খিলগাঁও ভূঁইয়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা সাগর হোসেন (২২)। তিনি পেশায় রিকশাচালক। গত শনিবার দুপুরের দিকে এক যাত্রী নিয়ে বনশ্রীর ভেতর থেকে রামপুরা ব্রিজে যাচ্ছিলেন। পথে বনশ্রীতে আসতেই সংঘর্ষ ও গোলাগুলির শব্দ শুনে আইডিয়াল স্কুলের সামনে যাত্রী নামিয়ে দেন বাসায় চলে যাবেন বলে। সাগর জানান, দুপুর হয়ে গেছে, বাসায় গিয়ে ভাত খাবেন, রিকশা থেকে নামতে নামতে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে যাত্রীকে এ কথা বলছিলেন তিনি। তখন আকাশে হেলিকপ্টার চক্কর দিতে দেখেন। এর মধ্যে হঠাৎ তার বাম পায়ে গুলি লাগে। একপাশ থেকে বুলেট ফুটো হয়ে অন্যপাশ দিয়ে বের হয়ে যায়। কে বা কারা প্রথমে তাকে বনশ্রী ফরাজী হাসপাতালে নিয়ে যায়, পরে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে এলে তার স্বজনদের খবর দেওয়া হয়। পাঁচ দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি তিনি। পায়ে গুলি লাগার বিষয়ে জানতে চাইলে গতকাল ব্যথায় কাতর সাগর কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘ভাগ্যে এমন ছিল, তাই আজ গুলিবিদ্ধ।’
সাগর হোসেনের মতো গুলিবিদ্ধ হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বিছানায় শুয়ে ভাগ্যকে দুষছেন আরও অনেকে। তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ইমন রহমান (৮) থাকে রাজধানীর নতুন বাজার এলাকায়। প্রতিদিনের মতো গত শুক্রবারও বাসার সামনের রাস্তায় বসে খেলাধুলা করছিল ইমন। হঠাৎ বিকট শব্দ শুনে দৌড়ে নতুন বাজার মেইন রোডে আসে কী হয়েছে তা দেখতে। এসেই দেখে রাস্তায় দৌড়াদৌড়ি করছে লোকজন। সেখানে আগুন জ্বলতেও দেখতে পায় সে। এর কিছুক্ষণ পরেই কী যেন হয়ে গেল। ইমনের দুই পা গুলিবিদ্ধ হয়। পাঁচ দিন ধরে ঢাকা মেডিকেলে কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সে।
গতকাল ইমনকে নিয়ে ঢামেক হাসপাতালের বারান্দায় বসেছিলেন তার বাবা সুমন মিয়া। রিকশাচালক সুমনের চোখেমুখে ছিল চিন্তার ভাঁজ। ঘটনার দিন রিকশা চালানো বন্ধ রেখে বাসায় ছিলেন তিনি। সুমন মিয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘টানাপড়েনের সংসারে ছেলের এমন অবস্থায় কী করে কী করব কিছুই বুঝতে পারছি না। তিন ভাইবোনের মধ্যে ইমন বড়। পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী আমি একা। ছেলের ডাক্তার খরচ ক্যামনে জোগাড় করব, আর ক্যামন করে আমার পরিবার চলবে কিছুই বুঝতে পারছি না। সবই ভাগ্যের খেলা।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইমনের বাঁ পায়ে তেমন একটা ক্ষতি হয়নি। ছররা গুলিগুলো বের করে ফেলছে। তবে ডান পায়ের অবস্থা খারাপ। ডান পায়ে বুলেট এক পাশ থেকে ঢুকে মাংস নিয়ে অন্য পাশ দিয়ে বের হয়ে গ্যাছে। ডাক্তার আশঙ্কামুক্ত বললেও ধারণা করা হচ্ছে, ডান পা আর কাজ করবে না।’
সাভার থেকে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি আছেন ইসরাফিল হোসেন (৫০)। তার ডান হাতে ও পেটে গুলিবিদ্ধ হয়। পুরো শরীর যেন সাদা কাপড় দিয়ে বাঁধা। ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতে ইসরাফিল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাভারে আমার একটি মুদি দোকান আছে। গত শনিবার বিকেলে হঠাৎ ৩০-৪০ জন যুবক এসে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল মারতে থাকে। এটা দেখে আমি দোকান বন্ধ করে দিই। পুলিশও টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড মারতে থাকলে রণক্ষেত্র হয় সাভার বাসস্ট্যান্ড এলাকা। দোকান থেকে বের হয়ে দৌড়ে যেতেই হঠাৎ আমার হাতে, পেটে ও বুকে গুলি লাগে। আমার অপারেশন হয়েছে। ডাক্তার বলছেন, এখন অনেক ভালো আছি। কিন্তু জানি না আগের মতো আবার সুস্থ হতে পারব কি না।’
কামরাঙ্গীরচর এলাকার হাজী আব্দুল আউয়াল ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী মো. সিয়াম হোসেন (১৯)। প্রতি ছুটির দিনের মতোই গত শুক্রবার বিকেলে মোটরসাইকেলে ঘুরতে বের হয়েছিলেন। ঢাকা কলেজের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ গোলাগুলি শুরু হলে তিনি গাড়ি থেকে পড়ে যান। পরে উঠে দৌড় দিলে তার পায়ে গুলি লাগে। তার দুই পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়।
ঢাকা মেডিকেলে কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন সিয়াম। গতকাল বৃহস্পতিবার কান্নাজড়িত কণ্ঠে সিয়াম বলেন, ‘কোনো আন্দোলন বা কোনো কাজে বের হইনি। প্রায়ই ছুটির দিনে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে বের হই, গত শুক্রবারও তেমনই ঘুরতে বের হইছিলাম। হঠাৎ ঢাকা কলেজের সামনে গেলে কী থেকে কী হয়ে গেল বুঝতে পারলাম না। আমার দুই পা-ই গুলিবিদ্ধ হয়।’ এক সপ্তাহ ধরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সিয়াম। তিনি আগের মতো হেঁটে আর কলেজে যেতে পারবেন না, এ কথা বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন।
ঢামেক হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান, কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে সহিংসতার ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালে গত ১৫ থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত আট দিনে ১ হাজার ৫৬০ জন চিকিৎসা নিয়েছে। তাদের মধ্যে ১ হাজার ১৮৯ জন রোগীকে চিকিৎসা শেষে ছেড়ে দেওয়া হয়। হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে ৩৭১ জন। গুরুতর আহত কয়েকজন রোগী আইসিইউতে ভর্তি আছে। ভর্তি রোগীদের অনেকেই ছাড়পত্র নিয়ে অন্য হাসপাতালে চলে গেছে। গতকালও ঢামেকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গুলিবিদ্ধ দুজন মারা গেছেন। তারা হলেন নরসিংদী থেকে আসা পোশাক কারখানার কর্মচারী জামান মিয়া (১৭) ও রাজধানীর রায়েরবাগের দিনমজুর জাকির হোসেন (২৯)।
গুলিবিদ্ধ ভর্তি রোগীদের বিষয়ে ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘সহিংসতার ঘটনায় গুলিবিদ্ধ কয়েকজন এখনো ভর্তি রয়েছে। তাদের চিকিৎসা চলছে। অনেকে চিকিৎসা নিয়ে চলে গেছেন।’
ঢামেক হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ (পরিদর্শক) বাচ্চু মিয়া বলেন, ‘সহিংসতার ঘটনায় গেল কয়েক দিন অনেক ব্যস্ততার মধ্যে কেটেছে। প্রতিদিন আহত অনেক রোগী এসেছে। অনেকে চিকিৎসা নিয়ে চলে গেছে। এখনো গুলিবিদ্ধ অনেক রোগী ভর্তি রয়েছে।’ ময়নাতদন্ত সূত্রের বরাতে তিনি জানান, সহিংসতায় আহতদের মধ্যে ঢামেকে ৯০ জনের মতো মারা গেছে।
শুধু সাগর, , ইমন, ইসরাফিল, সিয়াম নয় প্রায় পাঁচ শতাধিক পথচারী কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সহিংসতায় গুলিবিদ্ধ হয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পাশাপাশি তাদের রাজধানীর বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। পঙ্গু হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ১৭-১৯ জুলাই তিন দিনে ৩৩৬ জন সহিংসতায় আহত রোগী আসে। তাদের মধ্যে বেশিরভাগ ছিল গুলিবিদ্ধ।
জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, সহিংসতার মধ্যে পড়ে আহত ৪২৯ জন চিকিৎসা নিয়েছে। তাদের মধ্যে ২৯১ জনের চোখে অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। গুরুতর আহত আটজন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে।