কোটা সংস্কার আন্দোলনে বিক্ষোভ ও সহিংসতা ঘিরে দশদিন বন্ধ থাকার পর সারাদেশে চালু হয়েছে মোবাইল ইন্টারনেট সেবা। তবে এখনো ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, টিকটকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করা যাচ্ছে না। তবে ভিপিএন ব্যবহার করে ফেসবুক ব্যবহার করছেন অনেকে।
গত মঙ্গলবার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্মেদ পলক দেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের তথ্য সুরক্ষার জন্য ভিপিএন ব্যবহার না করার পরামর্শ দিয়েছেন। প্রশ্ন উঠেছে ভিপিএন ব্যবহার করার ফলে তথ্য সুরক্ষার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে? এককথায় এই প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে— না। তবে ভিপিএন ব্যবহারে কিছুটা সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে ব্যবহারকারীকে।
ভিপিএন কী?
ভিপিএন এর পূর্ণ রূপ হচ্ছে ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক। ভার্চুয়াল মানে কাল্পনিক, ভিপিএন ইন্টারনেটের একটি ভার্চুয়াল 'টানেল' যার মাধ্যমে ডাটা কম্পিউটার থেকে আদান-প্রদান করতে পারে। অর্থাৎ ভিপিএন হচ্ছে এমন এক কাল্পনিক প্রাইভেট নেটওয়ার্ক যার মাধ্যমে নিরাপদে তথ্য আদান প্রদান করা হয়। ভিপিএন স্থানীয় আইপি অ্যাড্রেস লুকিয়ে ফেলে। এর ফলে মনে হয় অন্য কোনো দেশ বা অঞ্চল থেকে ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন ব্যবহারকারীরা।
এটি মূলত ব্যক্তিগত তথ্য এনকোড করে এবং পুনরায় ডিকোড করে। আপনার তথ্য প্রথমে দুর্গম সার্ভারে পাঠানো হয় এবং তারপর উদ্দিষ্ট গন্তব্যে পাঠানো হয়। তথ্য এমনভাবে এনক্রিপ্ট করা হয়, যেন কেউ সেটি দেখতে চাইলে কিছুই বুঝতে পারবে না।
ভিপিএন কীভাবে কাজ করে?
যখন কেউ তার ডিভাইসে (হতে পারে সেটা ডেস্কটপ, কিংবা স্মার্টফোন) ভিপিএন সেবা চালু করে তখন ভিপিএন নেটওয়ার্কের একটা অংশ ব্যবহারকারীর ডিভাইসের সঙ্গে একটা সুরক্ষিত সংযোগ স্থাপন করে। রিমোট সার্ভার বলতে, একজন ব্যবহারকারীর অবস্থান ভিপিএনের মাধ্যমে লুকিয়ে রাখা যায় এই রিমোট সার্ভারের মাধ্যমে।
বাংলাদেশে বসেও ইন্টারনেট প্রোটোকল (আইপি) ঠিকানা বা অবস্থান আমেরিকায় দেখানো সম্ভব। আর এজন্য ভিপিএন সহায়তা নেয় ব্যবহারকারীর ডিভাইসের আইএসপি (ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার)-এর মতো কোনো মধ্যস্থ ব্যক্তির। ফলে, ভিপিএন চালু রাখা ডিভাইসটির আসল পরিচয় বা অবস্থান নির্ধারণ করা সাধারণত অসম্ভব।
ভিপিএন এর বাজার
বিংশ শতাব্দীর শেষ দশকে এসে ভিপিএনের আবির্ভাব ঘটে। বর্তমানে আনুমানিক ৫০০ কোটি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন, যার মধ্যে অন্তত ১২০ কোটি ব্যবহারকারী ভিপিএন এর মাধ্যমে তাদের ইন্টারনেট ব্যবহারকে সুরক্ষিত রাখছেন। ব্যবহারকারীর সঙ্গে ভিপিএনের বাজার পরিসংখ্যানও চমকে দেওয়ার মতো।
স্ট্যাটিস্টার পরিসংখ্যান মতে, ২০২২ সালে ভারতে ভিপিএনের বাজার ছিল ১১ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা চীনে ভিপিএনের বাজার প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার। বর্তমান হারে ভিপিএন ব্যবহার চলতে থাকলে ২০২৭ সালের শেষে বৈশ্বিক ভিপিএন বাজারের আকার দাঁড়াবে ১০৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে।
ভিপিএন ব্যবহারকারীর সংখ্যার দিক দিয়ে শীর্ষে রয়েছে ভারত। তবে, গ্লোবাল ওয়েব ইনডেক্সের প্রকাশিত ২০১৮ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার ৬৫ শতাংশ ভিপিএন ব্যবহারকারী নিয়ে তালিকায় শীর্ষ অবস্থানে ছিল মালয়েশিয়া।
মূলত নিরাপত্তার স্বার্থেই ভিপিএন ব্যবহার করা হলেও স্ট্রিমিং, গোপনীয়তা, গেমিং, ভ্রমণ, এবং নিষিদ্ধ সাইট ও কন্টেন্টে অ্যাক্সেস পেতেও ভিপিএন ব্যবহার করা হয়। শুরুতে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে ব্যবহার করা হলেও বর্তমানে ব্যক্তি পর্যায়েই বেশি ব্যবহার করা হয়।
কোন ঝুঁকি নেই?
ভিপিএন ব্যবহার করলে আইএসপি আপনার তথ্য মনিটর করতে পারবে না। কিন্তু বিশেষ প্রয়োজনে আপনার তথ্য চেয়ে নিতে পারবে। এটা নির্ভর করবে ভিপিএন প্রভাইডার তথ্য শেয়ার করতে ইচ্ছুক কি না— তার উপর। বাজারে প্রচুর ভিপিএন টুল রয়েছে।
তবে অনেক ভিপিএন অ্যাপ তৈরিই করা হয়েছে ইউজারের তথ্য চুরি করে তা দিয়ে ব্যবসা ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড ঘটানোর জন্য। ২০১৯ সালে গুগল প্লে স্টোরের ১৫০টি জনপ্রিয় ভিপিএনের ২৫ শতাংশের বেশি অ্যাপের বিরুদ্ধে তথ্য বিক্রি করার অভিযোগ উঠেছিল। বিশেষ করে যেসব ভিপিএন অ্যাপ বিনামূল্যে ডাউনলোড করা যায়, সেগুলো থেকে বেশি তথ্য পাচার হচ্ছে। তাছাড়া ভিপিএন সার্ভার সস্তা বা দুর্বল হলে তা সহজেই হ্যাকারের হাতে চলে যেতে পারে। ভিপিএন অ্যাপ হতে পারে হ্যাকার আর আপনার মধ্যে একটা ব্রিজ। বিশেষ করে ফ্রি ভিপিএনের আইপি সহজেই হ্যাক করা সম্ভব। তাই প্রিমিয়াম ভিপিএন টুল ব্যবহার করার বিকল্প নেই।