সর্বাত্মক যুদ্ধের ‘খুব কাছে’ মধ্যপ্রাচ্য

ইরানের রাজধানী তেহরানে এক হামলায় নিহত হয়েছেন হামাসের রাজনৈতিক প্রধান ইসমাইল হানিয়া। মঙ্গলবার (৩১ জুলাই) দিবাগত রাতে ওই ঘটনার কয়েক ঘণ্টা আগে লেবাননের রাজধানী বৈরুতে হামলা চালিয়ে হিজবুল্লাহর কমান্ডার ফুয়াদ শোকরকে হত্যা করেছে ইসরায়েল।

লেবাননে হামলার কথা নিজেরাই ঘোষণা দিয়ে জানিয়েছে ইসরায়েল। অবশ্য ইসমাইল হানিয়ার বিষয়ে এখনো মুখ খোলেনি তারা। তবে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, অল্প সময়ের ব্যবধানে দুই গোষ্ঠীর শীর্ষ পর্যায়ের দুই নেতা খুন হওয়ায় বড় ধরনের হামলার আশঙ্কা করছে নেতানিয়াহু সরকার।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও বলছেন, এই দুই হত্যাকাণ্ড বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যকে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় সবচেয়ে বেশি সর্বাত্মক যুদ্ধের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে।

জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য অধ্যয়নবিষয়ক অধ্যাপক নাদের হাশেমি বিবিসিকে বলেন, এ এক বড় ঘটনা। আমি মনে করি, এটি লেবাননের ঘটনাপ্রবাহেও প্রভাব ফেলবে। কেননা হানিয়া নিহত হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে দক্ষিণ বৈরুতে হিজবুল্লাহ গোষ্ঠীর এক জ্যেষ্ঠ নেতাকে হত্যা করে ইসরায়েল। আগে এমন একটি ধারণা ছিল যে ইরান ও হিজবুল্লাহ মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়াতে আগ্রহী নয়। তবে হানিয়া হত্যাকাণ্ড এ ধারণা উল্টে দিয়েছে। নাদের হাশেমি বলেন, এখন ইরান মধ্যপ্রাচ্যে এ সংঘাত শুরু ও তা বাড়িয়ে তোলার সব সুযোগ পাবে।

ফুয়াদ শোকর

ইতিমধ্যে ইসমাইল হানিয়ার হত্যার জবাব দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে হামাস। বুধবার হামাসের রাজনৈতিক শাখার সদস্য মুসা আবু মারজুক এক বিবৃতিতে বলেন, আমাদের নেতা ইসমাইল হানিয়াকে হত্যা করাটা একটি কাপুরুষোচিত কাজ এবং এর জবাব দেওয়া হবে।

এর আগে পরে হামাসের পক্ষ থেকেও হানিয়ার নিহত হওয়ার খবর জানিয়ে বিবৃতি দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, হানিয়া ইরানের নতুন প্রেসিডেন্টের শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। তেহরানে তার আবাসস্থলে নিহত হয়েছেন। বিবৃতিতে বলা হয়, এটা একটি জিহাদ। এতে হয় বিজয় হবে, নয়তো শহীদ হতে হবে।

এদিকে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ‘কঠোর শাস্তির’ অঙ্গীকার করেছেন। ইরানের সরকারি সংবাদ সংস্থা ইরনা খামেনির বিবৃতি প্রকাশ করেছে।

খামেনি বলেন, (হানিয়াকে হত্যার) এই পদক্ষেপের মাধ্যমে (ইসরায়েলের) অপরাধী, জঙ্গি ও জায়নবাদী শাসকরা কঠিন শাস্তি পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে। ইরানের ভূখণ্ডে হানিয়ার রক্ত ঝরেছে, প্রতিশোধ নেওয়া এখন আমাদের কর্তব্যে পরিণত হয়েছে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, হানিয়াকে কাপুরুষোচিত হত্যার ঘটনায় অনুশোচনা করতে হবে ইসরায়েলকে। তিনি বলেন, ইরানের আঞ্চলিক অখণ্ডতা, মর্যাদা, সম্মান এবং গৌরব রক্ষা করা হবে। সন্ত্রাসী দখলদারদের কাপুরুষোচিত কাজের জন্য অনুতপ্ত হতে হবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসমাইল হানিয়া হত্যাকাণ্ড পরবর্তী আগামী কয়েক ঘণ্টা কিংবা কয়েক দিনে অন্তত দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পর্যালোচনা করা হবে। প্রথমটি হলো, হানিয়াকে হত্যায় ইসরায়েল দায়ী বলে ধরে নেওয়া। যদিও ইরান প্রতিশোধ নেবে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। তবে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনা বিরাজ করছে।

গত এপ্রিলে দামেস্কে ইরানি কনস্যুলেটে হামলার প্রতিশোধ নিতে ইসরায়েলে ৩০০টিরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করেছিল ইরান। কনস্যুলেটে হামলায় আইআরজিসির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিহত হন। তাই ইরান হয়তো শেষ অবধি সীমিত পরিসরে হলেও ইসরায়েল হামলা চালাতে পারে। দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো, লেবানন-ভিত্তিক সশস্ত্র ইসলামি গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ইরানের নির্দেশে ইসরায়েলে হামলা চালাবে কি না?

ফুয়াদ শোকর নিহত হওয়ার বিষয়টি এখনো হিজবুল্লাহ স্বীকার না করলেও প্রতিশোধমূলক হামলা তারাও চালাতে পারে ইসরায়েলে। আর এক্ষেত্রে অবশ্যই ইরানের সমর্থন নিয়েই সেটি করবে হিজবুল্লাহ। তাই ধারণা করা হচ্ছে, গাজা যুদ্ধ এবং সম্ভবত মধ্যপ্রাচ্যে বৃহত্তর সংঘাতের সৃষ্টি করতে পারে।