আপদের ওপর বিপদের দিনে সাংবাদিকরা

সত্য বড় কঠিন। আর সত্য কখনো কখনো অনেকেরই অসহ্য। আবার বলা হয়ে থাকে, সাংবাদিকদের কোনো বন্ধু নেই। স্বাভাবিকভাবেই সাংবাদিকদের দেওয়া তথ্যে কেউ উপকারভোগী, কেউ আক্রান্ত। ট্র্যাজেডি হচ্ছে, উপকারভোগীরাও এই উপকারের কথা তেমন মনে রাখেন না। আর আক্রান্তরা তো প্রতিপক্ষ ভেবে মারধর, গালমন্দসহ যা ইচ্ছা করে বসেন। কোটা আন্দোলন ঘিরে এক-একটি ঘটনায় তা টাটকাভাবে আবারও প্রমাণিত।

কোটা আন্দোলনের সংবাদ সংগ্রহে গিয়ে সাংবাদিকরা পুলিশের হামলায় পড়েছেন। সরকারপক্ষের কাছেও সাংবাদিকরা প্রতিপক্ষ। আন্দোলনকারীরাও কোথাও কোথাও নিপীড়ন করেছেন সাংবাদিকদের। মানে সাংবাদিকরা কারও বন্ধু নন। তারাও কারও বন্ধু নন। এক অবর্ণনীয় অবস্থায় গণমাধ্যমকর্মীরা। রীতিমতো পেয়ে বসার মতো অবস্থা। তার মানে কি পক্ষ-বিপক্ষের মানুষ, পুলিশ, রাষ্ট্র, ক্ষমতাসীন সবার কাছেই তথ্য ও সত্য বড় কঠিন? সাংবাদিকরা ঘটনার তথ্য সংগ্রহ করুক, চিত্র ধারণ করুক তা অসহ্য নানা মহলের কাছে?

কোটা সংস্কারের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনটি সরকারের অবহেলা ও অদূরদর্শিতায় সহিংসতার দিকে গেলে রাজধানীসহ বিভিন্ন জায়গায় সাংবাদিকরা আক্রমণের শিকার হন। এরই মধ্যে পুলিশের গুলিতে মৃত্যুও হয়েছে একাধিক সাংবাদিকের। কোনো কোনো হামলা বা আক্রমণের ধরন বলছে, গণমাধ্যমকর্মীরা পরিকল্পিত আক্রমণের টার্গেট। তা একেবারে না বোঝে, না জেনে বা ঝোঁকের মাথায় ঘটেছে এমনটি মনে করার অবস্থা নেই। বেশ কিছু টেলিভিশন চ্যানেলের গাড়িও জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। একবাক্যে বলা যাচ্ছে না এসব ঘটনার হোতা বা কুশীলব কারা? এবার কেন প্রায় প্রতিদিনই গণমাধ্যমকর্মীরা আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন, হচ্ছেন? প্রশ্নটা বড় রকমের ভাবনা এবং উদ্বেগের বিষয়। এ নিয়ে কিছু কথাবার্তা হচ্ছে। গণমাধ্যমগুলো আন্দোলনকারী, আন্দোলন দমনকারী, সরকার সবারই প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে কেন? সংকটকালে পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে পারছেন না? এ ধরনের নিষ্পত্তিহীন প্রশ্নের সঙ্গে অসমাপ্ত কথামালাও প্রচুর। আছে কিছু আত্মসমালোচনাও। আর সীমাবদ্ধতা তো আছেই।

নিদারুণ বাস্তবতা হচ্ছে, সত্য-মিথ্যা বড় আপেক্ষিক হয়ে গেছে। যে তথ্য কারও কাছে সত্য বা উচিত কথা, তা-ই আরেক পক্ষের কাছে অসত্য-অনুচিত। পেশাদার সাংবাদিকদের জন্য এই পরিস্থিতি একটা আপদের মতো। কখনো কখনো আপদের ওপর বিপদও নেমে আসছে। অবস্থাদৃষ্টে মৌজে আছে সোশ্যাল মিডিয়া। তাদের দায় নেই। দায়িত্বের ধারে-কাছেও না গিয়ে যা ইচ্ছা তা করে চলেছেন তারা। সত্য-মিথ্যা মিশিয়ে, ছবি ও ভিডিও এডিট করে, জোড়াতালি দিয়ে অনেক কনটেন্ট তৈরি করে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে গায়ে বাতাস লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তারা। কিন্তু মূলধারার গণমাধ্যম ও কর্মীদের কী দশা! তাদের সম্পাদকীয় নীতিমালাসহ পেশাদারিত্ব মানতে হয়। তা মেনে অভ্যস্তও তারা। সেই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় অনেক আইনকানুন, সরকার ও রাজনৈতিক নানাপক্ষের চাপও মোকাবিলা করতে হয় নিয়মিত। নিদারুণ এই বাস্তবতায় তারা জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী সঠিক সময়ে সঠিক সংবাদটি জোগান দিতে পারছেন কি না প্রশ্নটি নতুন নয়। এবার বরং তা আরও বেগবান-তেজময়। আবার এক শ্রেণির সাধারণ মানুষের মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ার গুজবকে বিশ্বাস করা এবং মূলধারার গণমাধ্যমের কাছেও এ ধরনের খবর দেখার আগ্রহ এবার বেশ লক্ষণীয়।

নানা সীমাবদ্ধতা ও বাস্তবতায় গণমাধ্যম চাওয়া মাত্রই নিরপেক্ষ হতে পারে না। সবার সন্তুষ্টির মতো তথ্যের খোরাকও দিতে পারে না। তাকে সব না হলেও অনেক পক্ষকে আমলে রাখতে হয়। তা করতে গিয়ে কোথাও কোনো তথ্যবিভ্রাট হয়ে যাচ্ছে কি না সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হয়। এর পরও জনমানুষের শতভাগ প্রত্যাশা পূরণ করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। তা উদার গণতান্ত্রিক দেশের সাংবাদিকরাও পারেন না। বিশ্বের কোনো দেশের গণমাধ্যমই তার দেশের জনগণের শতভাগ প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে না। এটি নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট দেশের রাষ্ট্রকাঠামো, গণমাধ্যমের ব্যাপারে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি, স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য সাংবিধানিক সুরক্ষা এবং গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের আইন ও নীতিমালার ওপর। তবে কোনো একটি ইস্যুতে একই সঙ্গে সব গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান একই ধরনের আচরণ করবে এমন নয়। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়েও সব গণমাধ্যমের নিউজ ট্রিটমেন্ট এক ছিল না। কিন্তু এ ধরনের ঘটনায় কোনো দেশেই সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হওয়ার নজির নেই। এমন শাঁখের করাতে পড়তে হয় না ওইসব দেশের সাংবাদিকদের। এরপরও প্রশ্ন থাকতে পারে, বাংলাদেশের সাংবাদিকরা কি আরও পেশাদার হতে পারেন না? পারেন না সবার পক্ষে-বিপক্ষে সমানে তথ্যের দোকান খুলে, দোকান খুলতে? তা পারে না বা করছে না বলে প্রতিপক্ষ ভাবতে হবে সাংবাদিকদের? আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে পেটাতে হবে? টেলিভিশনের গাড়ি জ্বালিয়ে দিতে হবে?

এসব প্রশ্নের জবাব মিলবে না। সাংবাদিকদের প্রতিপক্ষ বানিয়ে দেওয়ার এক আচানক সন্ধিক্ষণে পড়েছে বাংলাদেশ। আন্দোলনকারী, তাদের প্রতিপক্ষ পুলিশ, ক্ষমতাসীন দল সবার কাছে মারধরের জন্য সাংবাদিক শ্রেণি যেন বড় উপাদেয়। নইলে কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়া সহিংসতার খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে কেন চার-পাঁচজন সাংবাদিককে প্রাণ দিতে হয়েছে? আহত হয়ে কাতরাতে হচ্ছে ডজনে-ডজনে? কেন কারা গণমাধ্যমের এত গাড়ি ভাঙচুর বা পোড়ানোর দরকার মনে করলেন? সাংবাদিক বা গণমাধ্যমকর্মীরা নিরীহ প্রজাতি বলেই?

বিভিন্ন সময়ই সাংবাদিকদের এভাবে পেয়ে বসার নমুনা চলে আসছে। করোনা মহামারীর সময়েও ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করে দেশের বিভিন্ন জায়গায় সাংবাদিকরা আক্রমণের শিকার হয়েছেন। তথ্যপ্রযুক্তি আইন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, সাইবার নিরাপত্তা আইন, অফিশিয়াল সিক্রেসি অ্যাক্টে অসংখ্য সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। অনেকে জেল খেটেছেন। এর বাইরে মানহানির মামলা অহরহ। আর পথে-ঘাটে নাজেহাল-গালমন্দ তো বোনাস পাওনা। সাংবাদিক নাজেহালের এ ধামাকায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে কোটা সংস্কারের দাবি থেকে সরকার পতনের আন্দোলন ঘিরে। কয়েকজন নারী সাংবাদিকও রকমের হেনস্তার শিকার হয়েছেন এবার। বাংলাদেশের কোনো সংবাদমাধ্যম আলাদাভাবে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেই। তা জরুরিও নয়। নিরাপত্তার ধারণাও এখানে স্পষ্ট নয়।

সাংবাদিকদের জন্য একদিন দেশে এ রকম অবস্থা হবে, তা কি কেউ ধারণা করেছেন? এখানে নিরাপত্তা বলতে মনে করা হয় হেলমেট ও বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট। তারও মান নির্ণয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই। এ ছাড়া, বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট আদতে কোনো নিরাপত্তাও নয়। কোন পরিস্থিতিতে কত দূর থেকে সংবাদ সংগ্রহ করবেন, কোন অবস্থায় কীভাবে নিজেকে রক্ষা করবেন, রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট এ রকম কিছু বিষয় আছে। আমাদের নিউজরুমগুলো থেকে এখন সেই তালিম বেশি বেশি করে দেওয়া জরুরি হয়ে গেছে। ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের মতো যন্ত্রণা সইবার সক্ষমতা বাড়ানো এখন সাংবাদিকতার পাঠ-পঠনে চলে আসার মতো বিষয় হয়ে গেছে। এ জটিলতার কারণে সাংবাদিকদের ঝুঁকি আরও বেড়েছে। ঠিক সময়ে খবর দিতে না পারায়ও মানুষ একতরফা সাংবাদিকদের দুষছেন। সামনে আরও কী হবে, কে জানে? সাংবাদিকদের স্বার্থরক্ষায় সক্রিয় কোনো প্ল্যাটফর্ম না থাকায় এই পেশা দিনকে দিন আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে, তা বুঝতে বিশেষজ্ঞ বা বিশারদ হওয়া লাগে না। যাবতীয় আলামতই তা বলে দিচ্ছে।

মানুষের বা জাতির নানা কষ্ট, তপ্তমাঠে জীবনবাজি রেখে সংবাদ সংগ্রহে নিয়োজিত থাকার প্রতিযোগিতা থাকলেও নিজের অধিকার বা সুরক্ষার বিষয়ে সাংবাদিকরা বরাবরই পিছিয়ে। এ ছাড়া, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা-সংক্রান্ত আইনগুলোয় সাংবাদিকদের সুরক্ষার কথা সেভাবে বলা নেই। তার ওপর সাংবাদিক নির্যাতনের মামলাগুলো দিনের পর দিন ঝুলিয়ে থাকা যেন কোনো বিষয়ই না। একের পর এক তারিখ পড়তে থাকে। তাদের কোনো সাপোর্ট সিস্টেম নেই, যারা তাদের এসব সমস্যা নিয়ে কথা বলবে। এই বাস্তবতায় অনেক সময় দেখা যায়, সাংবাদিকরা নির্যাতন, হয়রানি বা হুমকি-ধমকির শিকার হলেও বিষয়গুলো নিয়ে আইনি লড়াই করতে চান না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তারা স্থানীয়ভাবে বিষয়গুলো মীমাংসার নামে একটা জোড়াতালি দিয়ে সমাধান মেনে নেন।

এটা যেন নিয়তির মতো সাংবাদিকদের জন্য। একদিকে নানাজনে নির্লজ্জ আপস করবে, জীবিকা বাড়ানোর মোহে বা ভয়ে হেঁট মস্তকে পদলেহন করবে; আর এই মাটি-বায়ুতে সৎ-আপসহীন, নির্ভীক সাংবাদিক গজাবে তা ধারণা করাও এখন কঠিন। নির্ভীক সাংবাদিকতা মোটেই বিচ্ছিন্নভাবে চর্চার বিষয় নয়। সমাজ সংগঠনের গাঁটে গাঁটে দুর্নীতি, স্বজনতোষণ, কর্মহীনতা, হিংস্র, দারিদ্র্য এবং তামসিক শোষণের ব্যবস্থা থাকলে বাংলাদেশের জন্য কি বিশেষ কোটায় আসমান থেকে সাংবাদিক নাজিল হবেন? ক্ষমতাসীন আর ক্ষমতাহীন, আন্দোলনকারী আর দমনকারীরা তা ভালোমতো জানেন-বোঝেন। আর জেনে-বুঝেই সাংবাদিকদের থেরাপিতে রাখা তাদের একটা কৌশল তো হতেই পারে। তারা উভয়েই স্মার্ট, নইলে ওভার স্মার্ট। সাংবাদিকদের অনেকে সেখানে নেহাতই শিকার। আপদ বা বিপদে পড়ারই পাত্র। বাস্তবতাকে স্বীকার-অস্বীকার করা যার যার বিষয়।

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট
mostofa71@gmail.com