১৯৫২ থেকে ৫৪, ৫৬, ৬২, ৬৪, ৬৯, ৭১ এবং ৯০ সালে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ছিল এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। ১৯৬২ সালের পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষা আন্দোলনের সরকারি নাম ছিল কমিশন অন ন্যাশনাল এডুকেশন। নীতিমালায় ইংরেজি ও উর্দু ভাষাকে বাধ্যতামূলক করার কথা ছিল। এরপর পূর্ব পাকিস্তানের বিরোধীদলীয় নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এ বিষয়ে গভর্নর গোলাম ফারুক খানের সঙ্গে দেখা করেন। একই সঙ্গে চলতে থাকে আন্দোলন। ফলে সরকার শরিফ কমিশনের সুপারিশ স্থগিত করতে বাধ্য হয়। ১৯৬৯-এর ১১ দফা, ’৮০-এর দশকের ৫ দফা, ’৯০ সালের ১০ দফা ছাত্র আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হয় ২০১৩ সালে। এরপর ২০১৮ সালে আন্দোলনের পর আন্দোলনকারীদের পক্ষে পরিপত্র ঘোষণা করা হয়। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক এই পরিপত্র ২০২৪ সালে অবৈধ ঘোষণা করায় পুনরায় আন্দোলন শুরু হয়। গতকাল পর্যন্ত আন্দোলনে ব্যাপক প্রাণহানি হয়েছে। আহত হয়েছেন কয়েক হাজার। আপাতদৃষ্টিতে এখন আর আন্দোলনের প্রয়োজন নেই। শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নেওয়া হয়েছে। কোটা সংস্কার করা হয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যারা আন্দোলন করেছেন, সেই সব শিক্ষার্থীর সার্বিক নিরাপত্তা কে দেবে? এ বিষয়ে তারাও নিরাপত্তা চেয়েছেন। সরকারও বলছে, তাদের নিরাপত্তা দেওয়া হবে। এ বিষয়ে বুধবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ‘শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা দেওয়া হবে’ প্রতিবেদনের মাধ্যমে জানা যাচ্ছে কোটা আন্দোলন নিয়ে সহিংস পরিস্থিতি ও সার্বিক বিষয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে এক সংবাদ সম্মেলনে। বলা হয়েছে, আন্দোলনকারী সাধারণ শিক্ষার্থীদের মামলার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হবে। ছাত্রছাত্রীদের সুরক্ষা ও শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করবে সরকার। আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসার দেখভাল করা হবে। তবে আন্দোলনে সহিংসতার দায় আক্রমণকারীদের।
মঙ্গলবার আইন, বিচার ও সংসদবিষয়কমন্ত্রী আনিসুল হকের গুলশানের বাসভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আনিসুল হকসহ আরও উপস্থিত ছিলেন জনপ্রশাসনমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন, শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এবং তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত। এখানে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বক্তব্য এসেছে। সহিংসতার প্রস্তুতির পরেও দেশের প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থা ব্যর্থ হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নে তথ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন ‘যেহেতু বিষয়টি সাবজুডিস ম্যাটার, সরকার ধৈর্য ধরতে বলেছিল। এখন তাই তো হলো। একটু ধৈর্য ধরলে তাদের আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে সন্ত্রাসীরা যে কর্মকান্ড করল, এটা আমরা গ্রহণ করতে পারছি না।’ কোটা আন্দোলন নিয়ে সহিংসতার ঘটনার বিচার কোন আইনে হবে, কিংবা দ্রুত বিচার আইনে হবে কি না এমন প্রশ্নে আনিসুল হক বলেন, ‘আইন যেটা লঙ্ঘন করা হয়েছে, সেই আইনে বিচার হবে। তদন্ত প্রতিবেদন আসুক, তারপর দেখা যাবে কোন আইনে বিচার হবে।’ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে কতজন শিক্ষার্থী মারা গেছে এবং নিহতদের পরিবারের বিষয়ে সরকারের কোনো উদ্যোগ থাকবে কি না এমন প্রশ্নে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে যখন ভাষণ (বুধবার) দেন, তখন তিনি বলেছেন। তখন যারা মৃত্যুবরণ (মঙ্গলবার ৬ জন) করেছিল, সেই হতাহতের ব্যাপারে তিনি বলেছেন ব্যবস্থা নেবেন। আমরা সে পথেই আছি।’ সামনে পরিস্থিতির কোনো অবনতি হবে কি না এমন প্রশ্নে আনিসুল হক বলেন, ‘সমস্যার সমাধান যেহেতু করে দিয়েছি, আমাদের বিশ্বাস নতুন করে আর কোনো সমস্যা তৈরি হবে না এবং এই পরিস্থিতির অবনতি হবে না। যদি কোনো অপশক্তি পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করে, সেটার ব্যাপারে আমরা কঠোর ব্যবস্থা নেব।’
মূল কথা হচ্ছে, আন্দোলনে জড়িত শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিয়েছে, তা সরকারকেই দূর করতে হবে। এর জন্য যা করা প্রয়োজন, তাই-ই যেন করা হয়। কারণ অতীতের বিভিন্ন সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন আন্দোলনের সময় অনেক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। কোনো হত্যাকান্ডের বিচার হয়নি। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে সরকার সব হত্যাকান্ডের কঠোর বিচার করবে। শিক্ষার্থীরা যেন কোনোভাবেই আশাহত না হন। তাদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার শঙ্কা সরকারকেই দূর করতে হবে।