পরিস্থিতি বাড়াচ্ছে মূল্যস্ফীতি

শুক্রবার রাত থেকে কারফিউ জারি হয়েছে। নগরীতে মোতায়েন করা হয়েছে সেনাবাহিনীর সদস্যদের। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনে সহিংসতার জেরে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ফলে শনিবার সকাল থেকে রাজধানীতে নেমে আসে সুনসান নীরবতা। শুধু রাজধানীতে নয়, সারা দেশের চিত্র অনেকটা একই রকম। যদিও গত ৫ জুলাই থেকে শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন করছিল। যা সহিংসতায় রূপ নেয় গত ১৫ জুলাই থেকে। এরপর থেকেই কার্যত অচল হয়ে আছে গোটা দেশ। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা যেমনি ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি পণ্য সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে নিত্যপণ্যের বাজারে দেখা দিয়েছে অস্থিরতা। এমনিতে দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষের নাজেহাল অবস্থা, এর মধ্যে দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিয়েছে। বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি চরমে পৌঁছেছে। একদিকে নগরীর মানুষ খাদ্যপণ্য পাচ্ছে না, অন্যদিকে গ্রামাঞ্চল থেকে সরবরাহের অভাবে নষ্ট হচ্ছে খাদ্যপণ্য। এ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে নগরীতে খাদ্যপণ্যের মারাত্মক সংকট সৃষ্টি হতে পারে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা হচ্ছে। বিশেষ করে করোনা মহামারীর পর ইউক্রেন যুদ্ধে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকে। এতে মূল্যস্ফীতি ৬ ঘর ছাড়িয়ে ৮, ৯-এর ঘরে চলে আসে। বর্তমানে খাদ্যে মূল্যস্ফীতি আরও বেশি। গত জুনে খাদ্যে মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ৪২ শতাংশ। যা এর আগের মাসেও ১০-এর ঘরে ছিল। এ ছাড়া সার্বিক মূল্যস্ফীতি জুনে ছিল ৯ দশমিক ৭২ শতাংশ। দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক বন্যার পর খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং উৎপাদিত খাদ্যপণ্য বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এ পরিস্থিতি। সর্বশেষ ২০১০-১১ অর্থবছরে দেশের গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ৯২ শতাংশ। সে অর্থবছরের পর সদ্য শেষ হওয়া ২০২৩-২৪ অর্থবছরের গড় মূল্যস্ফীতি সর্বোচ্চ পর্যায়ে ঠেকেছে, ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ। অর্থাৎ গত ১৪ বছরের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ গড় মূল্যস্ফীতি।

এদিকে মজুদদারি, করপোরেট কারসাজি তো আছেই। বিশেষ করে করপোরেটদের হাতে চলে যাওয়া ভোগ্যপণ্যের বাজার সাধারণ মানুষের মধ্যে নাভিশ্বাস তৈরি করেছে। সরকারের দায়িত্বশীলরা অনেকবার বলেছেন করপোরেট কারসাজি বন্ধ না হলে জিনিসপত্রের দাম কমবে না। সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রীরাও মন্তব্য করেছেন করপোরেটদের নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব না। কারণ হিসেবে তারা বলেছেন, করপোরেটরা বাজার নিয়ন্ত্রণ করে, তাই তাদের বিরুদ্ধে কিছু করতে গেলে গোটা ভোগ্যপণ্যের বাজারে এর প্রভাব পড়বে। আদতে হয়েছেও তাই। ডিম, মুরগি, গরুর মাংস, পেঁয়াজ, সয়াবিন তেল, চিনি, আটা, চালের বাজারে করপোরেটদের আধিপত্যের কারণে গত প্রায় দুই বছর এসব পণ্য মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে রয়েছে। অর্থনীতিবিদদের ভাষায় বাংলাদেশ একটি দুষ্টচক্রে জড়িয়ে গিয়েছে। এ থেকে উত্তরণের জন্য কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রয়োজন। যদিও ভোক্তা অধিদপ্তর মাঝে মধ্যেই অভিযান পরিচালনা করে। কিন্তু এতে বাজারে পণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতির হেরফের হয় না।

বাজারে অব্যবস্থাপনাও নতুন কিছু নয়। কৃষক তার ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না। ব্যবসায়ীরা বলছেন, কৃষকের কাছ থেকে পণ্য কিনে বাজারে আনতে ঘাটে ঘাটে তাদের নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়তে হয়। বাজারে মজুদদারদের কেরামতি এবং করপোরেট কারসাজির কারণে দীর্ঘদিন ধরেই বাজার ব্যবস্থাপনায় টালমাটাল চলছে। এসব কারণে সরকারকেও কিছু কিছু পণ্যের দাম নির্ধারণ করতে হচ্ছে করপোরেটদের মর্জিমতো। এতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের মানুষদের চরম মাশুল দিতে হচ্ছে।

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের আন্দোলনের কারণে গত প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে নগরীতে অস্থিরতা চলছে। আন্দোলনকারীরা যখন সড়কে অবরোধ করে দাবি আদায়ের চেষ্টা করছেন তখন খেটে খাওয়া মানুষগুলোকে পড়তে হচ্ছে দুর্ভোগে। বিশেষ করে যারা দিন আনে দিন খায় তাদের অবস্থা কী তা কল্পনাও করা যায় না। আয় বন্ধ তো পেটে দানাপানি পড়বে না। এজন্যই বলে ‘রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলু খাগড়ার প্রাণ যায়’। কোটা আন্দোলন সড়কে সীমাবদ্ধ থাকা পর্যন্ত এসব খেটে খাওয়াদের সমস্যা হয়নি। কিন্তু এই আন্দোলন যখন সহিংসতায় রূপ নেয় তখনই দেখা দেয় বিপত্তি। কোটা সংস্কার প্রয়োজন শিক্ষিতদের জন্য। কিন্তু সমাজে যারা অশিক্ষিত এবং নিম্নআয়ের মানুষ আছেন তারা কী করবেন? তাদের জন্য  তো দিনে আয়ের পথটা থাকা উচিত।

এদিকে আরও বেড়েছে খাদ্যপণ্যের দাম। এতদিন যেসব সবজি ৭০ টাকায় পাওয়া যেত শুক্রবারের পর থেকে তা কিনতে হচ্ছে ১০০ টাকায়। কী করা যাবে। বিক্রেতাও তো সবজি কিনে এনেছেন বেশি দামে। তাই তাকে তো বেশি দামে বিক্রি করতেই হবে। তাছাড়া গত কয়েকদিন ধরে পণ্য সরবরাহ কম থাকায় রাজধানীর বাজারে ঘাটতিও দেখা দিয়েছে। অনেক বাজারে মিলছে না কাক্সিক্ষত পণ্য। ব্যবসায়ীরাও সে সুযোগ নিচ্ছেন। সরবরাহ ঘাটতির অজুহাতে দাম বাড়াচ্ছেন পণ্যের। যদিও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে যানচলাচল বিঘ্নিত হলেও খাদ্যপণ্য সরবরাহে কোনো প্রকার বাধা দেওয়া হয়নি। এমনকি শুক্রবার রাত থেকে কারফিউ জারি হলেও খাদ্যপণ্য ও জরুরি সেবা কারফিউর আওতামুক্ত রাখা হয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের মতোই আতঙ্কের ছোঁয়া আছে ব্যবসায়ীদের মধ্যে। কারণ কিছু কিছু জায়গায় শনিবার কারফিউর মধ্যেও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এতে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। কারফিউ বাতিল হলেও পণ্যের দামের ঊর্ধ্বমুখিতার রেশ টানতে হবে অনেক দিন। কারণ আমাদের দেশে পণ্যের সরবরাহ বাড়লেও দাম কমান না ব্যবসায়ীরা। বাজার ব্যবস্থা মনিটরিং-এ ঘাটতি এক্ষেত্রে অনেকাংশে দায়ী। 

গত দুই বছর বাংলাদেশের উচ্চ মূল্যস্ফীতি ভোক্তাদের জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষ সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছেন। সাধারণত পৃথিবীর সব দেশ উচ্চ মূল্যস্ফীতি দেখা দিলে ব্যাংকঋণের সুদহার বাড়িয়ে মুদ্রার সরবরাহ কমিয়ে দেয়। ফলে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে সম্প্রতি এমন উদাহরণ তৈরি করেছে শ্রীলঙ্কা ও ভারত। তবে বাংলাদেশে গত এক বছর সুদের হার বাড়তে থাকলেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে তা কোনো কাজেই আসছে না।

সদ্য শেষ হওয়া অর্থবছরে সরকারের গড় মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। এ পরিপ্রেক্ষিতে দেরিতে হলেও ব্যাংকঋণের সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি কমানোর চেষ্টা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু বাস্তবে কোনো সুফল আসেনি। মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও অনেক ওপরে, ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ।

বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নত করে, তথ্য-উপাত্ত ঠিকভাবে সরবরাহ করে, তথ্য-উপাত্তভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিয়ে যাদের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান আছে, তাদের সাপ্লাই চেইনে কোনো ধরনের সমস্যা আছে কি না বা কেউ কিছু করছে কি না দেখা দরকার। ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তর, প্রতিযোগিতা কমিশন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এগুলো দেখভাল করতে পারে।

একটা কথা আছে সময়ের একফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়। যখন মূল্যস্ফীতির লাগাম টানার জন্য পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন ছিল তখন নেওয়া হয়নি। তাই এ মুহূর্তে সেসব ব্যবস্থা নিলেও নিয়ন্ত্রণে আসতে বেশ সময় লাগছে। এরপরও যদি উল্টাপাল্টা কিছু না হয়, এসব পদক্ষেপ যদি ঠিক থাকে অর্থাৎ সরকার যদি ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ না নেয়, কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ঋণ না নেয় আর টাকার অধঃপতন যদি আরও না হয় তাহলে এটি ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি মূল্যস্ফীতির উত্তরণের পথ রুদ্ধ করে। এ কারণে সরকারের দায়িত্বশীলদের পরিস্থিতি বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত যেন সাধারণ মানুষের মধ্যে এর প্রভাব আরও তীব্র না হয়।

গত দুই সপ্তাহের দেশব্যাপী অস্থিরতা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পথ বন্ধ করে দিয়েছে। খেটে খাওয়া মানুষ এ সময় কোনো কাজ করতে না পারায় তাদের আর্থিক সংগতি কমেছে। পাশাপাশি খাদ্য সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। এতে দ্বৈত চাপে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। যদিও, করপোরেট ব্যবসায়ীরাও বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বস্তিতে নেই। কারফিউর কারণে শ্রমিকরা কারখানায় কারখানায় পৌঁছাতে না পারায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে সার্বিক রপ্তানিতে বড় ধাক্কা লাগবে সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণিই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এছাড়া শুক্রবার থেকে দেশের ইন্টারন্টে সেবা বন্ধ থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠানকে পড়তে হবে বড় ধরনের লোকসানে। কারণ বর্তমান সময়ে আমাদের ব্যবসা বাণিজ্যের প্রায় সব কিছুই ইন্টারনেট-নির্ভর হয়ে পড়েছে। কিন্তু ইন্টারনেট বন্ধ থাকার ফলে বায়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা। ব্যাংক বন্ধ থাকায় লেনদেন হচ্ছে না। এ বিষয়গুলো আমাদের সার্বিক অর্থনীতিতেও ব্যাপক প্রভাব ফেলবে।

মূলত গত কয়েকদিনের সহিংস পরিস্থিতিতে আমাদের জীবনযাত্রা যেমন ব্যাহত করেছে পাশাপাশি ন্যুব্জ অর্থনীতিতেও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে। সহিংসতা চলাকালে আমাদের বেশ কিছু স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর হয়েছে। এগুলো মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদিও আন্দোলনের সঙ্গে এসবের কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না। এসব অবকাঠামো ঠিকঠাক করতেও সরকারকে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হবে। যার ধাক্কা নিঃসন্দেহে আমাদের মূল্যস্ফীতিতে লাগবে। জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির কারণে আমাদের মধ্যবিত্তরা এমনিতে ভোগ ব্যয় কমিয়েছেন। আশা করছেন মূল্যস্ফীতির উন্নয়নের। এখন মূল্যস্ফীতির ধাক্কা যদি আরও দীর্ঘায়িত হয় তবে মধ্যবিত্ত শ্রেণির অস্তিত্ব থাকবে না। আর নিম্ন শ্রেণির মানুষের কী হবে ভাবা যায়? 

লেখক: সাংবাদিক ও সংবাদ বিশ্লেষক

zakpol74@gmail.com