বায়ান্নর ভাষাশহীদদের স্মরণ করে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী লিখেছিলেন, ‘শিশু হত্যার বিক্ষোভে আজ কাঁপুক বসুন্ধরা’। এ বাক্যটি ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানের মধ্যেই রয়েছে। সাম্য, শান্তি, নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক সহাবস্থানের মূল্যবোধ নিয়ে সব নাগরিকের মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার স্বপ্নই ছিল স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা। দীর্ঘদিনের পথচলায় আমরা হারিয়ে ফেলেছি স্বাধীনতার মূল চেতনা। ধুলায় মিশে গেছে মূল্যবোধ। নৈতিকতা, শ্রদ্ধাবোধ আর পরস্পরের প্রতি সহমর্মিতা আমরা ভুলে গেছি। এক অজানা-অপরিচিত ঘোরে কাটে সময়। নিজেকে সম্ভাবনার সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেওয়ার প্রাণান্ত প্রচেষ্টা। মাত্র অর্ধশতাব্দী পর সমাজের এমন বিকলাঙ্গ, কালদৃশ্য কেউ ভেবেছে কখনো! আন্দোলন, হত্যা আর গণহারে গ্রেপ্তারের সমাপ্তি নেই। নির্দিষ্ট সময় বিরতি দিয়ে, নিয়মিত এ সবই চলছে দেশে। হিসাব করলে দেখা যাবে, স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পর রাজনৈতিকভাবে এ পর্যন্ত আমরা শান্তিতে ছিলাম কত দিন? বাকি সময়, কী হলো!
মিটিং-মিছিল, টিয়ার গ্যাস, গুলি, হত্যা, নির্যাতনের মাত্রা কমে এসেছে। এখন চলছে কোটা সংস্কার আন্দোলনের শেষ পর্ব। তবু জনমনে ভয় কাটেনি। এখনো রাস্তায় রাস্তায় মিলিটারি। চলছে ঢিলেঢালা কারফিউ। কিন্তু গ্রেপ্তার চলছে। এরই মধ্যে উপচে পড়েছে টঙ্গীর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র। শিশু আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল ১৬ বছরের নিচে শিশু ও কিশোর অপরাধীদের বয়স্ক ও পেশাদার অপরাধীদের থেকে আলাদা রেখে বিচারকার্য পরিচালনা করা।
শিশু আইন, ১৯৭৪-এর ৩২ ধারা অনুযায়ী, দুস্থ, অবহেলিত, অভিভাবকহীন ও নির্যাতিত শিশু-কিশোরদের নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য আদালতের আদেশ অনুযায়ী, শিশু আইন, ১৯৭৪-এর ৩৩ ধারা অনুযায়ী, অনিয়ন্ত্রিত শিশু-কিশোরকে পিতা-মাতা বা বৈধ অভিভাবক কর্তৃক কিশোর আদালতে মামলা করা ও আদালতের আদেশের মাধ্যমে এবং শিশু আইন, ১৯৭৪-এর ৫৫ ও ৫৬ ধারা অনুযায়ী, বিভিন্ন আইনে পুলিশ কর্তৃক আটক হয়ে আদালতের মাধ্যমে বা মেয়াদপ্রাপ্ত সাজা হলে তাদের এখানে নিয়ে আসা হয়। এ বিষয়ে শুক্রবার দেশ রূপান্তরে ‘গ্রেপ্তার হয়ে ১৬ দিনে শিশুকেন্দ্রে ১৩৭ শিশু’ প্রকাশিত হয়েছে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালনায় টঙ্গী শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের (বালক) দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, ১৫ জুলাই থেকে ১ আগস্ট বেলা ১১টা পর্যন্ত ১৩৭ শিশু-কিশোর (বালক) টঙ্গী শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে এসেছে। ১৪ জুলাই সেখানে নিবাসীর সংখ্যা ছিল ৫৭৩। বর্তমানে এই সংখ্যা ৬১০। সারা দেশে বিভিন্ন মামলায় তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ধারণক্ষমতার চার গুণ বেশি থাকা এই সংশোধনাগারে শিশু ও কিশোরদের চিকিৎসার জন্য নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও নার্স। একটি পাঁচতলা ও একটি দোতলা ভবনে থাকে শিশু-কিশোররা। ধারণক্ষমতা ২০০ হলেও অনুমোদন আছে ৩০০ জন রাখার। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কারা এরা? এদের সব তারাই, যারা কোটা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। শিশু-কিশোরদের গুলি করার পর গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো, তাদের হ্যান্ডকাফ পরিয়ে কারাগারে নেওয়ার অমানবিক আচরণের দায় কর্তৃপক্ষ কীভাবে এড়াবে?
গণমানুষের অন্যতম প্রধান দাবি হচ্ছে, শিশু-কিশোর হত্যা-নির্যাতনের সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করে দোষীদের বিচারের সম্মুখীন করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বেপরোয়া মনোভাব ও মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগের নীতি পরিহার করে আচরণের বিশ্বাসযোগ্য পরিবর্তন নিশ্চিত করতে হবে। যে অপরাধে তাদের সংশোধনাগারে নিয়ে আসা হয়েছে, সেটি কোন ধরনের অপরাধ? কাউন্সেলিং যতই করা হোক না কেন, এভাবে মূল সমস্যার সমাধান হবে না। প্রকৃত সমাধান চাইলে সর্বজনগ্রাহ্য নীতি নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। আসলে ক্ষমতাহীনদের কোনো ‘অধিকার’ থাকতে নেই। আমরা যে বিভাজিত সমাজ গড়ে তুলছি, তার মূলে রয়েছে বৈষম্য। এ কারণে আমরা খুব সহজেই শিশুদের অবহেলা করি। আমরা শিশুদের নৈতিকতার শিক্ষা দিই। কিন্তু ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, তথা দেশের ভবিষ্যতের যত্ন নেওয়ার প্রক্রিয়ায় মৌলিক পরিবর্তন আনতে পারিনি। অবকাঠামোগত যত উন্নয়নই হোক না কেন, এই পরিস্থিতিতে স্বস্তিতে থাকা সম্ভব নয়। অশান্তি আর সামাজিক বিশৃঙ্খলার সুযোগে যদি নৈরাজ্য দেখা দেয়, তাকে শান্তিপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে আসা প্রায় অসম্ভব। সমাজের পচন কোথায়, দ্রুত সে বিষয় চিহ্নিত না করলে অল্প সময়ের মধ্যে সমাজ প্রগতির পথে থমকে দাঁড়াবে। পরে আর কৃষ্ণের কান্নায় কোনো গোপীই নাচবে না, জলকেলি তো দূরের কথা। ঘোর অন্ধকার, নৈতিকতার কালদৃশ্যের শেষ কবে?