ইন্টারনেট বন্ধে দীর্ঘমেয়াদে বড় ক্ষতির আশঙ্কা বিশ্ববাজারে

ইন্টারনেট, ইউটিউব, ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধের কারণে গত দুই সপ্তাহে তথ্যপ্রযুক্তি, সফটওয়্যার, এফ-কমার্স, ই-কমার্স খাতে কয়েক হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। যারা এই ক্ষতির শিকার হয়েছেন, তাদের বেশিরভাগই তরুণ এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা। অনেকেরই আয়ের একমাত্র অবলম্বন ফেসবুক ও ইউটিউব।

এর পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়েছে দেশের অন্যান্য খাতে। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো বহু বিদেশি ক্রেতার আস্থা নষ্ট হয়েছে। অনেকেই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুন্ন হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি এই ক্ষতি কতটা কাটিয়ে ওঠা যাবে, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন উদ্যোক্তারা।

কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সহিংসতার মধ্যে গত ১৭ জুলাই সন্ধ্যায় ফোরজি নেটওয়ার্ক বা মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরদিন ১৮ জুলাই রাতে বন্ধ হয়ে যায় ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটও। এর আগে বিভিন্ন সময় সংঘাত, রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও নির্বাচন কেন্দ্র করে এলাকাভিত্তিক ফোরজি সেবা বন্ধ রাখা হলেও এই প্রথম এত দীর্ঘ সময় দেশ জুড়ে মোবাইল নেট বন্ধ থাকল। পরে ২৩ জুলাই থেকে ধীরে ধীরে ব্রডব্যান্ড উন্মুক্ত করা হয়। টানা ১০ দিন বন্ধ থাকার পর গত ২৮ জুলাই বেলা ৩টার দিকে মোবাইল ইন্টারনেট সেবা চালু হয়। ইন্টারনেট চালু হলেও কাক্সিক্ষত গতি পাওয়া যাচ্ছে না।

অন্যদিকে ইন্টারনেট বন্ধের দিন থেকেই ফেসবুক, টিকটকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ ছিল। গতকাল দুপুর থেকে এগুলো আবার চালু করেছে সরকার।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সফটওয়্যার সার্ভিসেসের (বেসিস) সভাপতি রাসেল টি আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সফটওয়্যার ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ‘লাইফ লাইন’ হলো ইন্টারনেট। দীর্ঘ সময় ধরে ইন্টারনেট ও ফেসবুক বন্ধের কারণে সুদূরপ্রসারী বিপুল ক্ষতি হয়েছে। দেশের অভ্যন্তরে আর্থিক ক্ষতি নিরূপণের কাজ চলছে। কয়েক দিন পর এটা বলা যাবে। আনুমানিক কয়েক হাজার কোটি টাকা হবে। কিন্তু বিশ্ববাজারে আইটি খাতে হাজার কোটি টাকার ওপরে ক্ষতি হয়েছে। অনেক ক্রেতা আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। এভাবে ২৫ শতাংশ ক্রেতাও যদি চলে যান, তাহলে তার ধাক্কা সামলাতে লাগবে অন্তত এক বছর।’

তিনি বলেন, ‘আমরা একটা “জার্নির” মধ্যে ছিলাম। কিন্তু হঠাৎ করেই সম্ভাবনাময় এই শিল্পটা বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। সহসা ঘুরে দাঁড়ানো খুবই কঠিন। আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি বহু মানুষের চাকরি হারানোরও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো বিদেশি ক্রেতা হারানোর ঝুঁকি। কারণ দেশের মানুষকে বোঝানো গেলেও বিদেশিদের এই সংকটের কথা বোঝানো যাবে না।’

তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, এভাবে ইন্টারনেট বন্ধ থাকলে আর্থিক ও অন্যান্য ক্ষতির পাশাপাশি সবচেয়ে বড় যে ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তা হলো নানা রকম গুজবের ডালপালা ছড়াতে পারে মানুষ। ইন্টারনেট বন্ধ করে সাময়িক কিছু সুবিধা পাওয়া যাবে মনে করা হলেও বাস্তবে ক্ষতির পরিমাণই বেশি। সুতরাং ইন্টারনেট বন্ধের ক্ষেত্রে এ বিষয়গুলো আরও গভীরভাবে চিন্তা করা উচিত।

বিশ্ববাজারে আইটি রপ্তানি খাতে বিশাল বাজার রয়েছে, যেখান থেকে গড়ে প্রতিদিন ৭০ থেকে ৮০ কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়। এর মধ্যে সফটওয়্যার সেবা, কলসেন্টার, ফ্রিল্যান্সিংসহ নানা কাজ রয়েছে। কিন্তু ইন্টারনেট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ থাকার কারণে এই খাতে বড় ক্ষতি হয়েছে।

বর্তমানে দেশে প্রায় সাত লাখ ফ্রিল্যান্সার রয়েছেন, যারা আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করেন। এর মধ্যে নিয়মিত কাজ করেন প্রায় দেড় থেকে দুই লাখ ফ্রিল্যান্সার, যাদের বেশিরভাগই তরুণ। তাদের একেকজনের আয় প্রতিদিন গড়ে ১০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত। বছরে গড়ে আয় ১০০ থেকে ১২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

লোকাল এসিও এজেন্সি নামে একটি ফ্রিল্যান্সিং প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার রিয়াজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিভিন্ন দেশে তার শতাধিক ক্রেতা রয়েছেন। যার মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ আমেরিকার ক্রেতা। ইন্টারনেট বন্ধের কারণে বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারায় আটজন ক্রেতা ইতিমধ্যেই হাতছাড়া হয়ে গেছে। ইন্টারনেট চালুর পর ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা অনেকেই স্বাভাবিকভাবে নেননি। অনেক কাজ ফিলিপাইনে চলে গেছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ক্রেতার কাজ করা যাবে কি না, তা নিয়ে সন্দিহান। তা ছাড়া এখনো ইন্টারনেটের গতি আশানুরূপ নয়।

ফেসবুককে কেন্দ্র করে দেশে প্রায় তিন লাখ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা গড়ে উঠেছে। খাবার, পোশাক, গয়নাসহ নানা পণ্য অনলাইনে বিক্রি করে তারা জীবিকা নির্বাহ করেন তারা। বিশেষ করে করোনার সময় চাকরি হারিয়ে অনেকেই ফেসবুকভিত্তিক ব্যবসা শুরু করেছিলেন। রাজধানীর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন এলাকায় ফেসবুকের মাধ্যমে নানা রকম পণ্য বিক্রি করে সংসার চালান অনেকেই। ফেসবুক বন্ধ থাকায় কয়েক দিন তাদের বেচাকেনা বন্ধ ছিল।

ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) সদস্য ইকবাল বাহার জাহিদ ‘নিজের বলার মতো একটি গল্প ফাউন্ডেশন’ নামে একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলেছেন, যেখানে কয়েক লাখ তরুণ বিনামূল্যে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি পণ্য বিক্রির সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। ইকবাল বাহার দেশ রূপান্তরকে বলেন, চাকরি-বাকরি না করে বহু তরুণ অনলাইনের মাধ্যমে নিজেরা কিছু করার চেষ্টা করছিলেন। তাদের মূল ব্যবসা ফেসবুককেন্দ্রিক হওয়ায় ১৫ দিনে তারা ভীষণভাবে হতাশ ও চিন্তিত। কারণ এ সময়ে তাদের আয় পুরোপুরি বন্ধ। অনেকেরই খাবারের টাকা নেই। বাসাভাড়া কীভাবে দেবেন তা নিয়েও উদ্বিগ্ন।

ফেসবুকের মাধ্যমে পণ্য ও সেবা বিক্রির ব্যবসাকে বলা হয় এফ-কমার্স। এই খাতভিত্তিক নারী উদ্যোক্তাদের সংগঠন উইমেন অ্যান্ড ই-কমার্সের (উই) তথ্য অনুযায়ী, দেশে ছয় লাখের মতো এফ-কমার্স উদ্যোক্তা রয়েছেন। চলমান পরিস্থিতিতে এফ-কমার্স খাতে ৬০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) ২০২০ সালের এক গবেষণায় বলা হয়েছিল, নারী এফ-কমার্স উদ্যোক্তাদের ৫৭ শতাংশের একক পেশা ফেসবুকে পণ্য বিক্রি। প্রায় ৩৯ শতাংশ এই ব্যবসার মাধ্যমে সংসার চালান।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে ফেসবুকে ব্যবসায়িক বিনিয়োগের অঙ্ক ৩৬২ কোটি টাকা। ফেসবুকভিত্তিক ব্যবসায়ীর বেশিরভাগ তরুণ। মোট উদ্যোক্তার ৫০ শতাংশ নারী। ব্যবসা সম্পর্কিত ফেসবুক পেজের সংখ্যা ৩ লাখের ওপরে। উদ্যোক্তাদের মাসিক আয় ১০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার বেশি।

চাকরিবিষয়ক ওয়েবসাইট বিডি জবসের প্রতিষ্ঠাতা ও বেসিসের সাবেক সভাপতি তথ্যপ্রযুক্তিবিদ ফাহিম মাশরুর দেশ রূপান্তরকে জানান, ফেসবুকসহ ব্যবহার করে যেমন ভুল তথ্য ছড়ানো হয়, সেই সঙ্গে ইতিবাচক বিষয়গুলোও প্রচার করা হয়। ফেসবুকভিত্তিক উদ্যোগের সঙ্গে ২০ থেকে ২৫ লাখ মানুষ জড়িত। যারা বড় ধরনের ক্ষতির শিকার হয়েছে। দেশে যে পদ্ধতিতে ফেসবুক বন্ধ করা হয়েছে, তা কাম্য নয়।

ই-কমার্স ব্যবসায়ীদের সংগঠন ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব) সূত্র জানিয়েছে, এ খাতে প্রায় ৫ লাখ উদ্যোক্তা ও ১৫ লাখ কর্মী রয়েছেন। ইন্টারনেট ও ফেসবুক বন্ধ থাকায় প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

অনলাইনে খাবার ও পণ্য কেনাবেচা, রাইড শেয়ারিংসহ অ্যাপসভিত্তিক অন্যান্য সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমও বন্ধ ছিল।

ই-ক্যাবের তথ্য বলছে, ইন্টারনেট সংযোগ ব্যাহত হওয়ায় দারাজ, চাল-ডালের মতো বড় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ফেসবুকনির্ভর ছোট উদ্যোক্তারাও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এ ছাড়া ইউটিউবের মাধ্যমেও অনেকে যারা আয় করতেন, তাদের আয়ও বন্ধ ছিল দীর্ঘ সময় ধরে। কারণ তারা কনটেন্ট শেয়ার করতে পারছিলেন না। আর কনটেন্ট শেয়ার না করলে এবং ভিউ না হলে তাদের আয় বন্ধ থাকে।