শৃঙ্খলা ফেরানো জরুরি

বাংলাদেশ আরও একটি গণঅভ্যুত্থানের সাক্ষী হয়েছে। জনতার ঐক্য আর দৃঢ়তায় দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন শেখ হাসিনা। দুদিন আগেও মনে হতো সব ধরনের জবাবদিহির ঊর্ধ্বে, তার পরিচয় এখন স্বৈরাচার। তিনি দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে তথাকথিত ভোটের মাধ্যমেই ক্ষমতাসীন ছিলেন দীর্ঘদিন। কিন্তু জনগণ প্রমাণ করেছে ঐক্যবদ্ধ শক্তির বিরোধিতা করে অন্য কোনো শক্তি টিকে থাকতে পারে না। জনতার বিজয়ের পর ঢাকাসহ সারা দেশের রাজপথগুলো ভরে গিয়েছিল মানুষে। বিজয় মিছিল আর আনন্দ উল্লাসে হয়েছে মুখরিত। সদ্যঘটা গণহত্যার স্মৃতি নিয়ে এই আনন্দ পরিণত হয় আনন্দ অশ্রুতে।

কিন্তু এর বিপরীতে উৎকণ্ঠা আর শোকের মাতম নেমে আসে। দেশের অনেক স্থানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা হয়। নির্মমভাবে হত্যা করা হয় অনেককে। কারও কারও বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। জনরোষের শিকার হন নিরীহ অনেক মানুষও। এই সুযোগে কেউ কেউ অবাধ লুটপাটে অংশ নেয়। অনেক এলাকায় মূল্যবান সম্পদ লুট করা হয়, মানুষের প্রাণের ওপর শঙ্কা নেমে আসে। কিছু কিছু স্থানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়ন নেমে আসে। রাজনৈতিক এবং সাম্প্রদায়িক আক্রোশ থেকে এসব আক্রমণ চালানো হয়। বাদ যায় না শিশুরাও।

পৃথিবীর প্রায় সমস্ত অভ্যুত্থানের পর এ রকম চিত্র দেখা যায়। পুঞ্জীভূত ক্ষোভের পাশাপাশি সুযোগসন্ধানীদের লুটেরা মনোভাব এই ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও জিঘাংসা চরিতার্থ করার বাসনা জনগণের বিজয়ে কালিমা লেপন করে। আমরা ফরাসি বিপ্লবের পর অবিশ্বাস্য নৃশংসতা দেখতে পাই। এমনকি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পরেও এই আগুনের তাপে দগ্ধ হয়েছিল লাখো শহীদের রক্তে পাওয়া দেশ।

তবে, জনগণ যথারীতি এই তা-ব রুখে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে। যেই জনতা নিজের জীবনবাজি রেখেছে অধিকার ফিরে পেতে, গণতন্ত্রের জন্য সেই তারাই বিজয় উদযাপন বন্ধ রেখে, দীর্ঘদিনের লড়াইয়ের অবসাদ ভুলে রাতভর ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপাসনালয় পাহারা দিয়েছে। নাগরিক সমাজ রাতভর উৎকণ্ঠিত থেকেছে। কেউ কেউ দলবদ্ধভাবে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছেন। এত চেষ্টার পরেও সব ধরনের নৈরাজ্য থামানো যায়নি। জনগণের পক্ষে তা সম্ভবও নয়। এজন্য প্রশাসনের শৃঙ্খলা জরুরি। উচ্চ পর্যায় থেকে সমন্বয় ছাড়া যা সম্ভব নয়। এই মুহূর্তে দেশের ল’ অ্যান্ড অর্ডার পরিস্থিতি ভেঙে পড়েছে। কার্যত কোনো সরকার নেই। হাসিনা পদত্যাগ করে দেশত্যাগের পর দেশের ভেঙে পড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব ন্যস্ত হয় সেনাবাহিনীর উপর। তবে, তা কোনো সমাধান নয়। অতিদ্রুত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন জরুরি, সেনাপ্রধানও সে কথা বলেছেন। ইতিমধ্যেই রাষ্ট্রপতি সংসদ ভেঙে দিয়েছেন। ফলে, রাষ্ট্রের পরিচালনা ও শৃঙ্খলার জন্য আশু কাজ হচ্ছে সরকার গঠন।

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সমন্বয়কারীরা গোটা দেশের আস্থা অর্জন করেছেন। আশা করি দেশের রাজনৈতিক দলগুলোও নিজেদের আস্থার জায়গা সমুন্নত রাখবে। তাদের দিকে জনতা আশা নিয়ে তাকিয়ে আছে। কিন্তু, এখন সময় নষ্ট করার কোনো সুযোগ নেই। একেকটি মুহূর্ত যাওয়া মানে আরও বেশি জানমালের ক্ষতির সম্ভাবনা। হাসিনার পদত্যাগের ঠিক আগেও দেশে গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। পুলিশের সঙ্গে জনতার সম্পর্ক অত্যন্ত খারাপ দিকে যাচ্ছিল। সোমবারও পুলিশের ওপর হামলা হয়েছে। অনেকের কাছেই বিপুল পরিমাণ বৈধ-অবৈধ অস্ত্র আছে বলে ধারণা করা হয়। একই সঙ্গে কিছু রাজনৈতিক শক্তি ও সুযোগসন্ধানীরা এ সময় ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করবে বলেই প্রতীয়মান হয়।

এই অবস্থায়, অরাজকতা বন্ধ করতে, দেশকে আবারও পুরোপুরি অন্ধকারে নিয়ে যাওয়া ঠেকাতে সরকার গঠন করামাত্রই প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোকে একযোগে কাজ করতে হবে। জনতার আস্থা ফেরাতে উপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে। এত মানুষের রক্তেভেজা আত্মত্যাগের অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে হারতে দেওয়া যাবে না।