আগামী ২৬ জুলাই, শুক্রবার জমকালো অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উদ্বোধন হবে প্যারিস অলিম্পিকের। এবারই প্রথম অলিম্পিকের কোনো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন হতে যাচ্ছে বদ্ধ স্টেডিয়ামের বাইরে। প্যারিসের বিখ্যাত স্থাপনা আইফেল টাওয়ার এবং সেইন নদী ঘিরে অনুষ্ঠিত হবে মনোমুগ্ধকর এ আয়োজন। নদীর ৬ কিলোমিটার পথ জুড়ে বিস্তৃত থাকবে আজ রাত সাড়ে ১১টায় শুরু হতে যাওয়া এই অনুষ্ঠান।
অলিম্পিক উদ্বোধনী শুরু হয় অংশগ্রহণকারী অ্যাথলেটদের প্যারেডের মধ্য দিয়ে। এতদিন তা হয়ে এসেছে আয়োজক রাষ্ট্রের মূল স্টেডিয়ামে। এবারই প্রথম সেই প্রথা ভাঙতে যাচ্ছে ফ্রান্স। এবারের স্লোগান ‘গেমস ওয়াইড ওপেন’কে গুরুত্ব দিয়ে রাজধানী প্যারিসের সেইন নদীতে ভাসবেন অ্যাথলেটরা। প্রায় ৭ হাজারের মতো বিভিন্ন ডিসিপ্লিনের অ্যাথলেট ৮৫টি তরীতে চেপে অস্টারলিজ সেতু থেকে যাত্রা শুরু করে ৬ কিলোমিটার নৌপথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছাবেন আইফেল টাওয়ারে।
বিশেষভাবে তৈরি স্ট্যান্ড থেকে প্রায় ৫ লাখ দর্শক চাক্ষুস উপভোগ করবেন এ প্যারেড। বিশেষ এই স্ট্যান্ড থেকে আয়োজন উপভোগ করতে টিকিটের পেছনে ২ হাজার ৭০০ ইউরো পর্যন্ত খরচা করতে হচ্ছে দর্শকদের। তবে নদী পাড় থেকে বিনামূল্যেই উপভোগ করা যাবে অনুষ্ঠান। এবারের আয়োজনের প্রধান আয়োজক টনি এস্তানগুয়েত বলেছিলেন, ‘বদ্ধ স্টেডিয়ামের পরিবর্তে সেইন নদীতে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আয়োজন করা একেবারেই সহজ কাজ নয়, তবে এর মধ্যে বাড়তি উত্তেজনা রয়েছে।’
বিনোদনের যেসব ব্যবস্থা থাকছে:
সেইন নদী ঘিরে পুরো আয়োজনের পরিকল্পনা সাজিয়েছেন বিশ্বখ্যাত নাট্যনির্মাতা থমাস জলি। ৪২ বছর বয়সী এ নির্মাতা বিশ্বজুড়ে নন্দিত হয়েছেন তার রক-অপেরা মিউজিক্যাল ‘স্টারম্যানিয়া’র সৌজন্যে। তার সৃজনশীল দলে রয়েছেন ফরাসি টিভি সিরিজ ‘কল মাই এজেন্ট’-এর রচয়িতা ফ্যানি হেরেরো। আরও আছেন বেস্ট সেলিং লেখক লেইলা সিøমানি এবং প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ প্যাট্রিক বুকেরন। পুরো আয়োজনটি সাজানো হয়েছে ১২টি ভিন্ন ভাগে। প্রায় ৩ হাজার নৃত্যশিল্পী, সংগীতশিল্পী এবং বিনোদনকারী নদীর পাড়, সেতু এবং পার্শ্বস্থ স্থাপনাগুলোতে নিজেদের ঝলক দেখাবেন। ২০১৯ সালে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর পুনর্নির্মিত বিখ্যাত নটর ডেম ক্যাথেড্রালেও থাকবে বিশেষ আয়োজন।
পুরো আয়োজনটির তিনভাগের দুই ভাগ অনুষ্ঠিত হবে দিনের আলোয়। গ্রীষ্মকালের প্যারিসের চোখ জুড়ানো সূর্যাস্তের দৃশ্যও নিয়ে আসা হবে আয়োজনের মধ্যে। আর পুরো আয়োজনে সমাপ্তি হবে রাতের আঁধারে লাইট শো-এর মাধ্যমে। সংগীতায়োজনের মধ্যে থাকবে ক্লাসিক্যাল, র্যাপ, রেট্রো এবং ঐতিহ্যবাহী ‘চ্যানসন ফ্রাঙ্কোয়া’। শিল্পীদের মধ্যে থাকেন মালি বংশোদ্ভুত জনপ্রিয় ফরাসী শিল্পী আয়া নাকামুরা। ফরাসি ইলেক্ট্রো তারকা ডাফট পাঙ্ককে আমন্ত্রণ জানানো হলেও তিনি ফিরিয়ে দিয়েছেন তা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বার্তা:
টমাস জলির কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে তিনি উত্তর দেন পুরো আয়োজনের প্রধান বার্তা হবে ‘ভালোবাসা’। আয়োজনটি হবে সাংস্কৃতিক, ভাষাতাত্তি¡ক, ধর্মীয় এবং যৌন বৈচিত্র্যের উৎসব। এ কারণে রক্ষণশীলদের তীর্যক মন্তব্যের শিকারও হতে পারে আয়োজন। জলি জানান, ‘আমার মনে হয় যারা পৃথিবীর বৈচিত্র্যের মধ্যেই জীবন কাটাতে চান তারাই সংখ্যায় বেশি, তবে এ মানুষগুলো সর্বদাই নিভৃতে থাকতে পছন্দ করেন।’
ধুম ধাড়াক্কা আয়োজনসমূহ:
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের চমকগুলো প্যারিস অলিম্পিকের আয়োজক গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে যতটুকু সম্ভব গোপন রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। এর মধ্যেও সংগীতায়োজনে আলো কাড়বেন আয়া নাকামুরা। এছাড়াও জলি ইঙ্গিত দিয়েছেন আয়োজনের মধ্যে যেকোনো সময় সেইন নদী ফুঁড়ে প্রকট হতে পারে কোনো সাবমারসিবল যান কিংবা সাবমেরিন। জলি বলেন, ‘আপনার কাছে আকাশ রয়েছে, সেতু রয়েছে, পানি, নদীর পাড় রয়েছে। একটা সুন্দর কবিতা সৃষ্টির জন্য আপনার উপকরণের অভাব নেই। তাহলে কেন নদীর তলদেশ ব্যবহার করব না আমরা!’
এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন একশোর বেশি রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা। স্পর্শকাতর এ অনুষ্ঠানের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণেও তাই নেওয়া হয়েছে কড়া পদক্ষেপ। প্রায় ৪৫ হাজার প্যারামিলিটারি অফিসার মোতায়েন থাকবেন অনুষ্ঠান জুড়ে। এর সঙ্গে থাকবেন ১০ হাজার সেনা এবং ২০ হাজার ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকর্মী।