আমরা প্রায়ই উচ্চারণ করি, বাঙালি বিস্মৃতি-প্রবণ জাতি। আমরা কেন বিস্মৃতি-প্রবণ, তা অবশ্যই গবেষণার বিষয়। কিন্তু নতুন করে সেই প্রসঙ্গ এলে আবার তা আমাদের ভাবনাকে জাগ্রত করে। একাত্তরে আমাদের জীবনে এত বড় অবিস্মরণীয় একটা ঘটনা ঘটে গেল যেখানে এত মৃত্যু, এত রক্ত, এত নির্যাতন, এত বীভৎসতার অন্ধকার কেটে নতুন আলোর সন্ধান যারা এনে দিল; মহান মুক্তিযুদ্ধের সেই অমৃত সন্তান একেকজন ‘মুক্তি’কে একনজর দেখার জন্য, তাদের সংস্পর্শ পাওয়ার জন্য, একটু কথা শোনার জন্য, সাধারণ মানুষের মধ্যে যে ঔৎসুক্য, আবেগ, আকুতি ও তীব্র ভালোবাসা ছিল, আজ তা প্রায় শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। মনে পড়ে, মুক্তিযুদ্ধের এই ঋত্বিকদের ঘিরে যুদ্ধের অব্যবহিত পরপরই সাধারণ মানুষের আবেগ অনুভূতির যে বহিঃপ্রকাশ, তাকে কলমবন্দি করেছিলেন বাংলাদেশের অগ্রগণ্য সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ফয়েজ আহ্মদ তার সাড়া জাগানো উপসম্পাদকীয় ‘মধ্যরাতের অশ্বারোহী’তে। সেই মুহূর্তের বাস্তবতার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘রাইফেল ও স্টেন ছিল তখন সবচাইতে সহজলভ্য হাতিয়ার, সর্বাধিক বিশ্বস্ত বন্ধু। প্রতিদিন হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা গ্রাম, জঙ্গল, গঞ্জ থেকে উঠে আসছেন রাজধানী ঢাকা শহরের দিকে বীরদর্পে। তাদের পদভারে কম্পিত শহরের লাখ লাখ নাগরিক আনন্দে আর উচ্ছ্বাসে, গৌরবে আর বৈভবে মন্ডিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধের ঋত্বিকদের আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে রেখেছিল।’ সেই আবেগ অনুভূতির কেন আজ এই অধোগতি? রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যে আজ মুক্তিযোদ্ধাদের গুরুত্বের সঙ্গে স্মরণ করা হলেও জনমানসের চেতনায় তা ক্রমেই অবনমিত হচ্ছে। এই অবনমনের কারণও কী সেই বিস্মৃতি প্রবণতা, না কি আমাদের চলমান রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কার্যকারণের দুর্বলতা ঐতিহাসিক কারণেই এ বিষয় নিয়ে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে।
ক্যাপ্টেন (অব.) সিতারা বেগম, বীরপ্রতীক ১৯৯৬ সালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন ‘মুক্তিযুদ্ধের পরপরই ঢাকায় ফিরে তিনি নিউ মার্কেটে গিয়েছিলেন এক জোড়া স্যান্ডেল কিনতে। কিন্তু ‘সেখানে গিয়ে লোকজনকে দেখে মনে হলো না যে দেশে একটা তুমুল যুদ্ধ হয়ে গেছে। তার কোনো নিশানাই পাওয়া গেল না’ (মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের বলা না বলা কথা, সুকুমার বিশ্বাস)। জনমানসে চেতনার অবনমন শুরু হয়েছে যুদ্ধের পরপরই। তারপর অনেক যোগ বিয়োগ, রাজনৈতিক ও সামাজিক সমীকরণ এবং পালাবদলে ক্রমাগতই বিপর্যস্ত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। সেই সঙ্গে বিপর্যস্ত হয়েছেন বীর মুক্তিযোদ্ধারাও। অনেকে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে চ্যুৎ হয়ে বিপরীতমুখী নীতি ও আদর্শের অনুসারী হয়েছেন। অনুসন্ধিৎসু নতুন প্রজন্মের নির্মোহ ইতিহাস হয়তো একদিন সাক্ষ্য দেবে জীবন সায়ান্নে কী এমন ছিল তাদের অপরাধ! এই অবনমনের আড়ালে কারা দায়ী? জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের সাম্প্রতিক অবস্থা প্রসঙ্গে আলোচনাকালে রংপুরের সাবেক জেলা ইউনিট কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা মঞ্জুরুল ইসলাম জানান, বর্তমান সরকারের কাছ থেকে মাসিক ২০ হাজার টাকা ভাতা পাওয়ায় মুক্তিযোদ্ধারা কিছুটা বেঁচে গেছে, নাহলে এতদিনে অধিকাংশই অচিকিৎসা ও অনাহারে মারা যেত। এখনো যাঁরা বেঁচে আছেন, তাদের অধিকাংশের বয়স সত্তর বছরের ঊর্ধ্বে এবং প্রায় সকলেই বার্ধক্যজনিত রোগে আক্রান্ত। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধাদের স্বীকৃতি, সহযোগিতা ও উপযুক্ত মর্যাদা দেওয়া হলেও সামাজিকভাবে তার প্রতিফলন হতাশাব্যঞ্জক। এমনকি নিজ পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী, পরিচিত বন্ধুবান্ধব, বিভিন্ন দপ্তর বা প্রতিষ্ঠান, সংক্ষিপ্ত সমাবেশ ও আড্ডায় ‘মুক্তিযোদ্ধা’ প্রসঙ্গ উঠলেই কেমন একটা ঔদাসীন্য, অবজ্ঞা ও ঈর্ষাকাতরতার বিজাতীয় মনোভাব প্রকাশ্য হয়ে ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে কখনো কারও কারও অনাকাক্সিক্ষত মন্তব্য এমন ব্রিবতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে, যা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধের জন্য অবমাননা এবং অমর্যাদাকর। এ ক্ষেত্রে যদিও রাষ্ট্রীয় ঘোষণা নীতিগত, কিন্তু জনসমাজে মর্যাদার বিষয়টি অনুভূতিগত ও মানসিক। এই মূল্যবোধের তারতম্য যেমন হঠাৎ করে সংগঠিত হয় না, তেমনি হঠাৎ করে তা পাল্টানোও যায় না। তবে এর কার্যকারণগুলো অবশ্যই উদঘাটন করা সম্ভব। সরকার বা রাষ্ট্র কর্তৃক যেসব সুযোগ-সুবিধা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে, অনেক সময় তার পুরোপুরি বাস্তবায়ন সম্ভব হয় না বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষের ইচ্ছা ও মানসিকতার কারণে। এসব নিয়ে সরকারি নির্দেশনার কথা বলতে গেলে অনেক ক্ষেত্রে আসল নকলের প্রশ্ন তুলে অথবা ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার’ প্রসঙ্গ টেনে এই সংগঠন বা গোষ্ঠীর প্রতি এমন বিব্রত ও অবমাননাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয় যে, একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার এমন অপমানের সম্মুখীন হওয়ার চাইতে ‘মৃত্যুই ভালো ছিল’ মর্মে হতাশায় মাটিতে মিশে যাওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। সাধারণ মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থন, সহযোগিতা, ত্যাগ ও শ্রম ছাড়া কোনো দেশের মুক্তি সংগ্রাম জয়লাভ করতে পারে না। একাত্তরের সেই মুক্তির সংগ্রামে সাধারণ জনগণের মধ্য থেকে এই মুক্তিযোদ্ধারাই ছিল রণাঙ্গনের অগ্রগামী সৈনিক, জাতির প্রতীকী প্রেরণা। তাদের প্রতি কোনো অবহেলা, উপেক্ষা ও অপমান আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরাট সাফল্য ও মহান অর্জনকেই কালিমালিপ্ত করে। নিজেকে আমরা কোথায় লুকাব?
নতুন প্রজন্মের মাঝে একদিন মাতৃভূমি, মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে মুক্তচেতনা জাগ্রত হবে। মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার বুকে নিয়ে খুঁজে ফিরবে তারা একজন মুক্তিযোদ্ধাকে স্পর্শ করার তীব্র আকাক্সক্ষায়। ততদিনে হয়তো জীবিত কাউকে আর খুঁজে পাবে না। নীরবে-নিভৃতে চোখ ভিজে উঠবেই।
লেখক : সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও লেখক
krbarman3535@gmail.com