মনে পড়ে কাঞ্চন আর দিপালী সাহার কথা? স্বৈরশাসকের বুলেট যাদের বুকের পাঁজর ঝাঁজরা করে দিয়েছিল! সেলিম, দেলোয়ার, রাউফুন বসুনিয়ার কথা কি ভুলে গেছেন? নূর হোসেন তো ইতিহাস। তার কথাও ভুলে গেছেন? মেধাবী চিকিৎসক ডাক্তার মিলনের লুটিয়ে পড়া নিথর দেহটির স্বকরুণ দৃশ্যটি কি আপনাদের চোখে ভাসে না? যারা ষাট ছুঁইছুঁই, তারা নিশ্চয় ভুলে যাননি, আপনাদের ৪ বছরের ডিগ্রি নিতে, ৭-৮ বছর সময় লেগেছিল? কী স্বপ্ন, কী জাদু, কী মন্ত্র, কী অনুপ্রেরণা কাজ করেছিল, সেসব অমূল্য ত্যাগের পেছনে?
বসুনিয়া স্বপ্ন দেখেছিল গণতন্ত্রের বাংলাদেশ হবে। দিপালী সাহার কল্পনায় ছিল সাম্যের সমাজ। সেলিম, দেলোয়ার শোষণ মুক্ত, দুর্নীতি আর দুঃশাসন বর্জিত একটি সমাজের স্বপ্নে বিভোর ছিল। নূর হোসেন ভেবেছিল, গণতন্ত্রেই মুক্তি। এত মৃত্যুর পরও, বাদ্যে, বাদ্যে আর সংগীতের মূর্ছনায় ভবিষ্যৎ সুখী বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে আনন্দ উত্তেজনায় নেচে উঠেছিল তরুণ সমাজ। ১৯৯১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় এলো। গণতন্ত্রের ধারা উন্মোচিত হলো বটে, সুশাসনের লক্ষণ নেই। ৫ বছরের মাথায়, আবারও গণতন্ত্রের ওপর কঠোর আঘাত। ৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি গণতন্ত্রকে কবর দেওয়া হলো। শুরু হলো আন্দোলন সংগ্রাম। আবারও প্রাণ গেল সাধারণ জনতার। এলো তত্ত্বাবধায়ক সরকার। সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকারে তখন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। ২০০১ সালে জনগণ আওয়ামী লীগকে প্রত্যাখ্যান করে। সরকারে আসে বিএনপি। বিধিবাম, বাংলাদেশের মানুষের কপালে সুখ সয় না। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় হাওয়া ভবন কমিশন বাণিজ্যের সূতিকাগার হয়ে উঠল। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় জঙ্গিদের উত্থান হতে থাকল। শাহ এএমএস কিবরিয়া, আহসানউল্লাহ মাস্টারের মতো জনপ্রিয় মানুষদের খুন করার মিশন শুরু হলো। ঘটে গেল একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলার মতো হত্যাকাণ্ডের মিশন। আবারও ছাত্র-জনতার আন্দোলন। সামরিক ছত্রছায়ার তত্ত্বাবধায়ক সরকার শুরু করে নানা রকম নীলনকশা। তারপর ছাত্র-জনতার রক্ত, প্রাণহানি।
রক্তের বিনিময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে জয় পায় আওয়ামী লীগ। তারুণ্য লুফে নেয় শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি। জনমনে প্রত্যাশা তৈরি হয়। দুর্নীতি, দুঃশাসন, অসাম্প্রদায়িক সোনার বাংলার স্বপ্নে বিভোর হয় নতুন প্রজন্ম। না, সেই স্বপ্নও বেশিদিন থাকেনি। গণতন্ত্রের দুর্বলতার সুযোগে আমলাতন্ত্র লাগামহীন শক্তি অর্জন করে। বঙ্গবন্ধুর দল আওয়ামী লীগের কান্ডারী হয়ে ওঠে, ধনিক ব্যবসায়ী আর হাইব্রিড নামের সুবিধাবাদী শ্রেণি। ধারাবাহিক প্রশ্ন ফাঁসের হোলি খেলায় বঞ্চিত হয় মেধাবীরা। দুর্নীতি, লুটপাট, অর্থপাচারের প্রতিযোগিতা শুরু হয়। পুলিশ প্রধানের সম্পদের চিত্র দেখে জনগণের চোখ ছানাবড়া হয়ে ওঠে। আদর্শিক নেতাদের পরিবর্তে, হাইব্রিডদের ক্ষমতায়নে পরীক্ষিত আর ত্যাগী আওয়ামী কর্মীরাও বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। শিক্ষা, ব্যাংকিং, রাজস্ব থেকে শুরু করে পাবলিক সেক্টরে লুটপাটের এক অব্যাহত প্রতিযোগিতা শুরু হয়। ক্ষোভে, দুঃখে ফুঁসতে থাকে জনগণ। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি চাকরিতে কোটা প্রথা সংস্কারের দাবিতে শুরু হয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। ছাত্রসমাজের মাঝে আন্দোলনটি যখন চরম জনপ্রিয়তার দিকে ধাবিত হয়, ছাত্রলীগ তির্যক বাক্যবানে তাদের আঘাত করতে থাকে। সুপ্রিম কোর্টের আদেশ আর শাসক দলের বক্তব্যে প্রমাণিত হলো, দাবিটি যৌক্তিক ছিল। এমন যৌক্তিক দাবির সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে আন্দোলনটিকে ছাত্রলীগ নিজেদের করে নিতে পারত। সেটি না করে, পেশিশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। নিজের সন্তান, ভাইবোনদের ওপর নিষ্ঠুর ভয়াবহতার চিত্র দেখে, প্রতিবাদে ফেটে পড়ল সর্বশ্রেণির মানুষ। সুযোগ নিল বিরোধীরা, ঝরে গেল শত তাজা প্রাণ, ধ্বংসলীলা চলল সম্পদে। ৪১-এর উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্নের পথে, তৈরি হলো কঠিন প্রতিবন্ধকতা।
নূর হোসেনদের রক্ত আমাদের টেকসই গণতন্ত্র দিতে পারেনি। কাঞ্চন, দিপালী সাহার রক্ত সাম্যের সমাজ দিতে পারেনি। রাউফুন বসুনিয়ার রক্ত শোষণ মুক্ত অর্থনীতির অসাম্প্রদায়িক সমাজ ব্যবস্থা দিতে পারেনি। বিপরীতে ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে, দুর্নীতি-দুঃশাসনের মধ্য দিয়ে নতুন কোটিপতির জন্ম হয়েছে। এ সময়ের ছাত্র আন্দোলনে শতাধিক তরুণের আত্মত্যাগ, বৈষম্যের বিরুদ্ধে কাগুজে মুক্তি ঘটলেও, তরুণদের লালিত স্বপ্নের পথকে প্রশস্ত করবে না। যদি কোনোদিন; কোনো আত্মত্যাগ সমাজকে বদলে দিতে পারে, আমি সেই আত্মত্যাগকে স্বাগত জানাতে চাই। বিস্মৃত জাতির তরুণদের আত্মাহুতির কথা ভুলে যেতে বেশি দিন লাগবে না। আবার শুরু হবে ক্ষমতার তোষণ। যে সময়ে রাঘববোয়াল দুর্নীতিবাজদের মুখোশ উন্মোচিত হচ্ছিল, সেই সময়ে অনাকাক্সিক্ষত আন্দোলন মোকাবিলার কৌশল আগুনে ঘি ঢেলে দিল। প্রশিক্ষিত জঙ্গির দল এই আন্দোলনকে মহাপ্রলয়ে রূপ দিতে তাদের সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ধ্বংস করল জাতির সব গৌরবোজ্জ্বল অর্জন। একের পর এক মেধাবী তরুণদের লাশে চারদিকে গগনবিদারী হাহাকার। এ মৃত্যুর মিছিল শাসকদের নাড়া দিয়েছে, তবে শত্রু-মিত্র চিনতে পারার মতো সচেতনতা তৈরি করতে পারবে কিনা, তাতে আমি সন্দিহান। দুর্নীতিকে নিয়ন্ত্রণ করার শক্তিটি হয়তো ঝিমিয়ে পড়তে পারে, তাতেও লাভবান হবে লোভাতুর শ্রেণি। সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে সরকারকে অস্থিতিশীলতার মধ্যে রেখে, ফায়দা নেবে দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট। ২০২৪-এর এই অপ্রতিরোধ্য ছাত্র আন্দোলন সমাজকে তাহলে কী দেবে? পর্দার অন্তরালে যে উদ্দেশ্যটি লুকিয়ে ছিল, সেটি সফল হলেও বাংলাদেশ মুক্তি পেত না, দেখা মিলত আরও ভয়ংকর দুর্বৃত্ত ও হায়েনাদের। যে মৃত্যু সমাজের মুক্তির পথকে ত্বরান্বিত করে না, যে মৃত্যু নতুন কায়েমি স্বার্থবাদীদের জন্ম দেয়, যে মৃত্যু ভয়ংকর দানবীয় শক্তির উত্থান করে সে মৃত্যু অর্থহীন। সেই অর্থহীন মৃত্যু আর চাই না।
লেখক : কলামিস্ট ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষক ক্যালগেরি, কানাডা
mahmud_dipu@yahoo.com