স্থবিরতা কাটিয়ে সচল হতে হবে

সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত পরিস্থিতি ও পরবর্তী সময়ে বিক্ষোভ-সহিংসতার প্রভাব পড়েছে দেশের প্রায় সব ক্ষেত্রে। টানা সহিংসতার পরিপ্রেক্ষিতে গত শুক্রবার রাত ১২টা থেকে দেশ জুড়ে কারফিউ জারি এবং সেনাবাহিনী মোতায়েনের পর রাস্তায় সাধারণ মানুষের চলাচল একেবারেই কম থাকলেও গতকাল থেকে এই সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে। তবে সহিংসতা থামলেও স্বাভাবিক হয়নি জনজীবন। সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনো আতঙ্ক।

ইন্টারনেট সেবা বন্ধ থাকায় বিদ্যুতের প্রি-পেইড গ্রাহকদের টাকা রিচার্জ করার চরম ভোগান্তি এখনো শেষ হয়নি। নানা রকম ভোগান্তি সহ্য করে কোনোমতে বিদ্যুতের কার্ড রিচার্জ করা গেলেও ইন্টারনেট না থাকায় অনলাইনে কোনো ধরনের লেনদেন, ফ্রিল্যান্সিং, ই-কমার্স, কলসেন্টার, আইটি রপ্তানি, জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, শিক্ষাসহ বিভিন্ন অনলাইন সেবা পুরোপুরি বন্ধ হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের চরম দুর্ভোগ যেমন বেড়েছে, অন্যদিকে বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন এ খাতের ব্যবসায়ীরা। অনলাইনে খাবার ও পণ্য কেনাবেচা, রাইড শেয়ারিংসহ অ্যাপসভিত্তিক অন্যান্য সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানও তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে না।

ব্যাংক খাতেও তৈরি হয়েছে সংকট। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলোতে বড় সমস্যা দেখা দিয়েছে। ইন্টারনেট না থাকায় কাজে ব্যাঘাত ঘটছে। ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ঘরে বসে টাকা লেনদেন করা যাচ্ছে না। তবে এটিএম বুথের মাধ্যমে টাকা উত্তোলনের সুযোগ থাকলেও সেখানে চাপ বেড়ে যাওয়ায় অনেক বুথে পর্যাপ্ত টাকা থাকছে না। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বেশ কিছু গুজব ছড়িয়ে পড়ায় অপতথ্যের শিকার হয়েছে মানুষ। সমস্যায় পড়েছে গণমাধ্যমগুলো। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘বাংলাদেশের এই কঠিন সময়ে ইন্টারনেট বন্ধ রাখা উদ্বেগের। বিশেষ করে অবাধ তথ্যপ্রবাহের স্বাধীনতা ক্ষুন্ন হচ্ছে।’ আমরা অনতিবিলম্বে ইন্টারনেট সংযোগ সচল করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। বাস্তবতার নিরিখে ইতিমধ্যে সরকার পরীক্ষামূলকভাবে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট চালুর কথা জানিয়েছে। আশা করি অচিরেই স্থায়ীভাবে ইন্টারনেট চালু করা হবে।

চলমান সহিংসতায় স্থবির দেশের শিল্পকারখানার চাকা। অন্যদিকে অটোমেশন কার্যক্রম চালু করতে না পারায় রপ্তানিমুখী পণ্য জাহাজীকরণও করা যাচ্ছে না। সব মিলিয়ে শিল্পে শঙ্কার ছায়া দেখা যাচ্ছে। চার দিন ধরে গার্মেন্টস কারখানা বন্ধ। এই অচলাবস্থায় দেশের পোশাক খাতে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে বলে পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ থেকে জানানো হয়েছে। দেশের ২ হাজার ২০০ গার্মেন্টস কারখানায় প্রায় ৪২ লাখ শ্রমিক কাজ করছে। এই শ্রমিকদের বেতনের পাশাপাশি বিদ্যুৎসহ নানাবিধ ইউটিলিটি বিলের খরচও অনেক টাকা। শুধু পোশাক খাতই নয়; দেশের সিমেন্ট, রড শিল্পসহ নানাবিধ খাতের সব কারখানা বন্ধ রয়েছে। এসব কারখানায় লাখ লাখ শ্রমিক কাজ করত। কিন্তু দেশের উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে এখন সব বন্ধ রয়েছে। শিল্প খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেশের কর্মহীন মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাবে এবং এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের অর্থনীতিতে।

যেকোনো দুর্বিপাকে পরিস্থিতির প্রথম শিকার হন দেশের দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষ। সাম্প্রতিক ঘটনাটিও এর ব্যতিক্রম নয়। চলমান সহিংসতা থেকে দেশবাসীকে রক্ষায় চার দিন ধরে কারফিউ চলছে। এতে দোকানপাট ও বাজারগুলো প্রায় বন্ধ। ভাসমান মানুষ যারা দিন আনে দিন খায়, তাদের আয় বন্ধ হয়ে আছে। পণ্যের সরবরাহ ঘাটতির কারণে ভোগ্যপণ্যের দাম আকাশ ছুঁয়েছে। সাধারণ চাকুরেদেরও পকেটে টান পড়েছে। ব্যাংকিং চ্যানেল বন্ধ থাকায় নগদ টাকার সংকটে নাগরিকরা। বর্তমান আধুনিক প্রযুক্তিতে অনেকেই ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট কার্ড, বিকাশ, নগদসহ বিভিন্ন ব্যাংকিং লেনদেনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় সব সার্ভিস অচল হয়ে নাগরিক দুর্ভোগ বাড়িয়েছে।

দেশ জুড়ে যে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে অবিলম্বে তা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। মানুষের রুটি-রুজির অনিশ্চয়তা বাড়তে দেওয়া যাবে না। জনজীবন স্বাভাবিক করতে, অর্থনীতির চাকা সচল করতে দ্রুত সব খুলে দেওয়ার পদক্ষেপ নিতে হবে।