ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলনের রসায়ন

যুগে যুগে দেশে দেশে ছাত্র আন্দোলন হয়ে আসছে। কখনো তারা সফল হয়েছে, কখনো ব্যর্থ। লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র

পৃথিবীর ইতিহাসে অমর এক আন্দোলন হয়েছে ভাষা নিয়ে। তখনকার পূর্ব পাকিস্তান তথা বর্তমান বাংলাদেশের বুকে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সেই আন্দোলন করেছিল ছাত্রছাত্রীরা। অনন্য এ আন্দোলনে তারা বুকের রক্ত ঢেলে দাবি আদায় করেছে। ইতিহাসবিদরা বলেন, সেই আন্দোলনে স্বাধীন বাংলাদেশের বীজ বপণ হয়। এরপর শিক্ষা আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থানের পথ বেয়ে চলা মুক্তিযুদ্ধেও ছাত্রছাত্রীদের অংশগ্রহণ নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। সেই থেকে একটা কথা বাংলাদেশে চালু আছে, ছাত্রছাত্রীরা না নামলে কোনো আন্দোলন সফল হয় না। যার সর্বশেষ প্রমাণ পাওয়া গেল কোটা সংস্কার আন্দোলনে। সেখানেও তারা সফল। মাঝখানে নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের কথাও বলতে হয়।

তবে শুধু বাংলাদেশে নয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশেও ছাত্রছাত্রীরা তাদের দাবি আদায়ে সফল হয়েছে। কখনো কখনো নিজেদের জন্য আন্দোলন করলেও, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা গেছে জাতীয় ও আদর্শিক স্বার্থে তারা সোচ্চার হয়েছে। এমন আন্দোলনের কয়েকটি দিক এ ক্ষেত্রে লক্ষ করার মতো। তাদের যে কোনো আন্দোলনের সারবস্তু বা পদার্থ হলো তারা আদর্শিক, নৈতিক ও জনস্বার্থের পক্ষে থাকে। আর তাদের আন্দোলন জমে ওঠার রসায়ন হলো আবেগ ও সংগঠিত অবস্থা। শিক্ষার্থীরা বয়সের কারণে অনেক রোমান্টিক উত্তেজনায় ভোগে। জৈবিক বয়সের এমন একটা অবস্থায় তারা তখন থাকে; যখন প্রেম, রোমাঞ্চ, বিপ্লব এসব দ্বারা তারা অনুপ্রাণিত হয়। তাদের ভেতর সম-স্বার্থবোধ কাজ করে। অন্যান্য জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে যা সেভাবে কাজ করে না। এসব কারণে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন সহজে দানা বাঁধে এবং সফল পরিণতির দিকে যায়।

স্বভাব ও ধর্ম

বিশ্বের ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলনগুলো প্রায় সবই গড়ে উঠেছে আদর্শ ও নৈতিকতার ভিত্তিতে। দীর্ঘ সময় ধরে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন ও মার্কসবাদ দ্বারা অনেক শিক্ষার্থী উদ্বুদ্ধ হয়ে আসছে। যার দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থীরা দেশ, সমাজ, রাষ্ট্রের দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়। যেমনটি হয়েছিল ফ্রান্সে। লুই আলথুসার সেই আন্দোলনকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। তার দ্বারা আন্দোলিত হয়েছেন। তার অভিজ্ঞতার মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলনের স্বভাব ও ধর্মকে কিছুটা বুঝতে পারা যায়। তবে তার আগে মার্কসবাদী রাজনীতির ভাবধারা এবং তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের কিছু ঘটনাকেও বুঝতে হবে। এ ক্ষেত্রে চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কথা উল্লেখ করতে হয়। মাও সে তুংয়ের নেতৃত্বে চীনে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সংঘটিত হলে সেখানকার সরকার কর্র্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠে। যার বিরুদ্ধে চীন দেশের শিক্ষার্থীরা সোচ্চার হয়। তারা দেশীয় সংস্কৃতিতে সরকারি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে মাঠের লড়াইয়ে নেমে পড়ে। সরকারি দমন-পীড়নের মুখে যা হয়ে ওঠে রক্তাক্ত। আলথুসারের পর্যবেক্ষণ হলো, চীনের সাংস্কৃতিক সংগ্রাম দ্বারা প্রভাবিত ছিল ফরাসি ছাত্রছাত্রীদের বিদ্রোহ। সেখানে তিনি দেখাচ্ছেন, সরকার রাষ্ট্রের কলকব্জা কাজে লাগিয়ে শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ভাবাদর্শ প্রতিষ্ঠা করে থাকে। শিক্ষার্থীরা যখন সেটা বুঝে ফেলে, তারা বিদ্রোহ করে বসে। মূলত পুঁজিবাদী ভাবাদর্শ ও কর্র্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে তারা আন্দোলনে নামে। ১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি পর্যায়ে শুরু হওয়া ফ্রান্সের ওই ছাত্র আন্দোলন বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় থেকে মাধ্যমিক এমনকি শ্রমিকদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। যদিও সে আন্দোলন সফলতার মুখ দেখেনি। তবে এর প্রভাব ছিল ব্যাপক। ইউরোপ জুড়ে রাজনীতি ও মতাদর্শের ক্ষেত্রে যার প্রভাব দীর্ঘ প্রভাব ফেলে। 

অন্যদের সম্পৃক্ততা

ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলনে অন্যদের সম্পৃক্ত হওয়ার ঘটনা অন্যান্য ক্ষেত্রেও দেখা যায়। যেমন বাংলাদেশে ভাষা আন্দোলনেও দেখা গিয়েছিল। ছাত্রছাত্রীরা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আহত বা নিহত হলে তা নিয়ে গোটা দেশে আলোড়ন উঠে যায়। পাকিস্তানি সরকারি বাহিনীর গুলিতে ছাত্রদের হত্যার প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন স্থানে ক্ষুব্ধ জনতা রাস্তায় নেমে পড়ে। তারা বিক্ষোভ দেখায়। স্বৈরশাসক পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে তারাও আন্দোলনে শামিল হয়। যার মাধ্যমে আন্দোলন আরও গতিলাভ করে এবং সাফল্য পায়। একই ঘটনা দেখা গেছে স্বাধীন বাংলাদেশে নব্বইয়ের দশকে। স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনও শুরু হয় ছাত্রদের মধ্য থেকে। এর পরিণতিও আসে ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলনের ফলে। গবেষক ও শিক্ষক হেলাল মহিউদ্দিন নব্বইয়ের আন্দোলন নিয়ে লেখা তার একটি বইয়ে বলেছেন, ‘ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের ব্যাপকতার সঙ্গে নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের বৈসাদৃশ্য যেমন রয়েছে, সাদৃশ্যও রয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে শ্রমজীবী সংগঠনসমূহের অবস্থান নব্বইয়ের গণআন্দোলনে ঊনসত্তরের চেয়েও অধিক সুস্পষ্ট ছিল। তথাপিও এটা সত্য যে, নব্বইয়ের গণআন্দোলন ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের মতো সর্বব্যাপ্ত ছিল না, কিংবা প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের সব ধর্ম-বর্ণ এবং জাতি-পেশার মানুষকে অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করেনি। একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, রাজধানীকেন্দ্রিক, বিশেষত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক রাজনীতিই সারা দেশের রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে।’ 

বাংলাদেশে এক-এগারোর সেনাশাসিত শাসনামলেও দেখা গেছে ছাত্রছাত্রীরা প্রথম অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। তাদের প্রতিরোধের মুখে তখনকার সরকার পিছু হটে। সেই আন্দোলনেও ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে ধীরে ধীরে সমাজের অন্যান্য পেশার লোকজন যুক্ত হতে থাকে। যার ফলে সরকারের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয় এবং তারা নমনীয় হয়।

মধ্যবিত্ত শ্রেণি

ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলন গভীরভাবে প্রভাব তৈরি করে যেকোনো দেশের সমাজ ও রাজনীতিতে। কারণ ছাত্রছাত্রীরা মধ্যবিত্ত শ্রেণিভুক্ত। আর্থিক বা সাংস্কৃতিক অবস্থান ভিন্ন হলেও, শিক্ষাগত কারণে একই ক্যাম্পাসে থাকার ফলে ছাত্রছাত্রীরা মধ্যবিত্ত শ্রেণিভুক্ত হয়। যেকোনো দেশ পরিগঠনে এ শ্রেণি মূল ভূমিকা পালন করে। হেলাল মহিউদ্দিন যেমনটি লিখেছেন তার বইয়ে, ‘বাংলাদেশে নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক সমাজতাত্ত্বিক গুরুত্ব অপরিসীম, যদিও গভীর চুলচেরা বিশ্লেষণে এই অভ্যুত্থানকে বিদ্যমান রাষ্ট্রকাঠামোর পরিবর্তনের জন্য একটি রাজনৈতিক কার্যকলাপ মাত্রই মনে হয়। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এই আন্দোলন-অভ্যুত্থানের ব্যাপকতা তেমন অনুভূত হয়নি। শোষিত শ্রমজীবী ও কর্মজীবী শ্রেণির ব্যাপক অংশগ্রহণও পরিলক্ষিত হয়নি। তবু ঢাকাকেন্দ্রিক আন্দোলনের উত্তাল স্রোতে সব শ্রেণি-পেশার জনগণের অংশগ্রহণে রাজধানীকেন্দ্রিক গণঅভ্যুত্থানটি হয়ে উঠেছিল অপ্রতিরোধ্য। মধ্যবিত্ত শ্রেণি-পেশার জনগণ ছিল নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মূল ক্রীড়নক। ঢাকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ছাত্ররাই ছিল অভ্যুত্থানটির প্রকৃত প্রাণশক্তি। এই ছাত্রসমাজ প্রকৃত অর্থে মধ্যবিত্ত শ্রেণিরই প্রতিভূ। তাই অনেকেই নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানকে একটি বুর্জোয়া অভ্যুত্থান এবং শুধুমাত্র ক্ষমতা-পরিবর্তনযজ্ঞ ছাড়া অন্য কিছু বলে মেনে নিতে রাজি নন। তাদের মতে এতে সামাজিক কাঠামোর অন্তর্গত বৈষম্যমূলক ও শোষণমূলক উপাদানসমূহে কোনো পরিবর্তনই হয়নি। শাসন ক্ষমতার হাতবদল হয়েছে মাত্র।’     

যদিও এ ধরনের বিশ্লেষণকে ঠিক মনে হয় না। কারণ নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের ফলে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক চেতনা শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়ায়। এ আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ধারণা সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। এ থেকে বুঝা যায়, ছাত্রআন্দোলনের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। যাকে যুগান্তকারী বলে অভিহিত করা যায়।

বন্ধুত্ব ও পিছুটান

একই ক্যাম্পাসে থাকার কারণে ছাত্রছাত্রীরা সহজে বন্ধু হতে পারে। একই হল, পরিবহন, প্রশাসন, ক্যাম্পাস নানা কারণে তারা সমস্বার্থে জড়িয়ে যায়। যে কারণে একজনের বিপদে অন্যরা এগিয়ে আসতে তাড়না বোধ করে। কেউ সমস্যায় পড়লে সহজে খবর রটে যায়। সংঘবদ্ধ হতেও তাদের সময় লাগে না। আবার বিপদে পড়লেও তারা ঘুরে দাঁড়াতে পারে একসঙ্গে। এই বন্ধুত্ববোধ ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলনকে দ্রুত গতি দেয়। আবার এ বয়সে তাদের আবেগ বেশি কাজ করে। একইসঙ্গে পিছুটানও থাকে না। তারা যেহেতু চাকরি, সংসার এসব বিষয়ে দায়িত্ব নেওয়ার বয়স বা অবস্থানে পৌঁছায় না, ফলে পিছুটানও কাজ করে কম। যে কারণে বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে। আবেগের সঙ্গে নিজেকে নির্দিষ্ট সমাজ, পরিবারের দায়িত্ব থেকে মুক্ত ভাবতে পারার বোধ আন্দোলনে তাদের আরও সম্পৃক্ত করে।

এ ছাড়া ইতিহাস, ঐতিহ্যও ছাত্রদের উদ্বুদ্ধ করে দাবি আদায়ে সক্রিয় থাকতে। যেমন বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ এক বিরাট অনুপ্রেরণা হয়ে দেখা দেয় যে কোনো ছাত্রআন্দোলনে। শুধু মুক্তিযুদ্ধ বা নব্বইয়ের আন্দোলন নয়, পরবর্তী বিভিন্ন সময়েও ছাত্রছাত্রীরা তাদের অধিকার আদায়ে এ দেশে আন্দোলন করেছে। সে হিসেবে বাংলাদেশে ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলন একটি সংস্কৃতি হিসেবে গড়ে উঠেছে। যা অনুপ্রাণিত করছে যুগের পর যুগ ধরে। ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলন সহিংস বাধার মুখে পড়বে এটাও স্বাভাবিক। কারণ তারা যে দাবিতেই আন্দোলন করুক না কেন তা ক্ষমতা কাঠামোর দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়। কারণ শিক্ষার্থীদের স্বার্থ শাসনব্যবস্থার নীতি প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত। তাদের দাবি আদায়ে সরকারি নীতি পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়। সেটা সড়ক দুর্ঘটনা হোক বা বেতন-ফি বৃদ্ধি। সরকারি নীতিকে প্রশ্ন করাই ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলনের আরেক রসায়ন। আর সবচেয়ে বড় বিষয় তারা আন্দোলন করে আদর্শ ও নীতির ভিত্তিতে। অন্যায় দাবি, শুধু নিজের স্বার্থে কথা বলতে ছাত্রছাত্রীদের দেখা যায় না। তারা আদর্শ চরিত্রের হয়ে থাকে। একের বিপদে অন্যে এগিয়ে আসার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ক্ষতি হয় এমন অনৈতিক দাবি তাদের থাকে না। তারা এমন দাবিই করে থাকে যাতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম সুফল ভোগ করতে পারে। তাদের আন্দোলন আগামীর পথ রচনা করে, ভবিষ্যতের দিগন্তকে উন্মুক্ত করে। ছাত্রছাত্রীরা আজ যে আন্দোলনটি করছে, এর সুফল যত দিন যাবে তত বাড়বে। সমাজের সব শ্রেণির মানুষের পক্ষে তা কল্যাণকর হয়।