মঞ্চে-নেপথ্যে

১৯৪৭ সালে ছাত্রাবস্থায় তিনি ‘দৈনিক আজাদ’-এ সাংবাদিকতা শুরু করেন এবং পরে বার্তা সম্পাদক হন। ১৯৫৪ সালে ‘আজাদ’-এর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার পর সেই বছরই ‘ইত্তেফাক’-এর বার্তা সম্পাদক পদে নিযুক্ত হন। ১৯৭০ সালে হন নির্বাহী সম্পাদক। ১৯৬৯-৭০ সালে ‘অনামী’ ছদ্মনামে লেখা অনবদ্য উপসম্পাদকীয় ‘মঞ্চে-নেপথ্যে’ কলামে উঠে এসেছে তৎকালীন রাজনীতির তীক্ষè পর্যবেক্ষণ এবং বিচার-বিশ্লেষণ। ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর তাকে শান্তিনগর, চামেলীবাগের বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায় পাকিস্তানি সৈন্য ও আলবদর-রাজাকাররা। এরপর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহপাঠী, ঘনিষ্ঠজন এবং একই পথের পথিক এই সাংবাদিকের আর খোঁজ পাওয়া যায়নি। অতীতের সঙ্গে অধুনার সংযোগ ঘটাতে ছাপা হলো, পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়ন এবং পাকিস্তান ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহীদ বুদ্ধিজীবী সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনের জনপ্রিয় উপসম্পাদকীয় ‘মঞ্চে-নেপথ্যে’

যে বিশাল মহিরুহের সুশীতল ছায়াতলে বসিয়া গত ১৫ বছর সাংবাদিকতা করিয়াছি, সে মহিরুহ আর নাই। ইত্তেফাক সম্পাদক জনাব তফাজ্জল হোসেন, বাংলার মানুষের ‘মোসাফির’ আজ আজিমপুরের কবরগাহে গভীর ঘুমে নিমগ্ন। যে মাটিকে আর মাটির যে মানুষকে তিনি ভালোবাসিয়াছিলেন, যাহাদের কল্যাণ কামনায় জীবনের বেশিরভাগ সময় তিনি মসির সাহায্যে নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম চালাইয়াছেন, সেই মাটি, সেই মানুষ ঠিকই আছে, নাই কেবল তিনি। আঘাতের পর আঘাত আসিয়া সমগ্র জাতিকে যখন মুহ্যমান করিয়াছে, ‘মোসাফিরের’ লেখনী তখন জাতির জীবনে সঞ্জীবনী সুধার কাজ করিয়াছে। হেন সমস্যা নাই, যা নিয়া তিনি সারগর্ভ যুক্তিনির্ভর, তাত্ত্বিক ও তাথ্যিক আলোচনা না করিয়াছেন। নিজে রাজনীতিক না হইয়াও রাজনীতিকদের তিনি পথ দেখাইয়াছেন, শ্রমিক-কৃষাণ-মজদুরের সমস্যার প্রতিকারের জন্য দরদি মন লইয়া সংগ্রাম করিয়াছেন। কোমলে-কঠোরে তিনি ছিলেন এক অনিন্দ্যসুন্দর চরিত্রের অধিকারী। অন্যায়ের সঙ্গে আপস তাহার জানা ছিল না। রক্তচক্ষুর কাছে আনতদৃষ্টি ছিল তাহার স্বভাববিরুদ্ধ। সম্পাদক হিসেবে পত্রিকার দায়িত্ব সদা সচেতন আদর্শ চরিত্রের এই মানুষটিকে ঘিরিয়া কত আশার জালই না আমরা বুনিয়াছি। স্বেচ্ছাচারিতার মুখে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা অক্ষুন্ন রাখার জন্য যে সংগ্রাম তিনি করিয়া গিয়াছেন, সংবাদপত্রের ইতিহাসে তা গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। বারে বারে কারাবরণ করিয়াছেন, পত্রিকার কণ্ঠ রুদ্ধ হইয়াছে, তবু স্বৈরাচারের নিকট নতিস্বীকার করেন নাই।

এই ইত্তেফাক ও ঢাকা টাইমস-এর সংবাদে আপত্তি জানাইয়া মোনায়েম-সরকার মামলা করিয়াছেন, বিচারে উচ্চ আদালত সে আপত্তি অগ্রাহ্য করিয়া সংশ্লিষ্ট সংবাদের প্রশংসা করিয়াছেন। জনগণের অভাব-অভিযোগের কথা বলিতে গিয়া ইত্তেফাক-এর বিরুদ্ধে ডিকেডি আমলে বেসরকারি পর্যায়ে দন্ডবিধির ৫০০ ধারার মোট ৪১টি মানহানির মামলা হইয়াছে। আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়াইতে হইয়াছে স্বয়ং সম্পাদককে। সম্পাদকের কর্মব্যস্ত জীবনে অনর্থক হয়রানি এড়াইবার জন্য যখন বলিয়াছি, ‘ফরিয়াদির যা বক্তব্য তা ছেপে দিলেই তো হয়; এ বয়সে কত আর সইবেন।’ জবাব শুনিয়া নিজেই লজ্জা পাইয়াছি। বলিয়াছেন, ‘পাপীর আবার মানহানি! আসুক-না আদালতে, কত বড় সম্মানী ব্যক্তি দেখা যাবে’। বলা বাহুল্য, ৪১ মামলার মধ্যে একটির ব্যাপারেও তিনি তার পত্রিকায় ফরিয়াদির ভাষ্য ছাপিতে দেন নাই। আর প্রত্যেকটি মামলায়ই তিনি আসামি হিসেবে সশরীরে আদালতে হাজির হইয়াছেন। ১৩টি মামলায় যথারীতি শুনানির পর তিনি বেকসুর খালাস পাইয়াছেন। অবশিষ্টগুলোতে ফরিয়াদিরা হয়রান হইয়া শেষ পর্যন্ত পিটঠান দিয়াছেন; মামলা খারিজ হইয়া গিয়াছে। ’৬৬ সালের ১৫ জুন গ্রেপ্তার হইয়া তিনি তৃতীয়বারের মতো কারাগারে গেলেন। তাহারও ৬ মাস পর কারাগারে বসিয়াই তিনি সমন পাইলেন ১১ মাস আগে ফেব্রুয়ারি সংখ্যা ইত্তেফাক-এর ‘হাসপাতাল হইতে রোগিণীর পলায়ন’ শীর্ষক ‘মিথ্যা সংবাদে’র জন্য বিচারের সম্মুখীন হইতে হইবে। গ্রেপ্তারকালে সরকার কর্তৃক রুজুকৃত একাধিক মামলার আসামি তো তিনি তখন ছিলেনই। এসব মামলায় জেলের মধ্যেই তার বিচার চলিতেছিল। ’৬৪-এর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বন্ধের আবেদন প্রচার করিতে গিয়া যে মামলায় তিনি আসামি হন, তাহারও বিচার চলিতেছিল। ইত্তেফাক বন্ধের প্রথম মামলায় বিজয়ী হইলেও পরক্ষণেই আবার নতুন করিয়া তাহার প্রেস বাজেয়াপ্তির নির্দেশ দেওয়া হয়। একটু নতি স্বীকার করিলেই প্রেস ফিরাইয়া পাইতে তাহার আদৌ বেগ পাইতে হইত না। প্রচুর ‘ভাগ্যও’ গড়িতে পারিতেন। কিন্তু সে লাভালাভের প্রতি তার বিন্দুমাত্র আসক্তি ছিল না।

কারাগারে সাক্ষাৎ করিয়া ইত্তেফাক কর্মচারীদের দুর্দশার কথা যেদিন নিবেদন করিয়াছিলাম, জবাবে সহানুভূতি জানাইয়া কেবল বলিয়াছিলেন, ‘জানি না, দেশটাকে তারা কোথায় নিতে চায়! আমাকে জেলে দিয়েও তারা স্বস্তি বোধ করতে পারে না, যথাসর্বস্ব বাজেয়াপ্ত করল। বিচারের মালিক খোদা । তারই ওপর তাওয়াক্কাল করুন’। আরও বলিলেন, ‘কারও দয়ার দান হিসেবে ইত্তেফাক আমি বের করব না। নিজস্ব রূপ-রস-গন্ধে যেদিন ইত্তেফাক বের করতে পারব সেদিনই ইত্তেফাক বেরোবে।’ কালক্রমে হইলও তা-ই । দেশ জাগিল, ইত্তেফাকও বাহির হইল। তিনি আবার কলম ধরিলেন। দেশব্যাপী আন্দোলনের মুখে বারংবার সতর্কবাণী উচ্চারণ করিলেন, আন্দোলন বিপথে না যায়। পানি ঘোলা করিয়া স্বার্থ শিকারের লোকের অভাব ছিল না। শত চেষ্টা সত্ত্বেও তাই শেষ রক্ষা হইল না । ফলে দেশে সামরিক শাসন জারি হইল। ‘মোসাফিরের’ কলম আবার চলিল। সারগর্ভ আলোচনার মাধ্যমে তিনি দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক সমস্যা নিরসনের ব্যাপারে ক্ষমতাসীন সরকার ও রাজনৈতিক দলের কর্তব্য ব্যাখ্যা করিয়া চলিলেন। অনেকের মনে আশা জাগিল, দু-পক্ষের মধ্যে এবার হয়তো একটা সমঝোতায় পৌঁছা সম্ভব হইবে; দেশের সমস্যাবলিরও হয়তো একটা সুরাহা হইবে। কিন্তু মানুষ ভাবে এক, হয় আর এক। পহেলা জুন বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো দেশবাসী শুনিল, ‘মোসাফির’ আর নাই। অহর্নিশি যাদের চিন্তায় বিভোর থাকিয়াছেন, দেশের সেই আপামর জনসাধারণকে শোকের সাগরে ভাসাইয়া তিনি বিদায় লইলেন।

‘মোসাফির’ নাই কিন্তু দেশ আছে, আর আছে আমাদের সমস্যা। সমস্যার ওপর সমস্যার প্রাচীর গড়িয়া দেশবাসীকে যারা সীমাহীন লাঞ্ছনা-গঞ্জনার শিকারে পরিণত করিয়াছেন, নিজেদের পাপপঙ্কে নিমজ্জিত হইয়া ক্ষমতার আসন হইতে তাহারা বিদায় লইলেও আজও তারা বাঁচিয়া আছেন। ‘ডিকেডি আমলের’ রঙিন চশমা পরাইয়া সারাটা দেশকে তারা কীভাবে বোকা ঠাওরাইতে চাহিয়াছিলেন, স্বয়ং ‘গোয়েবলস’কেও হার মানাইয়া এ দেশেরই করিৎকর্মা বৃদ্ধস্য-বৃদ্ধ প্রচার সচিব অভিনব প্রচার জাল বিস্তার করিয়া কীভাবে বৎসরের পর বৎসর দেশবাসীকে ‘মন্ত্রমুগ্ধ’ করিয়া রাখিতে চাহিয়াছেন, কেহ রাষ্ট্রপ্রধানের মন্ত্রিসভায় উপদেষ্টা বনিয়া, আবার কেহ-বা প্রাদেশিক পরিমন্ডলে রাষ্ট্রপ্রধানের এজেন্ট সাজিয়া কখনো ‘গাঁজার নৌকা আকাশ দিয়া’ ছুটাইয়াছেন, কখনো নিরীহ মানুষের ওপর অত্যাচার-নির্যাতনের স্টিমরোলার চালাইয়াছেন, কখনো-বা বরেণ্য নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে খিস্তিখেউড় গাহিয়া ‘বাজিমাত’ করিতে চাহিয়াছেন; ‘ব্যক্তিবাদের’ মাহাত্ম্য প্রচার করিতে কখনো কেহ-বা লাল কেতাব, নীল কেতাব নাচাইয়াছেন, ওয়ার্কার্স প্রোগ্রামের নামে দুই হাতে বেহিসাবি টাকা ছড়াইয়া কাজের কাজ-এর পরিবর্তে সরলপ্রাণ মানুষের মধ্যেও টাউট সৃষ্টি করিয়াছেন, মানুষের ইমান ক্রয় করিয়া জীবনের মূল্যবোধকে টুঁটি টিপিয়া হত্যা করিতে চাহিয়াছেন; সত্য ও সুন্দরের সাধনার পথ হইতে বিচ্যুত করিয়া এ দেশের বুদ্ধিজীবী সমাজকেও ‘চাদির চাক্কায়’ বশীভূত করিয়াছেন । আর তাহারই চক্করে পড়িয়া দেশ ও দেশের সাড়ে ১২ কোটি মানুষ আজ কোথায় গিয়া দাঁড়াইয়াছে তার চুলচেরা বিচার করিতে গেলে দেখা যাইবে যে, রাজনীতি ক্ষেত্রে দেশ অনূ্যূন বিশ বৎসর পিছাইয়া গিয়াছে। আর তাই স্বাধীনতা-উত্তর ২৩তম বর্ষে সরকারি ও বেসরকারি উভয় পর্যায়েই আজ যেন সবকিছু নতুন করিয়া শুরু করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়াছে। দশ বৎসরের আইয়ুব শাসনের দিকে তাকান। দেখিবেন, এই দশটি বৎসরে দেশে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে বিশ বৎসরের ব্যবধান সৃষ্টি হইয়াছে। পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা আমলের প্রথম কাতারের নেতারা এক এক করিয়া সকলেই প্রায় বিদায় লইয়া গিয়াছেন। যাহারা তাহাদের স্থলবর্তী হইয়াছেন, তাহাদের সকলেই হয় ৪৫-এর কোঠায়, নয়তো তদূর্ধ্বে । দ্বিতীয় সারিতে যাহারা আছেন তাহারা সবে ২৫-এর কোঠায় পা দিয়াছেন। ‘ডিকেডি শাসনের’ হাজারো মারাত্মক পরিণতির মধ্যে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে মধ্যবর্তী কোঠায় এই যে শূন্যতা, জাতীয় জীবনে তার কি কোনোই তাৎপর্য নাই? বস্তুত তথাকথিত মৌলিক গণতন্ত্রের প্রবক্তারা ইহাই চাহিয়াছিলেন এবং হইয়াছেও তাহাই। দ্বিতীয়ত, বিগত দশ বৎসরে জাতির সর্বাপেক্ষা যে ক্ষতি সাধিত হইয়াছে তাহা হইল তার চরিত্র ও মূল্যবোধের প্রশ্নে। আর এই দুয়ের যা অবধারিত পরিণতি জাতিকে আজ তাহারই ফল ভোগ করিতে হইতেছে। কী ব্যক্তিজীবনে, কী রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা শিক্ষাজীবনে সবক্ষেত্রে জাতি আজ ধ্বস্ত-বিধ্বস্ত, উপহাসিতও।

কথায় কথায় উন্নয়ন আর স্বয়ংসম্পূর্ণতার গালভরা বুলি কপচাইয়া যাহারা দেশকে এই অবস্থায় ঠেলিয়া দিয়াছেন, তাহাদের কেহ আজ ‘তখতে তাউস’ হইতে নির্বাসিত হইয়া লোকচক্ষুর অগোচরে গিয়া দিনযাপন করিতেছেন, আবার কেহ-বা আগে-পিছে প্রহরী বেষ্টিত হইয়া শ্বেত পতাকা উড়াইয়া নহবৎ ধ্বনির (সাইরেন) মধ্যে রাজপথ অতিক্রমের সেই রাজসিক দিনগুলোর কথা বিস্মৃত হওয়ার জন্য আকুল কোশেশ করিতেছেন। নগরীরই কোনো সুরম্য এলাকায় এক অদ্ভুত পরিবেশে তিনি গাই পালিয়া খাঁটি-দুধ-পানে দেহ ও মনকে নাকি চাঙ্গাও করিতে চাহিতেছেন। আর দেশব্যাপী সমস্যার পর সমস্যার যে স্তূপ তাহারা রচনা করিয়া গেলেন তাহার সমাধান করিয়া সুখী, সুন্দর, সুসংহত দেশ গড়িবার দায়িত্ব বর্তাইল আজ প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া আর দেশের রাজনৈতিক দল তথা দেশবাসীর ওপর। ‘ধিকৃত রাজনীতিকদের’ হাত হইতে দেশোদ্ধারের নামে একদিন ক্ষমতা গ্রহণ করিয়া দীর্ঘ দশ বৎসর যাবৎ যারা সারাটা দেশকে চষিয়া ছাড়িয়া বর্তমান ক্রান্তিকালে আনিয়া খাড়া করিলেন, তাহারা ‘প্রাতঃস্মরণীয়’, ‘নমস্য’ তো বটেই ।

লেখক: সিরাজুদ্দীন হোসেন দৈনিক ইত্তেফাক, আগস্ট ৮, ১৯৬৯