফাঁক গলে ওষুধের দোকানে গেলাম। ওষুধ নিয়ে বঙ্গবন্ধু মেডিকেলের আউটডোরের গলি দিয়ে সাকুরার গলি দিয়ে মেইন রোড হয়ে ফিরে এলাম বাংলা মোটর। যাওয়া আসায় ঘণ্টা দেড়েক লাগলেও শাহবাগ আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ছিলাম সাকল্যে আধাঘণ্টা। এই সময়ে দৃশ্যত কোনো বড় রকমের সংঘর্ষ ঘটেনি দেখে অদৃষ্টকে জানালাম ধন্যবাদ।