বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে ঘিরে দেশ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। আন্দোলনটি আর ছাত্রদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ইতিমধ্যে এই আন্দোলনে শিক্ষার্থী, সাংবাদিকসহ দুই শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন। বাংলা ব্লকেড, কমপ্লিট শাটডাউনের পর শুরু হচ্ছে সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচি। অন্যদিকে শিথিল হলেও কারফিউ জারি আছে সরকারের তরফ থেকে। সার্বিকভাবে উদ্ভূত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে এই বাম নেতা কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদকীয় বিভাগের সাঈদ জুবেরী
দেশ রূপান্তর : ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আপনার সার্বিক পর্যবেক্ষণ কী?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : দেশটা ভয়ংকর পরিস্থিতির সম্মুখীন। বাইরে থেকে যতটুকু লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছে ভেতরে ভেতরে অবস্থা তারচেয়েও ভয়াবহ। এক অর্থে বলতে গেলে দেশ প্রায় অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। ব্যাংকরাপ্ট স্টেট বলতে যা বোঝায়, দেউলিয়াপনার চরমসীমায় পৌঁছে গেছে। তার সর্বশেষ অভিঘাত আমরা দেখতে পেলাম কোটা আন্দোলন এবং তাকে ঘিরে চরম জটিল অবস্থা তৈরির আগের ঘটনাগুলোর ভেতর এর নিদর্শন খুঁজে পাওয়া যাবে। কোটা ইস্যুটা পুরান, ১৮ সালে সাধারণ ছাত্ররা এটা নিয়ে একটা আন্দোলন করেছিল। তাদের প্রধানতম আপত্তি ছিল ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে। প্রথম দিকে তাদের মুখে বাতিলের কথা শোনা গেলেও প্রগতিশীলরা এটা বোঝাতে সক্ষম হয় সংস্কারের প্রয়োজন এবং আন্দোলনের স্লোগান সুনির্দিষ্ট এবং সুস্পষ্টভাবে দাঁড়িয়ে যায় যে কোটা সংস্কার চাই।
দেশ রূপান্তর : কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তো সেটা বাতিল করে দিলেন?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : কোটা সংস্কারের দাবিতে তুমুল আন্দোলনের মুখে নানা রকম অহেতুক মন্তব্য করার পর একপর্যায়ে খুবই রাগত স্বরে প্রধানমন্ত্রী বললেন, কোটা থাকলে বারবার সমস্যা হবে, ঠিক আছে! কোটাই আমি রাখব না, ওটা আমি বাতিল করে দিলাম। কিন্তু এই যে পিছিয়ে পড়া অবহেলিত সমাজের অংশকে বিশেষ সুবিধা দিতে হবে এটা আমাদের সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে।
দেশ রূপান্তর : শেষ পর্যন্ত তো আদালতের মাধ্যমে আবার কোটা বহাল হলো...
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : রাগত স্বরে বাতিল করে দিলেও সম্ভবত এটা প্রধানমন্ত্রীর অজানা ছিল না যে এই ঘোষণা আইনে টিকবে না। আদালতে কাউকে দিয়ে এটার বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেই কোটা আবার ফেরত আসবে। সুতরাং এটা সম্ভবত তিনি জানতেন এবং জেনেবুঝেই ঘোষণা দিয়েছিলেন। পরের ঘটনাবলি সেভাবে চলতে থাকল। দুদিন পরেই কয়েকজন মিলে কোর্টে আপিল করে যে এই সিদ্ধান্ত সংবিধান পরিপন্থী। এবং সেই অনুযায়ী হাইকোর্ট রায় দেয় যে প্রধানমন্ত্রী যেটা বলেছেন সে অনুযায়ী যে প্রজ্ঞাপন দিয়েছে যে কোটা বাতিল হয়ে গেল এটা বেআইনি এবং কোটা বহাল। পরে সেটা যায় আপিল বিভাগে। এইটা ঝুলে থাকতে থাকতে কিছুদিন আগে আপিল বিভাগ থেকে তারা হাইকোর্টের রায়টাকে বহাল রাখে যার ফলে কোটা সংস্কারের সমস্ত প্রচেষ্টা ছাত্র সমাজের আকাক্সক্ষা সেটা নষ্ট হয়ে যায়; তখন থেকে আবার আন্দোলন এই যে বর্তমান পরিস্থিতি হলো।
দেশ রূপান্তর : আপনি নিজে তো মুক্তিযোদ্ধা, আপিল বিভাগ তো কোটার সংস্কার করে রায় দিয়েছে, সেটার প্রজ্ঞাপনও হয়েছে। আপনার মত কী?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : জনগণের পিছিয়ে পড়া অংশের জন্য কোটা দরকার, আমার নিজের অভিমত এটা অবশ্যই থাকা উচিত। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধারা তো পিছিয়ে পড়া অংশ না। এটার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের কী সম্পর্ক? সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধাদের থাকার বিষয় প্রাসঙ্গিক ছিল, যখন আমরা দেশ স্বাধীন করেছিলাম। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল কিংবা মতাদর্শ নির্বিশেষে সাধারণ নাগরিক, শ্রমিক স্বপ্ন নিয়ে আমরা অস্ত্র হাতে দেশকে স্বাধীন করেছি, তখন উচিত ছিল তাদের নিয়ে দেশ গড়ে তোলা। তাজউদ্দীন সাহেব সেই কথাটি বলেছিলেন যে, আমি মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে দেশ গড়ব, আপনারা কেউ ঘরে ফিরে যাবেন না, সবাই মিলিশিয়া ক্যাম্পে নাম লেখান। পাকিস্তানি সামরিক বেসামরিক আমলাতন্ত্র এবং সেই সময়ের আইনকানুন অনুযায়ী দেশ পরিচালনা না করে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে শাসন করার কথা বলেছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু আসার পর এই সিদ্ধান্ত বাতিল করে দেন এবং পুরনো ব্রিটিশ কায়দায় দেশ পরিচালনা করা শুরু করেন। ওই সময়টা যেটা প্রয়োজন ছিল, পরবর্তীকালে সেটা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়। দেশ চলছে উল্টোপথে পাকিস্তানি ধারায়, এই অবস্থা পরিবর্তন না করে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান দেওয়ার কথা বলে শুধু মুক্তিযোদ্ধা না তাদের সন্তানাদি এমনকি তাদের নাতিপুতিদের কোটা সুবিধা দেওয়ার বিষয়টা সাধারণ মানুষের ভাষায় গরু মেরে জুতা দানের মতো একটা ব্যাপার। সরকার সেটাই করেছে।
দেশ রূপান্তর : আপনি তো বাংলাদেশের প্রায় সবগুলো ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় থেকেছেন। সেই আলোকে কোটা আন্দোলন নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতিকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : এই আন্দোলনটার মুখে শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ বললেন যে, এইসব ছোট বাচ্চাদের আমরা ছাত্রলীগ দিয়ে মোকাবিলা করব; গুন্ডা বাহিনী নামিয়ে দিল, হেলমেট বাহিনী নামিয়ে দিল এবং তাদের বর্বর অত্যাচারে আরও বেশি ক্ষিপ্ত হয়ে সাধারণ ছাত্ররা প্রতিরোধ গড়ে তুলল। সেই প্রতিরোধের মুখে ছাত্রলীগের গেস্টাপো বাহিনী তারা একেবারে ধূলিসাৎ হয়ে গেল। কানেধরা উঠবসসহ আরও নাজেহাল হয়ে সমস্ত শিক্ষাঙ্গন ছেড়ে তাদের চলে যেতে হলো। সাধারণ ছাত্রদের অংশগ্রহণ এত ব্যাপক। আমার নিজের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় ৬৯-এর ছাত্র আন্দোলন দেখেছি কিন্তু তখনকার আন্দোলনে সাধারণ ছাত্রদের যে স্বতঃস্ফূর্ততা যা ছিল, এবার সাধারণ ছাত্রদের অংশগ্রহণ তার চেয়ে অনেকগুণ বেশি। খালি একটা ডিফারেন্স যে সেই সময় ছাত্র আন্দোলনে শ্রমিকরা যুক্ত ছিল।
দেশ রূপান্তর : এবার শ্রমিকরা মাঠে নামতে পারছে না, নাকি ছাত্ররা তাদের ডাকতে পারছে না?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : শাজাহান খানের সঙ্গে একটা টকশোতে ছিলাম, তিনি বলেলেন তার ৩৮টা গাড়ি পুড়িয়ে ফেলেছে। আমি বললাম, আপনার ৩৮টা গাড়ি যদি পুড়িয়ে দিয়ে থাকে তাহলে আপনার তো আরও ১০০টা গাড়ি আছে। তো আপনি শ্রমিক নেতা, নাকি বাস মালিক নেতা? আপনি তো বলছেন শ্রমিক মালিক ভাই ভাই, সুন্দর করে দেশ গড়তে চাই। আপনি তো সংগ্রামের বিরুদ্ধে শ্রমিকদের মালিকের পক্ষ হয়ে দালালি করার তাগিদ দিচ্ছেন, আপনি নিজেকে শ্রমিক নেতা হিসেবে দাবি করেন কীভাবে? এভাবে এরা এখানকার শ্রমিক আন্দোলনকে ধ্বংস করে দিয়েছে।
দেশ রূপান্তর : আপনি ছাত্ররাজনীতির ভেতর দিয়ে এসেছেন এবং একটা সংগঠনও পরিচালনা করছেন দীর্ঘদিন ধরে। এই কোটা আন্দোলনই বলেন কিংবা সড়ক আন্দোলন যারা করছে তারা কিন্তু সাংগঠনিক কাঠামোর বাইরে থেকে সংগঠিত হচ্ছে, কাঠামোগত নেতৃত্ব নেই। এটা কীভাবে দেখছেন?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : এখনো পর্যন্ত আন্দোলন তো বিকাশমান। এটা সম্পূর্ণ ঠিক না। কাঠামো একটা আছে, একটা সমন্বয় কমিটি আছে; একটা কেন্দ্র আছে। কিন্তু এটা গতানুগতিক ধারায় না। তবে আমাদের সময়ও ছিল যে একটা গ্রুপ অ্যারেস্ট হয়ে গেলে সেকেন্ড একটা গ্রুপ আসবে। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের কথাই ধরেন, সেখানে ছাত্রসংগঠনগুলো যেমন ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন, এনএসএফের একটা অংশ এসে এটার সঙ্গে যুক্ত হলো। একটা সুগঠিত সাংগঠনিক কাঠামোভিত্তিক শক্তি আন্দোলনের পরিচালনার দায়িত্ব নিল। এখনকার এদের সঙ্গে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করতে গেলে বলতে হয় এটা অগঠিত এবং দুদিন পরেই এটা গঠনতান্ত্রিক হয়ে যাবে। এবং তার ভ্রণ ইতিমধ্যে গঠিত হয়ে আছে, সমন্বয় কমিটি। তারা পরস্পর বসে, কানেক্টিভলি কাজ করে এবং তাদের নির্দেশ অনুযায়ী কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। কিন্তু আগে যেটা ছিল অনেক কিছু গভীরে ডিসকাশন করে, আন্দোলনের স্ট্র্যাটেজি সেগুলো ঠিক করা যেত এখন এটা না থাকার ফলে সেই জায়গাটা অতটা গভীরে যেতে পারছে না। অনেকে বলে অগঠিত থাকা এটা একটা বিরাট শক্তি, আমি বলি শক্তিও বটে দুর্বলতাও বটে। সাধারণ ছাত্ররা প্রতিষ্ঠিত ছাত্র সংগঠনে আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। এটা খুব ভালো জিনিস বলে আমি মনে করি না।
দেশ রূপান্তর : কেন? এটাতে আপনারও দায় কিছুটা আছে।
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : সেটা বললেই তো হবে না। এখানে যে রাষ্ট্র, সমাজ, যেখানে বেনজির আহমেদ পালিয়ে চলে যায়, ক্যাসিনো কালচার তৈরি হয়। আবার এখানে এক সময়ের বামপন্থিরা ভিকারুন নিসায় ভর্তির টিকিট বিক্রি করে, ক্যাসিনো চালায় আরও কত কিছু। পুরো সমাজ আসলে পচে গেছে।
দেশ রূপান্তর : ক্যাসিনো মেনন?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : আপনারা তো সবই জানেন। সেখান থেকে আমি এবং যে সংগঠন করতাম ছাত্র ইউনিয়ন, আমি গর্ব করে বলব যে, বাইরে থেকে প্রচন্ড দূষিত হাওয়া তাদের আক্রমণ করা সত্ত্বেও এখনো তারা সততার সঙ্গে আদর্শের ঝান্ডাটাকে ওপরে তুলে রেখেছে কিন্তু দুর্বল হয়ে গেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তো নির্বাচিত ছাত্র সংসদ নেই। এটাও পরিকল্পিতভাবে করা হয়েছে যাতে পপুলার ছাত্ররা নেতৃত্বে না আসতে পারে এবং মাসল ও মানি পাওয়ার দিয়ে যারা আধিপত্য করতে পারে তারাই যাতে ছাত্রদের মুখপাত্র হতে পারে। সুতরাং এখানে থেকে বের হয়ে এর বাইরে আমাদের আন্দোলনটা গড়ে তুলতে হবে।
দেশ রূপান্তর : আচ্ছা, আমরা কথা বলছিলাম বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কাঠামো নিয়ে।
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : এটার ভেতরেও একটা সংগঠিত চেতনা কাজ করছে। তা না হলে ১৮ সালের শুরুতে কোটা বাতিল করো ‘কোটা সংস্কার করো’ স্লোগানে রূপান্তর হতো না। এবার যে প্রথম স্লোগান উঠল ‘আমি কে তুমি কে, রাজাকার, রাজাকার’ এটা অল্প সময়ের ভেতরে পাল্টে নিয়ে আসল স্লোগানে তারা চলে আসল ‘আমরা নাকি রাজাকার, কে বলেছে স্বৈরাচার’, ‘চাইতে গেলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার’ এর ভেতর একটা সংগঠিত চেতনা আছে, কারেক্ট হওয়ার।
দেশ রূপান্তর : আপনি তো মুক্তিযোদ্ধা। স্লোগানটি প্রথমে শুনে আপনার কেমন প্রতিক্রিয়া ছিল?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : এখানে প্রতিক্রিয়ার কিছু নেই। আমি জানতাম যে এই স্লোগান টিকত না। আমাদের আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময়ে এরকম নানা স্লোগান দেওয়া হয়েছে কিন্তু সেগুলো টিকতে পারেনি। সাধারণ ছাত্ররা অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বুঝতে পারে কোন স্লোগানটা কারেক্ট। কিন্তু এখন সরকার হলো খুব সুচতুর। ১০১টা স্লোগান থেকে ১টা স্লোগান কেউ হয়তো দিয়েছিল এবং সেটা সরকার পিক করে হাইপো তৈরি করল এবং আমাদের প্রচারযন্ত্র তো আবার সরকার নিয়ন্ত্রিত, তারাও সেভাবে প্রচার চালাল। তারা সেটা দিয়ে একটা পারসেপশন তৈরি করার চেষ্টা করল। কিন্তু সাধারণ ছাত্ররা বুঝে যে এগুলো হলো মিথ্যাচার।
দেশ রূপান্তর : কোটা আন্দোলন নিয়ে আওয়ামী লীগের আচরণকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : এই আন্দোলন সহিংস হওয়ার মূল কারণ হলো ছাত্রলীগ। আর আচরণের যে ব্যাপারটা বললেন আওয়ামী লীগ এরকমই। আওয়ামী লীগ তার গুন্ডাবাহিনী ব্যবহার না করা ছাড়া ক্ষমতায় থাকতে পারবে না।
দেশ রূপান্তর : বারবার বলা হচ্ছে তৃতীয় পক্ষ, অনুপ্রবেশকারী...। আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : ইংরেজিতে একটা কথা আছে যে Before you kill a dog give it a bad name অর্থাৎ কুকুরকে মারতে হলে প্রথমে একটা বদনাম দিয়ে দিতে হয়। সুতরাং একটা বদনাম দেওয়া লাগবে এবং এই আন্দোলনে যাতে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ না থাকে সেটার ব্যবস্থা নিতে হবে। সুতরাং পুলিশ দিয়ে মিছিল ঠেকাও কিন্তু সেনসেটিভ জায়গায় যেখান থেকে ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে ওখানে পুলিশ দিয়ো না; বিটিভিতে পুলিশ দিয়ো না। কারণ ওখানে আক্রমণ হলে আমি বলতে পারব যে এরা হলো
দুষ্কৃতকারী, অনুপ্রবেশকারী ঢুকে গেছে। সুতরাং আন্দোলন খারাপ। এটা সরকারের পুরনো কৌশল, অনুপ্রবেশকারী থিওরি। আমি প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করতে চাই বা আওয়ামী লীগের নেতাদের প্রশ্ন করতে চাই, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় খন্দকার মুশতাক অনুপ্রবেশকারী ছিল না? আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামকে নস্যাৎ করে দিয়ে পাকিস্তানিদের সঙ্গে মিলে ষড়যন্ত্র করেছিল না? মুশতাকের এই অনুপ্রবেশকারী ষড়যন্ত্রের কারণে কি আমরা মুক্তিযুদ্ধকে খারাপ বলে আখ্যায়িত করেছিলাম? এসব এলিমেন্ট, আইয়ুববিরোধী আন্দোলনের সময়, ৬৯’র আন্দোলনের সময়ও আমরা দেখেছি, আমি অনেক নাম বলতে পারি। কথা হচ্ছে গণআন্দোলনে নানা কিসিমের, নানান চিন্তার লোক আসবে। কিন্তু কোনো উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে, ষড়যন্ত্রমূলকভাবে সাবোটাজ করার জন্য যদি কেউ ঢুকে তারা আসলে সরকারি এজেন্ট, প্রভোকেটর বলে ওটাকে। এ ধরনের এজেন্ট, প্রভোকেটর ঢুকে যদি আমার আন্দোলনকে নস্যাৎ করার চেষ্টা করে আমি তো তাকে ঢুকতে দেব না, বাধা দেওয়ার চেষ্টা করব। উৎকৃষ্ট বাধা এবং একমাত্র নিশ্চিত পথ হলো আরও বেশি বেশি জনগণ বা সাধারণ ছাত্রের অংশগ্রহণ।
দেশ রূপান্তর : এই আন্দোলনে অনুপ্রবেশকারী কারা, কীভাবে তারা ঢুকল?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : সাধারণ ছাত্রদের ওপর হামলা চালিয়ে সরকারই এর সুযোগ করে দিয়েছে। তাদের ভাষায় কুচক্রী, অনুপ্রবেশকারী। এর পেছনে সরকার যে ইনভলভ না এটার নিশ্চয়তা কে দিতে পারে? চিটাগংয়ে আওয়ামী লীগের এক নেতা ৪ লাখ টাকা দিয়েছেন বাসে আগুন দিতে, আবার শোনা যাচ্ছে, মেট্রোরেলের ঘটনায় পরিবহন শ্রমিকরা জড়িত। সন্দেহ করার অনেক কারণ আছে যদিও খালি সন্দেহের ওপর নির্ভর করে তো সব বলা যায় না। তবে সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ আছে যে এটা সরকারেরই সুপরিকল্পিত প্রয়াস; ইন্টারনেট বন্ধ করে দিতে হবে সেজন্য তার লোকজনকে দিয়ে এই প্রজেক্টটা কার্যকর করেছে। সন্ত্রাস হচ্ছে যাতে কারফিউ জারি করতে পারে, মিলিটারি নামাতে পারে। আন্দোলন যাতে শান্তিপূর্ণভাবে বিকশিত হয়ে সরকার পতনের দিকে না যেতে পারে সেটার জন্য এগুলো করেছে এটাই হলো জনগণের ন্যারেটিভ, আর সরকারের ন্যারেটিভ সম্পূর্ণ ভিন্ন। আর আমি খুব দৃঢ়তার সঙ্গে বলব বাংলাদেশের জনগণ সরকারের ন্যারেটিভ, সরকারের বয়ানে বিশ্বাস করে না। এই আন্দোলনে ২ শতাধিক মানুষকে হত্যা করা হলো এবং এই নির্মমতা আমার জীবনে অন্ততপক্ষে দেখিনি, একেকটা ঘটনার বর্বরতা যেন গাজার মতো। সুতরাং খুবই সাধারণভাবে ইস্যুতে চলে আসল হত্যাকারীর বিচার করো এবং সেখান থেকে খুবই স্বাভাবিকভাবে স্লোগানটা এখন ‘সরকার গদি ছাড়।’ খুবই স্বাভাবিকভাবেই আসছে, এটা আগে থেকে পরিকল্পনা করে করা হয়েছে সরকার যেটা বলার চেষ্টা করে সেটা সঠিক না।
দেশ রূপান্তর : অরাজনৈতিক আন্দোলনটা শেষ পর্যন্ত হত্যা, ধ্বংসযজ্ঞের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক দাবি নিয়ে হাজির হয়েছে।
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : সে রকমই তো হয়। আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে যখন আন্দোলন হয় তখন ইস্যুটা কী ছিল? প্রথমে বেসিক প্রিন্সিপালস, নতুন ইনস্টিটিউশন হবে ওটার মূলনীতি সেটার বিরুদ্ধে সংগ্রাম। তারপর হলো শরীফ কমিশনের রিপোর্টের ওপরে, তিন বছরের ডিগ্রি কোর্স। সেখান থেকে হুট করেই চলে গেল ডাউন উইথ আইয়ুব, আইয়ুব খান ধ্বংস হোক।
দেশ রূপান্তর : ৫২, ৬২, ৬৯ বা ৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানেও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। তুলনামূলক কম হলেও। ওই সময়ের সরকারগুলোর রেসপন্স আর বর্তমান সরকারের রেসপন্সের মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখছেন?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : মৌলিকভাবে একই। গণবিরোধী, অর্থনৈতিক স্বার্থরক্ষার জন্যই সব। মানুষের ভেতরে এটা প্রচার আছে যে সব ঘটনা ইঞ্জিনিয়ার্ড করা হয়েছে বেনজির, মতিউর রহমানসহ এসব থেকে মনোযোগ ডাইভার্ট করতে এবং ইন্ডিয়ার সঙ্গে হাসিনা মানুষকে না জানিয়ে যে চুক্তি করে এসেছে সেসব থেকে দৃষ্টি সরাতে এসব করা হয়েছে।
দেশ রূপান্তর : এই টোটাল ঘটনায় আদালতের ভূমিকাকে কীভাবে দেখেন?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : এটা কিন্তু আদালতের বিষয় না। আমাদের অভিজ্ঞতা তো আছেই এবারও সেটার প্রতিফলন হলো যে আদালত পরিপূর্ণ স্বাধীনতার ভিত্তিতে কাজ করতে পারে না। কেননা বলা হলো যে এটা প্রক্রিয়ার ভেতরে আছে, আরও কয়েক মাস লাগবে। সেটা সরকারি প্রশাসনিক ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়ে একদিনের ভেতরেই হেয়ারিং করে রায় দেওয়ানো হলো। সুতরাং বিচারবিভাগের স্বাধীনতা যে কতটা হাস্যকর ছেলেখেলায় পরিণত হয়েছে সেটাই আরও একবার প্রমাণিত হলো।
দেশ রূপান্তর : আন্দোলনের মধ্যেই হঠাৎ করে ঘোষণা এলো জামায়াত নিষিদ্ধ করার। এটা নিয়ে আপনার মন্তব্য কী?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : মানুষের সন্দেহ যে ইস্যুটাকে ডাইভার্ট করে সরকার যে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে এবং জামায়াত শিবিরকে নিষিদ্ধ করেছে এ ধরনের একটা ফলস ইমেজ তৈরি করার জন্য এটা করা হয়েছে। প্রথমত হলো জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার কোনোই প্রয়োজন নেই। কারণ, ৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর জামায়াত নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। কেননা পাকিস্তান সেনাবাহিনী যে আত্মসমর্পণ দলিলে সই করেছে সেখানে লেখা আছে যে, আমাদের সমস্ত রকম সেনাবাহিনী, প্যারা মিলিটারি এবং অক্সিলারি ফোর্সেস আমরা নিঃশর্তভাবে আত্মসমর্পণ করলাম। তো পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অক্সিলারি ফোর্স কারা ছিল? আলবদর, আল শামস, রাজাকার, জামায়াতে ইসলামী এগুলো পলিটিক্যাল অক্সিলারি ফোর্স। কিন্তু ৭৫ সালের পর ক্ষমতার সমীকরণ মেলানোর প্রয়োজনে জিয়াউর রহমানের হাত দিয়ে প্রথমে ইসলামিক কী একটা দল করল, তারপর আস্তে আস্তে জামায়াতে ইসলামী এলো। তারা ওদের নিয়ে এলো। তারপর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলন গড়ে উঠল, সেই আন্দোলনের কেন্দ্র হলো শাহবাগ। এত বছর টাইম চলে গেল আরকি। বিএনপিও একেক সময় বলেছে আমরা জামায়াতে ইসলামী নিষিদ্ধ করব কিন্তু করে না, আওয়ামী লীগও বলেছে আমরা নিষিদ্ধ করব কিন্তু করেনি। মন্ত্রী এক সপ্তাহ আগেই বলেছেন যে এটা একটা আইনি প্রক্রিয়ার ভেতরেই আছে। দ্বিতীয়ত হলো জামায়াতে ইসলামীকে আইন দ্বারা নিষিদ্ধ করার প্রয়োজন নতুন করে উত্থাপিত হয়েছে আমাদের সংবিধান সংশোধন করার কারণে। সম্ভবত একটা ধারা ছিল যে ধর্মের ভিত্তিতে রাজনৈতিক দল করা যাবে না। এই ধারাটায় জিয়াউর রহমান ল্যাঙ্গুয়েজটা বদলে দেন, সেই জিয়াউর রহমানের পরিবর্তিত ভাষাই আওয়ামী লীগ রেখে দেয়, যে রকম রেখে দিয়েছে রাষ্ট্রধর্ম। সুতরাং কনস্টিটিউশনালি একটা ফাঁক বের করেছে সবারই ধর্মের নাম দিয়েও রাজনৈতিক দল করা যাবে। তৃতীয়ত হাইকোর্টের একটা জাজমেন্টে আছে জামায়াতে ইসলামী কোনো রাজনৈতিক দল না, এটা সশস্ত্র সংগঠন। সুতরাং রাজনৈতিক দলের যে অধিকারগুলো সেই অধিকার এটার জন্য প্রযোজ্য না। আইন আদালতে সরকার এটিকে নিয়ে গেল। মুক্তিযুদ্ধে লড়াইয়ের মৌলিক জয়-পরাজয় এবং সত্য-মিথ্যার বিষয়টা বাদ দিয়ে এটাকে নিয়ে যাওয়া হলো নিবন্ধনের শর্ত পূরণ হয়েছে কি হয়নি প্রশ্নে। এবং সেটা বৈধ কি বৈধ না এই আইনি আলাপ দীর্ঘ বছর চলতে থাকে। তার চেয়েও ইমপর্টেন্ট আরেকটা কথা, শুধু জামায়াত কেন, এ ধরনের আরও ছোট-বড় সংগঠন আছে। হেফাজতে ইসলাম আছে, কে বলল এরা অরাজনৈতিক সংগঠন? আওয়ামী লীগের সঙ্গে আলোচনা করে এগ্রিমেন্ট করে তারা। হেফাজতের ছয় দফা, হাসিনা নিজেও বলেছেন, আমি এটা সমর্থন করি এবং সে অনুযায়ী সিলেবাস বদলানো হলো। কার কবিতা থাকবে, কারটা থাকবে না এগুলো তারা ঠিক করল। জামায়াতে ইসলামী এবং এ রকম সংগঠনগুলো একবার আওয়ামী লীগের কাঁধে আবার বিএনপির কাঁধে বন্দুক রেখে একটা বিপজ্জনক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। লড়াইটা খালি সাংগঠনিকভাবে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের ব্যাপার না, লড়াইটা আরও গভীরে। এটা হলো একটা মতাদর্শিক লড়াই, একটা কালচারাল লড়াই এবং সেই মতাদর্শিক লড়াইকে অগ্রসর না করে আমি যদি জামায়াতে ইসলামী বা এ ধরনের সাম্প্রদায়িক সংগঠনের সাম্প্রদায়িকতাকে গ্রহণ করে সমাজে ছড়িয়ে দিই, তাহলে পরে প্রকারান্তরে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করি বা না করি, আমি নিজেই জামায়াত হয়ে দেশকে জামায়াতের আদর্শে পরিচালনা করতে থাকব কার্যত এখন তাই হয়েছে। তো সেই ফাইটটা তো করবে না, কেন করবে না? কারণ হলো পাওয়ার। সুতরাং গোটা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা এবং সরকারি কার্যকলাপের যে ধারা বর্তমানে চলছে সেটা আমূল পালটে দিয়ে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ধারায় আসতে হবে। সেটা কী? সেটা হলো সমাজতন্ত্র অভিমুখী, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক ধারা; রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতিতে যেটা প্রতিফলিত হয়ে আছে সেই ধারায় আসতে হবে। আওয়ামী লীগ এটা পারেনি, বিএনপিও এটা পারেনি। এটা একটা মৌলিক সংগ্রাম, এটা বামপন্থিদের করতে হবে। কিন্তু এখন মানুষের কাছে বড় প্রশ্ন, সরকার গদি ছাড়ো। গদি তাকে ছাড়তেই হবে।
দেশ রূপান্তর : সেটা কীভাবে? আপনার এবং আপনার দলের দাবি কী?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : শেখ হাসিনা বলেছে, এতসব ঘটনার বিচার আমি জনগণের কাছে দিলাম, জনগণ বিচার করবে। তো জনগণ কীভাবে বিচার করবে? ১৬ কোটি লোক কি হাইকোর্টে গিয়ে বিচার বসাবে? অত জায়গা আছে সেখানে? জনগণ বিচার করে তার ভোটের মাধ্যমে। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শেখ হাসিনা একটা ঘোষণা দিক যে, আমি ক্ষমতা ছেড়ে দিচ্ছি এবং কীভাবে জনগণ আমাকে বিচার করবে, সে রায়টা কীভাবে হিসাব-নিকাশ করা হবে সেটা সবাই মিলে আলোচনা করে সেই পথ এবং পদ্ধতি বের করে দেন, একটা রূপরেখা বের করে দেন। আমার মনে আছে এরশাদও সে কথা বলেছিল, ‘আমি তো ক্ষমতা ছাড়তে চাই, কিন্তু সংবিধানে তো ছাড়ার পথ নেই।’ তখন আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে ঠিক আছে, পথ আছে নাকি নেই সেটা আমরা বের করে দেব। সেটার দায়িত্বে আমি নিজে ছিলাম। সেই তিনদলের রূপরেখা তৈরির কথা বলছি। আওয়ামী লীগ যদি এরকম সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রূপরেখা আমরা তৈরি করে দেব এবং সেই ভিত্তিতে জনগণ আবার রায় দেবে।
দেশ রূপান্তর : নব্বইয়ের যে রূপরেখা আপনারা দিয়েছিলেন সেখানে নিয়মতান্ত্রিক দলগুলো ছিল। কিন্তু শিক্ষার্থীরা তো কোনো সংগঠন করেনি। ওরা একটা প্ল্যাটফর্ম থেকে সমন্বয় করছে। এই রূপরেখায় তাদের মত কীভাবে থাকবে?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : রাজনৈতিক দলগুলো তো আছে। আর শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের আগে থেকে যে শ্রমিক আন্দোলন হচ্ছে, গার্মেন্টস কর্মীদের আন্দোলন হচ্ছে, চা বাগানের আন্দোলন হচ্ছে, মানবাধিকারের বিষয়ে আন্দোলন হচ্ছে এগুলো তো হচ্ছে, এরা তো আছে। এরশাদের সময়েও তো তাই ছিল।
দেশ রূপান্তর : তখন তো সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য টাইপের কিছু একটা ছিল, যা আসলে ছিল নিয়মতান্ত্রিকভাবে গঠিত ছাত্র সংগঠনগুলোর ঐক্য। কিন্তু বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনটি তো ছাত্র সংগঠনগুলোকে ডিনাই করে এগিয়েছে। এখানে কি ছাত্ররাজনীতির পুনর্মূল্যায়ন দরকার না?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : এখন পুনর্মূল্যায়নের বিষয় না, এখন হচ্ছে আন্দোলনের লজিক অনুযায়ী আন্দোলনটিকে একটা পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে হবে। সেই পরিণত এজেন্ডাটাও সামনে চলে এসেছে, সেটা হচ্ছে সরকার গদি ছাড়ো। এবার এটাকে রাজনৈতিক দলগুলোর অ্যাড্রেস করতে হবে। এটাকে ডিল করতে হবে পলিটিক্যাল পার্টিকেই।
দেশ রূপান্তর : আপনার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং দেশ সংঘাতময় পর্ব পার হচ্ছে। একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে পরামর্শ বা মন্তব্য কী?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : আমি মনে করি এখন খুবই ভয়াবহ অবস্থা। শুভবুদ্ধি থাকলে পরে আমি যে সুপারিশ করলাম সেটাই আওয়ামী লীগ করবে। দ্যাট ইজ দ্য অনলি ওয়ে দেশকে রক্ষার। তা না হলে দেখব এরকম নৈরাজ্য চলতে থাকবে, একটা পর্যায়ে গিয়ে একটা স্টেজে এটা আরও বড় হবে কিংবা দেশি-বিদেশি, আঞ্চলিক এসব শক্তির ইন্ধনে অন্য প্রতিক্রিয়াশীল রেজিম তৈরি হবে। সেটা না করে সব কিছুর পরেও জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন যদি সত্যিই ঘটাতে চায় এবং হাসিনা যেটা বলছে সেটা যদি তার মনের কথা হয়ে থাকে যে জনগণকেই আমি বিচার দিলাম। তাহলে জনগণকে বিচার করার সুযোগ তাকে নিশ্চিত করতে হবে। সেটা করতে হলে তাকে ঘোষণা দিতে হবে, আমি ক্ষমতা ছেড়ে দিচ্ছি, ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে কীভাবে কী হবে সেই পথ আপনারা তৈরি করে দেন। আমরা সবাই মিলে রূপরেখা তৈরি করে নেব।
দেশ রূপান্তর : এখানে ভারত বা পশ্চিমাদের ভূমিকা কেমন দেখতে পান?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : এখনো পর্যন্ত আমি ইনফর্মড না। তবে একটা হতে পারে কন্ট্রোল, তারপর আরেকটা হচ্ছে দুর্বল, নৈরাজ্যপূর্ণ পরিস্থিতিতে সরকারের কাছে সুবিধা নিতে পারবে। যেমন করিডর, তিস্তা বাঁধ বা আমেরিকা যেমন কয়েকটা বিষয়ে স্বাক্ষর করে নিয়েছে আবার ডিপ সি পোর্টের বিষয়টা। যেগুলো মানুষ ভালোভাবে জানছেই না।
দেশ রূপান্তর : সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : ধন্যবাদ আপনাকে।
অনুলিখন : মোজাম্মেল হৃদয়