প্রখ্যাত সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। ছিলেন বাংলাদেশ সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন আর্ট গ্যালারি ‘শিল্পাঙ্গন’। প্রগতিশীল পাঠাগার ‘সমাজতান্ত্রিক পাঠাগার’-এর প্রতিষ্ঠাতা। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) প্রথম প্রধান সম্পাদক অকৃতদার এই কবি ও ছড়াকার মারা যান ২০১২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি। অতীতের সঙ্গে অধুনার সংযোগ ঘটাতে চিন্তা পাতায় ছাপা হলো তার লেখা উপসম্পাদকীয়
যে ভয়ঙ্কর রাত্রি ছিল সেটা, তার সঠিক বর্ণনা দেয়া সম্ভব নয়! আমার অপর দু’বন্ধুর তখনকার মনের কথা কী করে বলব। চরম নীরবতাই এখন আমাদের ওপর রাজত্ব করছে। এমন ভয়াবহ রাত্রি আমার জীবনে আরও এসেছে। কীভাবে উতরে গেছি, সে আর বলার নয়। রাত্রির একটা পৃথক রূপ আছে। রাত্রির কাজকর্মও পৃথক এবং মানুষ সেভাবেই অভ্যস্ত হয়ে গেছে। কিন্তু যদি তার ব্যতিক্রম ঘটে অথবা তার চিন্তার বাইরে কিছু ঘটে, তবেই সেটা চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। রাত্রির এই ঘুম নিয়ে অনেক সময় বিপর্যয় ঘটে আর এই ব্যতিক্রমী রাত্রির ঘটনা অনেক দিন স্মরণে থাকে। জীবনে এমন অনেক ঘুমহীন রাত্রি গেছে, যা অনেক সময় ভয়ঙ্কর, কখনো ক্লান্তিকর, অনেক দুঃখের সময় আনন্দদায়ক। জীবনে এই রাত্রির ঘটনা চক্রাকারে ঘুরে ঘুরে আসে। যদি এ সমস্ত রাত্রি উতরে যেতে পারি, তবে তা আলোচ্য বিষয় হয়ে ওঠে। আমার জীবনে এমন সব রাত্রি এসেছে, যা সবসময় ভুলে থাকা যায়নি। এই রহস্যময়ী রজনী মানুষকে জীবনের অর্থ বুঝিয়ে দেয়। আমিও সেভাবে রাত্রির জীবন অনেক সময় বাস্তব বলেই ধরে নিয়েছি। মাত্র একত্রিশ বছর আগেকার কথা। আমি আর এনায়েতুল্লাহ্ খান মিন্টু ধানম-ির এক বাড়িতে গিয়ে কড়া নাড়লাম গেটে। দারোয়ান গেট খুলতেই বাড়িতে দ্রুত প্রবেশ। দেলোয়ার সাহেবের বাড়িতে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায়। কেউ নেই। কিছুক্ষণ পর আমাদের অতি ঘনিষ্ঠ এক সাংবাদিক উপস্থিত।
আরে তোমরা! এখানে থাকতে পারবে না। অন্যত্র যাও!
উত্তরে বললাম, পাঁচটা বেজে পাঁচ মিনিট। পাঁচটা থেকে শহরে কারফিউ। এখানে থাকতে হবে।
কোনো রুম নেই।
কেন, এই বৈঠকখানার শোফায় থাকব।
বাড়ির মালিক দেলোয়ার সাহেব বাড়িতেই। লজ্জায় তিনি এই কমন বন্ধুকে পাঠিয়েছেন। তিনি বুঝলেন না কোথায় যাব এই কারফিউতে? আবার কারফিউর সময়ই তো বাড়িগুলো তল্লাশি করে আর্মি লোক ধরে গায়েব করে দেয়। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। সমগ্র শহরটাই যেন গোরস্তান। সোফায় অনাকাক্সিক্ষত অতিথি হিসেবে কাত হয়ে রাত কাটালাম। সারা রাত কখন আর্মি আসে, তাই ছিল চিন্তা। সকালে উঠেই রাস্তায়। কিছু দূরে এগিয়ে যেতে একটা গাড়ি এসে দাঁড়াল-আরে ফয়েজ ভাই, মিন্টু ভাই! কোথায় যাচ্ছেন ভোরে। উঠে পড়ুন জলদি। মন্ত্রমুগ্ধের মতো নিয়াজের গাড়িতে আমরা। নিয়াজ চৌধুরী আমাদের ছোট ভাইয়ের মতো। সেও হয়তো রাতে কোথাও লুকিয়েছিল। আমাদের নামিয়ে দিল মিন্টুর গাড়ি যেখানে ছিল। সে আজ বত্রিশ বছর পূর্বের কথা ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ। নিয়াজ এখন পঞ্চাশের ঘরে। নানাবিধ কারণেই ঘুম হয় না। মধ্য পঞ্চাশের কথা। সাত্তার সাহেব, মি. মিটার, মুকুল (এম. আর আখতার) ও আমি প্রেস ক্লাবে তাস খেলছিলাম। প্রেস ক্লাবের সবাই চলে গেছে। কেবল আমাদের টেবিলটা জীবিত। হঠাৎ দেখি রাত একটা। এত রাতে আর কোথায় যাব, ঘুমের কথা ভুলে গিয়ে খেলা অব্যাহত রাখলাম। এক সময় ভোর হলো। বাইরে রিকশার ক্রিং ক্রিং ধ্বনি। আমরা ঘুমহীন রাত্রি কাটিয়ে বাড়ির দিকে ছুটলাম ভোর হলো, দোর খোল বলতে বলতে। সেবার তারাবাগে সিকান্দার আবু জাফরের বাড়িতে গোপনে সভা হচ্ছে বাংলার স্থলে আরবি হরফ চালু করার সরকারি ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে। আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে আমিও উপস্থিত। রাত প্রায় একটায় সভা শেষ। এখন উপায়, থাকি কোথায়? যে যার পথে গেল। আমি রাতটা কাটাবার জন্য এলাম প্রেস ক্লাবে, একটু ঘুম দরকার। তখন আইয়ুব খানের ঘোরতর মার্শাল ল’ দেশে। সবাই থরহরি কম্প। ১৯৫৮ সাল। সুট পরা অবস্থায় প্রেস ক্লাবের দোতলার লাউঞ্জে সোফার ওপর শুয়ে পড়লাম। খুব ভোরে উঠেই লঞ্চে পালাব। কিন্তু ঘুমের পাত্তা নেই ধরা পড়ার ভয়ে। ঠিক তাই হলো। ভোর রাত চারটার দিকে প্রেস ক্লাব ঘেরাও। আইবিএসে আমার রুমে উপস্থিত। সে রাতে ধরা পড়ে একটানা ৪ বছর কারাবাস। শেষে হাইকোর্টের একটা বোর্ডের মাধ্যমে ছাড়া পাই। তবে হ্যাঁ, বলতে হবে, জেলে চার বছর কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমিয়েছি। ২৭ মার্চ ১৯৭১ বের হলাম ডাক্তারের খোঁজে। লুঙ্গি ছিঁড়ে বাঁ ঊরু বাঁধা। মিরপুর রোডে মিন্টুর (এনায়েতুল্লাহ খান) সঙ্গে দেখা। সে আমাকে তার গাড়িতে উঠিয়ে নিল। কোনো ডাক্তারই পাওয়া যায় না। শেষে ওল্ড হাতিরপুল রোডস্থ ‘পলি ক্লিনিকে’ ঢুকে পড়লাম। সেখানে ডাক্তার আজিজ ও তার স্ত্রী ডা. সুলতানা বসেন। ক্লিনিক খোলা। ডা. আজিজ বললেন, ওই ভেতরের ঘরে বসুন কথা নেই। আর একটা ঘরে সব বন্ধ। ডাক্তারি টেবিলে ডেকে নিয়ে স্বামী-স্ত্রী বললেন, ফয়েজ ভাই, প্যান্ট খুলে ফেলুন। চেয়ে দেখি সঙ্গে তিনজন মহিলা নার্স। বললাম, বিবস্ত্র হবো, নার্সদের চলে যেতে বলো। আরে এরা তো নার্স। সুলতানা মুখরা মেয়ে। কিছু হবে না। কাপড় তো খুলতেই হবে। ঊরুতে আঘাত। চিকিৎসায় মহিলা-পুরুষ কী? শেষ পর্যন্ত আমার বিশেষ অনুরোধে দু’জন নার্স অপারেশন রুম ত্যাগ করলেন।
কিন্তু তৃতীয়জন না নড়ং না চড়ং!
বললাম, একে যেতে বলুন।
দু’ডাক্তারই চুপ করে থেকে বলল, এ জাফরের স্ত্রী, নার্স নয়!
অ্যা, তবে তো আরও নয়। ও তো ছোট বোন! শেষে তাকেও যেতে হলো।
মিন্টু এক ঘণ্টা পর আমাকে নিতে আসবে। স্বামী-স্ত্রী দু’ডাক্তার আমার বাঁ ঊরু সেলাই করে দিল। ওষুধ দিল দশ দিনের। ভাবলাম আজ ঘুম হবে। ব্যাস, গিয়েই দেখি আরও অনেকে নীরবে ও-বাসায় ঢুকে আছে, তাদের মধ্যে সাদেক খান। কথায় কথায় মিন্টুর সঙ্গে তার তর্ক। মিন্টুর মন্তব্য, সাড়ে সাত কোটি মানুষকে ফেলে রেখে শেখের কারাগারে যাওয়া ঠিক হয়নি, তিনিও পালাতে পারতেন। আর যায় কোথায়। সাদেকের কথা, জনৈক মেজর জিয়ার কথা, স্বাধীনতার কথা এই নিয়ে নানা প্রসঙ্গ টেনে দুজনের মধ্যে তর্কের শেষ নেই; যার অনেক কিছুর অর্থ নেই। কাগজ বিছিয়ে পাশে শুয়ে পড়লাম, অবশ্য বোতলটা শেষ হওয়ার পর। ঘুম? সে তো কোথায় উধাও। সকালে চোখ ফোলা নিয়ে বের হলাম নিরুদ্দেশের পথে। আহত আমি মিন্টুর ঘাড়ের ওপর আবার তার গাড়িতে।
মুক্তাঞ্চল থেকে রেডিওতে রিপোর্ট আমাকে প্রায়ই করতে হতো। খুলনার কালীগঞ্জ এলাকা আমরা পাকিস্তানিদের কাছ থেকে তীব্র যুদ্ধের পর পুনর্দখল করে নিয়েছি। কালীগঞ্জে যাওয়ার কথা শুনে ‘স্টেটম্যানের’ নিউজ এডিটর ও একটি বৈদেশিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি সন্তোষ বসাক আমার সঙ্গে চললো। সে আবার নিয়ে এলো ইউপিআই এজেন্সির এক আমেরিকান প্রতিনিধিকে। সন্তোষ আমার পঞ্চাশের দশকের বন্ধু। তখন সে ছিল ‘আজাদে’, আমি ছিলাম ‘ইত্তেফাকে’। তিনজনেই যাত্রা করলাম কলকাতা থেকে খুলনার দিকে মুক্তাঞ্চলে, সকালে। টাকি নামক একটি নদী পাক-ভারতের সীমানা। সে জন্যে টাকি নদী পেরিয়ে যেতে হলো কালীগঞ্জে। ওখানে আমাদের বিজয়ী বাহিনীর লোকাল কমান্ডার ছিলেন তখনকার ক্যাপটেন হুদা। ক্যাপটেন হুদা (পরে ব্রিগেডিয়ার) এক অমায়িক ও সুন্দর পুরুষ। তার নির্দেশনায় সমস্ত জায়গা ঘুরে দিন কাটলো। পড়ন্ত বিকেলে তিনি হাসতে হাসতে বললেন, আপনাদের কিন্তু আজই ফেরত যেতে হবে। যে অনুমতি এনেছেন, তাতেও এ কথা লেখা আছে, একদিন মাত্র। আর আমার রাখার জায়গাও নেই। সন্ধ্যা হয়ে এলো, যাত্রা করুন। যুদ্ধ শুরু হবে। আমাদের সন্ধ্যার পূর্বেই টাকি নদী পার হতে হবে। ফেরত যাত্রার সময় ক্যাপটেন হুদা একটা ছাড়পত্র হাতে দিয়ে বললেন কোথাও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হলেই এই ছাড়পত্র দেখাবেন এবং বলবেন আমার নাম। প্রায়ই কিন্তু চ্যালেঞ্জের সম্মুখে পড়বেন। তাড়া করে ফিরতিযাত্রা শুরু করলাম। চ্যালেঞ্জটা কী রকম হবে তাও ক্যাপটেন হুদা বলে দিয়েছিলেন। কোথাও কিছু দেখবেন না। হঠাৎ চিৎকার-হু কামস্ দেয়ার। কোনো না কোনো বাঙ্কার থেকে। দাঁড়িয়ে যাবেন। আমরা যাত্রা শুরু করলাম। আর কিছুদূর যেতেই চ্যালেঞ্জ। আবার চ্যালেঞ্জ। এভাবে চলছি। বাঙ্কার থেকে কারা যেন বলছে হুকুমদার! আমরা দাঁড়াই, ক্যাপটেন হুদার পরিচয়পত্র দেখাই। তারপর ছাড় পাই। সন্তোষ বলল, হুকুমদার অর্থ কী? বললাম, ঐ তো হলো! না না এর অর্থ আছে। তারপর একপর্যায়ে আবিষ্কার করলাম, ‘হুকুমদার’ কথাটা ইংরেজি থেকে এসেছে। অর্থাৎ হুকামস্ দেয়ার। এ সমস্ত মুক্তিযোদ্ধা সাধারণ কৃষকের ছেলে। ইংরেজি-বাংলা কোনোটাই জানে না। কিন্তু যে কোনো অস্ত্র তারা চালাতে শিখে গেছে। এদের হুমকিতেই আমরা তটস্থ, মানে অস্থির হয়ে আছি-হু কামস্ দেয়ার অর্থাৎ হুকুমদার! এভাবে টাকি নদীর ঘাটে পৌঁছাতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। নদীতে একটি নৌকাও নেই। নিকটবর্তী গ্রামে একটি প্রদীপও জ্বলে না, কোনো প্রাণের সন্ধান নেই। এখন উপায়? তিনজনের ‘লা-জবাব’। নীরবে আমাদের সামনের পাড়াটায় গিয়ে উঠলাম, একটি লোক নেই। দরজায় নাড়া দিলাম, খুলে গেল। কেউ কিছু এখন আর চ্যালেঞ্জ করে না। বুঝতে পারলাম এলাকার সমস্ত গ্রামবাসী প্রতি সন্ধ্যার পূর্বে নদী পার হয়ে ভারতে চলে যায়, তারা ফিরে আসে সকালে। রাতের বেলা পাকিস্তানিরা এ এলাকা পুনর্দখলের জন্যে কমান্ডো প্রেরণ করে। ক্যাপটেন হুদার নির্দেশে এলাকাবাসী রাতটা ভারতে কাটায় এবং বাঙ্কারের মুক্তিযোদ্ধারা চ্যালেঞ্জের মুখে কোনো সাড়া না পেলে, সোজা গুলি করে দেয়। সেদিক থেকে দেখলে অজ্ঞাত পক্ষের গুলিতেই রাতে এখানে প্রাণ যেতে পারে! উপায় কী?
সেই ভয়ঙ্কর রাতের কথাই বলছি। সাথের আমেরিকান প্রতিনিধি ভিয়েতনামে রিপোর্টিং করেছে। কিন্তু এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে কোনো দিন পড়েনি। তার কথা বন্ধ হয়েছে হুকুমদার শুনেই। তার ওপর কমান্ডোর আশঙ্কা। আমরা সবাই নিরস্ত্র। আর পথ না পেয়ে সেই ঘরেই ঢুকে গেলাম। বিছানা আছে মাটিতে। স্থির হলো এখানেই আমরা রাতটা কাটাবো। ঘুম তো আকাশে, চোখে নয়। কারো মুখে একটি কথাও নেই। আমরা তিনজন শুয়ে আছি মৃত্যুর অপেক্ষায়। একটা ইঁদুর ছুটলেও ভয়ে চমকে ওঠি। বসা আর ওঠা এভাবেই রাত কাটলো সে ঘরে। ভয়ঙ্কর রাত্রি, ভয়াবহ পরিস্থিতি। এই নির্জীব রাত্রির কথা দিয়েই শুরু করেছিলাম। ভোর হতেই আমরা নদী পারাপারের নৌকা বা গুদারা পেলাম। আমরা এখন কলকাতার পথে। মানুষ দুঃখের মধ্যেও হাসে। সেই হাসিও ঠোঁটে ছিল না। তিনটি মৃত মানুষ যেন চলছি। (ঈষৎ সংক্ষেপিত)
লেখক: বরেণ্য সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব