কয়েক দিন আগে বলা হয়েছিল, কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সহিংসতার ঘটনায় আটক শিক্ষার্থীদের মধ্যে কেউ যদি এইচএসসি পরীক্ষার্থী হয়, তাহলে তার জামিনে সহায়তা করবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। কোটা সংস্কার আন্দোলন ইস্যুতে ঢাকাসহ সারা দেশে সহিংসতার ঘটনায় ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন থানায় মামলা করা হয়েছে প্রায় ৩০০। আবার প্রায় ৩০০০ মানুষকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মামলাগুলোতে জ্ঞাত-অজ্ঞাত মিলিয়ে পৌনে ৩ লাখ আসামি করা হয়েছে। হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, সরকারি কাজে বাধা, পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে করা এসব মামলার মধ্যে ৫৩টিতে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। হত্যার অভিযোগে করা মামলাগুলোর বেশিরভাগের বাদী পুলিশ। তবে সহিংসতার ঘটনায় ভুক্তভোগী বা তাদের পরিবার বাদী হয়েও কিছু মামলা করেছে। জানা যাচ্ছে, দেশের বিভিন্ন আদালত থেকে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের জামিন দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু মামলা থেকে অব্যাহতি না দিয়ে শুধু জামিন দিলেই কি সমস্যার সমাধান হবে? আইনমন্ত্রী আনিসুল হক দ্রুত প্রসিকিউশনকে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের জামিনের নির্দেশ দিয়েছেন। এটা আগে করলে কী হতো? এমন সিদ্ধান্ত তখনই নেওয়া হলো, যখন বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের একের পর এক কলেজে এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা সমন্বিতভাবে পরীক্ষা বর্জন করেছেন।
বাংলাদেশে শিশুদের জন্য ‘শিশু আইন, ২০১৩’ নামক মোট ১০০টি ধারার বিশেষ আইন আছে। সেই আইনে বলা হয়েছে, ‘বিদ্যমান অন্য কোনো আইনে ভিন্নতর যাহা কিছুই থাকুক না কেন, এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণ কল্পে, অনূর্ধ্ব ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত সকল ব্যক্তি শিশু হিসাবে গণ্য হইবে।’ আরও বলা হয়েছে, শিশুর মাধ্যমে সংঘটিত যেকোনো অপরাধের বিচার করবে শিশু আদালত এবং অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত অথবা বিচারে দোষী সাব্যস্ত শিশুকে সাধারণ জেলহাজতের পরিবর্তে নিরাপদ হেফাজতে বা শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে রাখতে হবে। এ ছাড়া বয়স নির্ধারণের জন্য শিশুর জন্মনিবন্ধন সনদ অথবা, সনদের অবর্তমানে স্কুল সার্টিফিকেট বা স্কুলে ভর্তির সময় উল্লেখ করা তারিখসহ প্রাসঙ্গিক কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করতে বলা হয়েছে। গ্রেপ্তারের সময় এই আইন কি মেনে চলা হয়েছে?
সরকারি স্থাপনায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ, পুলিশের ওপর হামলা, সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে শুক্রবার পর্যন্ত রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় করা পাঁচ শতাধিক মামলায় গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে কয়েকশ এইচএসসি পরীক্ষার্থী রয়েছেন। এখন দেশব্যাপী তাদের জামিন দেওয়া হচ্ছে। এ ব্যাপারে শনিবার দেশ রূপান্তরে ‘৬০ এইচএসসি পরীক্ষার্থী জামিন পেলেন’ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সহিংসতার ঘটনায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, টাঙ্গাইল, রংপুর ও খুলনাসহ বিভিন্ন জেলার থানায় করা মামলায় গ্রেপ্তার এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের জামিন দিচ্ছে আদালত। এখন তাদের কীভাবে জামিন দেওয়া হচ্ছে? সরকারের একজন মন্ত্রী বলেছেন যারা এই আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে, হত্যা করেছে তাদের আইনের মুখোমুখি করা হবে। যারা নির্দোষ তাদেরই জামিন দেওয়া হচ্ছে। কী অবাক করা কথা। যদি সেই ব্যক্তি কোনো ধরনের অপরাধ নাই-ই করেন, তাহলে তাকে কেন গ্রেপ্তার করা হলো!
চট্টগ্রামে ১৬ জন এইচএসসি পরীক্ষার্থীর জামিন মঞ্জুর করেছে আদালত। রংপুরে দুজন এইচএসসি পরীক্ষার্থীসহ ৮ শিক্ষার্থীকে জামিন দেওয়া হয়েছে। ঢাকা শিক্ষা বোর্ড থেকে বলা হয়েছে, আগামী ১১ আগস্ট থেকে স্থগিত পরীক্ষাসমূহ নতুন সময়সূচি অনুযায়ী শুরু হবে। স্থগিত পরীক্ষাসমূহের নতুন সময়সূচি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে পরবর্তী সময়ে জানিয়ে দেওয়া হবে। প্রথমে গত ১৮ জুলাইয়ের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। এরপর ২১, ২৩ ও ২৫ জুলাইয়ের সব শিক্ষা বোর্ডের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। এরপর আরেক দফায় ২৮ জুলাই থেকে ১ আগস্ট পর্যন্ত পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। এখন এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের জামিন নিয়ে যা চলছে, তার যৌক্তিক ব্যাখ্যা কে দেবেন আমরা জানি না। অন্যদিকে গতকাল কোটা সংস্কার আন্দোলনে আটক হওয়া সাধারণ শিক্ষার্থীদের মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
শিক্ষার্থীদের শুধু জামিন নয়, মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া উচিত। কোনো শিক্ষার্থীকে আটক রাখা বড় ধরনের ভুল। এ বিষয়ে যত দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, ততই মঙ্গল।