পৃথিবীর ইতিহাসে গণ-অভ্যুত্থানের অনেক নজির রয়েছে। তবে বাংলাদেশ যেন এক্ষেত্রে অনন্য। লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র
ফরাসি বিপ্লবের মধ্য দিয়ে মানবজাতি জানতে পারল তারা চাইলে ইতিহাস রচনা করতে পারে। পৃথিবীর ইতিহাসের গতিপথ পাল্টে দিতে পারে জনতা। ফরাসি সেই বিপ্লব ছিল সামন্ততন্ত্রের বিরুদ্ধে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে জেগে ওঠে মানুষ। ‘রেনেসাঁ’ বা এনলাইটেনমেন্ট হিসেবে সেই বিপ্লব পরিচিত। তখন থেকে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ইত্যাদি বিষয়ে মানুষ সচেতন হতে থাকে। সেই অভ্যুত্থান ছিল বিশেষত শিক্ষিত শ্রেণির। তবে এর সঙ্গে সমাজের অন্যান্য পেশার মানুষেরও সংযোগ, সমর্থন ও সক্রিয়তা ছিল। এরপর মার্কসবাদী ধারার কয়েকটি বিপ্লব হয় পৃথিবীতে। যার সবচেয়ে বড় নজির তৈরি হয় রাশিয়ায়। সেখানে শ্রমিক শ্রেণি শাসন ক্ষমতায় থাকা ‘রাজাদের’ (জার) উচ্ছেদ করে ক্ষমতা দখল করে। যা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব নামে পরিচিত। এ বিপ্লবের ঢেউ বিশ্বের দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এশিয়া থেকে শুরু করে ইউরোপ, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় সমাজতান্ত্রিক আদর্শ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে একের পর এক ক্ষমতা দখলের ঘটনা ঘটতে থাকে। এ ছাড়া সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ভিয়েতনামের যুদ্ধও বিশ্বের ইতিহাসে বড় জায়গা করে নিয়েছে। এ যুদ্ধের বিরুদ্ধে আবার বিশ্বজুড়ে সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের জোয়ার বয়ে যায়।
তবে কয়েকবারই গণ-অভ্যুত্থানের অনন্য ইতিহাস সৃজন করেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ ভূখণ্ডে অনেক শক্তিধর স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে গণ-অভ্যুত্থান ঘটেছে। ব্রিটিশ উপনিবেশ পেরিয়ে, পাকিস্তানি শাসন এবং এরপর স্বাধীন বাংলাদেশেও কয়েকবার গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়।
কাকে বলে গণ-অভ্যুত্থান
সাধারণভাবে এমন এক পরিস্থিতিকে গণ-অভ্যুত্থান বলা হয় যেখানে ক্ষমতায় থাকা লোকদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য একদল লোক একত্র হয়। তারা ধীরে ধীরে আন্দোলন গড়ে তোলে এবং শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাসীনদের গদিচ্যুত করতে পারে। এ ধরনের আন্দোলনে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেয়। যে কারণে এ অভ্যুত্থানের সঙ্গে গণ শব্দটি যুক্ত আছে। তবে শুরুতে হয়তো সব শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে অংশ নেয় না। কিন্তু এ অভ্যুত্থানে এমন দাবি ওঠে যা সরাসরি রাষ্ট্রের কোনো না কোনো অংশের জনগোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষা করে। তবে সাধারণভাবে তাদের দাবি-দাওয়ার প্রতি ক্ষমতাসীনরা কর্ণপাত করতে চান না। তারা নানা ছলচাতুরী অথবা ভয়ভীতি দেখিয়ে আন্দোলন দমানোর চেষ্টা করেন। এই দমন প্রক্রিয়া যত কঠোর হয়, তত অপরাপর জনগণের সম্পৃক্ততা বাড়তে থাকে।
দমন প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকতে পারে কর্মসূচিতে বাধা, পুলিশি আক্রমণ, মামলা, নির্যাতন, গ্রেপ্তার এমনকি হত্যাও। এই অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করে যদি আন্দোলকারীরা তাদের দাবি-দাওয়ার পক্ষে দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন, তাহলে অপরাপর জনতা তাদের পক্ষে সহমর্মিতা দেখাতে শুরু করেন। দিনে দিনে যত নিপীড়ন বাড়ে, তত জনগণের সক্রিয়তাও বাড়ে এ আন্দোলনে। তবে গণ-অভ্যুত্থানের ধর্ম হলো তা এক বা দুদিনে শেষ হয়ে যায় না। এই ক্ষোভ-বিক্ষোভ চলতে থাকে এবং বাড়তে থাকে। বাড়তে বাড়তে একটা পর্যায়ে গিয়ে জনগণের বিশাল একটি অংশ এতে যুক্ত হয়ে যায়। আন্দোলনের দাবি-দাওয়াও পরিবর্তন হতে থাকে। মিছিলে-স্লোগানেও পরিবর্তন আসতে থাকে। তা মূল দাবি রেখে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে জাগরণের আহ্বান জানাতে থাকে। নানা দিক থেকে আসা মিছিল-স্লোগান এক সময়ে সরকার পরিবর্তনের এক দফায় মিলিত হয়।
গণআন্দোলনের আরেকটি দিক হলো, নৈতিকতা, আদর্শ ও সহমর্মিতা। যখন শুরুর আন্দোলনকারীরা নির্যাতিত বা হত্যার শিকার হন, তখন তাদের প্রতি জনগণের সহানুভূতি বাড়তে থাকে। যা আন্দোলনকে নতুন বেগ দেয়।
বাংলাদেশে তাত্ত্বিক, রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবী বদরুদ্দীন উমর এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, এ অঞ্চলে মোট পাঁচটি অভ্যুত্থান হয়েছে। শুরুর অভ্যুত্থানটি ছিল ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন। অবিভক্ত ভারতীয় উপমহাদেশে একমাত্র বাংলাদেশেই গণ-অভ্যুত্থানের মতো ঘটনা ঘটেছে। এ অঞ্চলে ১৯৫২ সালে আমরা প্রথম গণ-অভ্যুত্থান দেখেছিলাম। দ্বিতীয় গণ-অভ্যুত্থান দেখেছিলাম ১৯৬৯ সালে।
তৃতীয়টি ছিল ১৯৭১ সালের জানুয়ারিতে। নব্বইয়ে এরশাদের বিরুদ্ধে চতুর্থ গণ-অভ্যুত্থান দেখেছিলাম। এই প্রতিটি গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়েই সরকার পরিবর্তন হয়েছে। ১৯৫২ সালের ক্ষেত্রে সরকার পরিবর্তন সরাসরি হয়নি। কিন্তু পাকিস্তানের শুরুর দিকের এ সময়টাতে রাজনৈতিক দলগুলো গঠিত হয়। দেখা যায়, বায়ান্নর আন্দোলনের পরিণতিতেই ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগ সরকার পতন হয়। শুধু যে সরকারের পতন হয়েছিল তা-ই নয়; মুসলিম লীগ পূর্ব বাংলা থেকে উচ্ছেদ হয়েছিল। ১৯৬৯ সালে যে গণ-অভ্যুত্থান হয়েছিল তাতে সামরিক সরকার টিকে থাকলেও আইয়ুব খানের সরকার উচ্ছেদ হয়ে ইয়াহিয়া খানের সরকার ক্ষমতায় এসেছিল। ১৯৭১ সালে জানুয়ারি কিংবা এর আগেই ব্যাপক গণআন্দোলন শুরু হয়েছিল। সেই আন্দোলনের ফলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল যে সরকার তার স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে আর সক্ষম ছিল না। তখন প্রকৃতপক্ষে সেনাবাহিনী সরাসরি রাষ্ট্রশাসন পরিচালনা করতে বাধ্য হয়েছিল। ২৫ মার্চের পর যুদ্ধ আরম্ভ হয়; সেই যুদ্ধের ফলে সরকার নয়, পাকিস্তান রাষ্ট্রই উচ্ছেদ হয়েছিল।
সর্বশেষ শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে গণ-অভ্যুত্থান ঘটায় ছাত্র-জনতা। বদরুদ্দীন উমর আরেকটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ১৯৫২ সালের আন্দোলনও শুরুতে ছাত্র আন্দোলনই ছিল। পরে তা জাতীয় আন্দোলনে পরিণত হয়। কোটা সংস্কার আন্দোলনের জনপ্রিয়তা শুধু চাকরি দাবির জন্য বা কোটা-বৈষম্যের জন্য হয়নি। ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্রলীগের জুলুমের বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকে বৃহত্তর ছাত্রসমাজ যদি এই আন্দোলনে যুক্ত না হতো, তাহলে কোটা সংস্কার আন্দোলন এত বড় আকার ধারণ করত না। এটা এখন দেশ জুড়ে জনগণের মুক্তির আকাক্সক্ষার আন্দোলনে পরিণত হয়েছে।
ছাত্ররা হারে না
বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই গণ-অভ্যুত্থান শুরু হয় ছাত্রদের মাধ্যমে। মো. জারিফ রহমান তার এক গবেষণাপত্রে লিখেছেন, স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে গণ-অভ্যুত্থানের প্রমাণ বাংলাদেশের ইতিহাসে অপরিচিত কোনো বিষয় নয়। পাকিস্তান আমলে ১৯৬৯ সালের শেষের দিকে আইয়ুব খানের শাসনের বিরুদ্ধে স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রাম সংঘটিত হয়। রাজনৈতিক ও ছাত্র নেতারা এগারো দফা কর্মসূচি প্রণয়ন করেন যা সরকারবিরোধী আন্দোলনের সূচনা করে। এরশাদের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন শুরু হয় তার শাসনামলের প্রথম দিকে এবং ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তার শাসনের অবসান ঘটে যা আট বছর টিকে ছিল। এ আন্দোলন ছাত্রদের দ্বারা শুরু হয়। ১৯৯০ সালের ওই গণ-অভ্যুত্থান অসংখ্য ছাত্রনেতার মৃত্যু, গ্রেপ্তার এবং নির্যাতনসহ বিপুল ছাত্রের আত্মত্যাগের পর স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটে। ’৬৯-এর অভ্যুত্থানেও ছাত্ররা রাস্তায় নেমে এলে তা বিস্ফোরক রূপ নেয়।
বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে জানা যায়, ১৯৬৯ সালের ২৪ জানুয়ারি। সেদিন ছিল হরতাল। এই দিনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আইয়ুব খান সরকারবিরোধী আন্দোলন রূপ নেয় তীব্র এক গণ-অভ্যুত্থানে। ১৯৬৬ সালে ঐতিহাসিক ছয় দফা ঘোষণা করেছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। ফলে স্বাধিকার আন্দোলনের গতি তীব্র হয়। পাকিস্তানি শাসকরা একে নস্যাৎ করতে আগরতলা মামলা করে। মামলার প্রধান আসামি শেখ মুজিবসহ অন্যদের মুক্তি ও পাকিস্তানি সামরিক শাসন উৎখাতের দাবিতে ১৯৬৯ সালের ২৪ জানুয়ারি সান্ধ্যআইন ভঙ্গ করে সাধারণ মানুষ মিছিল বের করে। সেই মিছিলে পুলিশের গুলিবর্ষণে প্রাণ হারান কিশোর মতিউর রহমান মল্লিকসহ চারজন। এরপর পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খান ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি আর প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন না। বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠন ও স্বাধীনতা যুদ্ধে ইতিহাসে একে (এই গণআন্দোলনকে) গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সর্বশেষ ছাত্র আন্দোলনও শুরু হয় ছাত্রদের দ্বারা। শেষ পর্যন্ত তারা বিজয় ছিনিয়ে আনে। ছাত্রদের বুকের রক্ত রাজপথে পড়লে তা বিজয়ের ফুল হয়ে ফুটে ওঠে। যার প্রমাণ আবার দেখিয়েছে বাংলাদেশ। তবে বিশ্বের ইতিহাসে সব ছাত্র আন্দোলন যে সফল হয়েছে তা বলা যাবে না। যেমন ১৯৬৯ সালে ফ্রান্সে হওয়া ছাত্র বিপ্লব। সেই আন্দোলন সফল না হলেও এর প্রভাব ছিল অনেক বড়। যা ইউরোপের শাসনব্যবস্থায় অনেক ধরনের পরিবর্তন নিয়ে আসে।
ভিয়েতনামেও ছাত্ররা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধের মূল শক্তি। আরেকটি ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের কথা বলা যায়। সেটি হলো চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লব। এটিও সংগঠিত হয় ছাত্রদের নেতৃত্বে। যদিও তা সফলতার মুখ দেখেনি পুরোপুরি। তবে এর প্রভাব শুধু চীন নয় বিশ্বের ইতিহাসকে নাড়া দিয়েছিল। যার প্রভাবেই ফ্রান্সে বিপ্লব হয়।