৩৬১ থানায় পুলিশ মাঠে কবে

সরকার পতনের চার দিন পরও পুলিশ বাহিনীকে মাঠে নামানো যায়নি। ট্রাফিক পুলিশ না থাকায় যানবাহন নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন শিক্ষার্থীরা। ডাকাত আতঙ্কে রাত হলে মহল্লায় ঢোকার মুখে পাহারা বসাচ্ছে এলাকাবাসী। খুন, সহিংসতার বিচ্ছিন্ন ঘটনাও ঘটছে। এমন পরিস্থিতিতে মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় দেশের ৩৬১ থানায় কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তবে এখনো মাঠপর্যায়ে পুলিশের কার্যক্রম শুরু হয়নি।

পুলিশ বাহিনীর মাঠে ফেরা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির বিষয়ে অনিশ্চয়তার কারণে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।

নবগঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায় আইনশৃঙ্খলা ফেরানোর বিষয়টি রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো জোর দিচ্ছে এ বিষয়ে।

কোটা আন্দোলন ঘিরে ব্যাপক সহিংসতা, হামলার ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে পাঁচ শতাধিক মানুষ। বলপ্রয়োগের কারণে প্রাণহানির ঘটনায় জনরোষে পড়েছে পুরো পুলিশ বাহিনী। উত্তেজিত জনতার হামলায় অন্তত ৭৫ জন পুলিশ নিহত হয়েছে। এ কারণে নিজেদের জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে এবং পুলিশ বাহিনীকে ঢেলে সাজানোর দাবি তুলে প্রায় পাঁচ দিন হলো কর্মবিরতিতে আছেন দেশের অধিকাংশ পুলিশ সদস্য। যদিও গতকাল পর্যন্ত রাজধানীসহ সারা দেশে ৩৬১ থানার কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়েছে সাময়িকভাবে। কিন্তু দেশের অধিকাংশ পুলিশ সদস্য কাজে ফেরেননি। দফায় দফায় নবনিযুক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক আন্দোলনরতদের সঙ্গে কথা বলে এ সমস্যার সমাধান করতে পারছেন না। ফলে ভেঙে পড়ছে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। প্রতি রাতেই ডাকাত ও লুটপাট আতঙ্কে ভুগছে সাধারণ মানুষ।

ধানম-ির ৮/এ সড়কে বাস করেন বেসরকারি চাকরিজীবী মেহেদী হাসান রনি। গত বৃহস্পতিবার রাতে বাসায় ফেরার সময়কার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, রাতের বেলায় মহল্লার গলিগুলোতে লাঠিসোঁটা হাতে নিয়ে পাহারায় থাকতে দেখেন। তারা জানান, মসজিদে ঘোষণা দিয়ে বলা হয়, এলাকায় ডাকাত পড়েছে। এজন্য তারা পাহারা দিচ্ছেন। প্রত্যেকটি প্রবেশমুখে পায়ে হাঁটা মানুষ ও যানবাহন তল্লাশি করে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে।

গত কয়েক দিনে ঢাকার মোহাম্মদপুর, বসিলা, উত্তরাসহ কয়েকটি এলাকায় ডাকাতি ও অস্ত্র হাতে দখলবাজির ঘটনা ঘটে।

গতকালও মৌলভীবাজারসহ দুয়েকটি স্থানে সহিংসতা হয়েছে। গুলি করে হত্যা করা হয়েছে একটি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এক আওয়ামী লীগ নেতাকে। হামলা হয়েছে একজন শিক্ষকের ওপর।

পুলিশ সদর দপ্তর জানায়, গতকাল সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত সারা দেশে ৩৬১টি থানার কার্যক্রম শুরু করেছে। এর মধ্যে পুলিশের মহানগর এলাকায় ১১০টির মধ্যে ৭০টি থানা, রেঞ্জের ৫২৯টি থানার মধ্যে ২৫১টি থানার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ঢাকা মহানগর আওতাধীন এলাকার ৫০টি থানার মধ্যে ২৯টির কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তেজগাঁও, কলাবাগান, ধানম-ি, হাজারীবাগ, কোতোয়ালি থানা ঘুরে কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। দেখা গেছে, তেজগাঁও থানার পুলিশ সদস্যরাও কাজে যোগ দিয়েছেন। দুপুর পর্যন্ত ওই থানায় কয়েকটি জিডি করা হয়েছিল। তবে পুলিশ সদস্য ও সাধারণ মানুষের উপস্থিতি কম ছিল। উপস্থিত বেশিরভাগ পুলিশ সদস্যই সাদা পোশাকে দায়িত্ব পালন করছেন।

এ বিষয়ে তেজগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মহসীন বলেন, ‘কিছুদিন আগেও আমরা সবাই একসঙ্গে কাজ করেছি। আজ আমাদের অনেক পুলিশ সদস্য কাছে নেই। অনেকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আমাদের কিছু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার জন্য আমরা অনেক ভুল করেছি। মানুষের সঙ্গে আমাদের ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। আসলে আমরা জনগণের সেবক। জনগণই আমাদের মূল। আপনারা থানায় আসুন। আপনাদের সেবা দেওয়ার জন্য আমরা প্রস্তুত রয়েছি।’

এ ছাড়া রমনা, চকবাজার, সূত্রাপুর, ডেমরা, গেন্ডারিয়া, মতিঝিল, সবুজবাগ, শাহজাহানপুর, শেরেবাংলা নগর, হাতিরঝিল, শাহ আলী, কাফরুল, ভাসানটেক, দারুসসালাম, রূপনগর, ক্যান্টনমেন্ট, বনানী, উত্তরা পশ্চিম, উত্তরখান ও বিমানবন্দর, শাহবাগ, নিউ মার্কেট, গুলশান, বাড্ডা থানার কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

তবে কর্মবিরতি দেওয়া পুলিশ সদস্যদের অধিকাংশই কাজে ফেরেননি। কাজে ফেরানোর জন্য রাজারবাগ পুলিশ লাইনস মিলনায়তনে আন্দোলনরত পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। সেখানে বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা ছিল। তবে তিনি উপস্থিত ছিলেন না। অবশ্য পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. ময়নুল ইসলামসহ র‌্যাবের মহাপরিচালক এ কে এম শহিদুর রহমান ও ডিএমপি কমিশনার মাইনুল হাসান উপস্থিত ছিলেন। মতবিনিময় সভায় আইজিপি আন্দোলনরত পুলিশের দাবিদাওয়ার বিষয়ে কথা বলেন। তাদের দাবিদাওয়ার বিষয়ে আন্দোলনরত পুলিশ সদস্যদের প্রতিনিধি নিয়ে আগামীকাল (রবিবার) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সভার আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে আন্দোলনরত পুলিশ সদস্যরা এ প্রস্তাব মানেননি।

পুলিশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে রাজারবাগ পুলিশ লাইনস মিলনায়তনে দীর্ঘ বক্তব্য রাখেন আইজিপি ময়নুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমরা আহত পুলিশ সদস্যদের আধুনিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করব। তাদের জন্য প্রয়োজনে বিদেশ থেকে পরামর্শক আনা হবে। এ ছাড়া নিহত পুলিশ সদস্যদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণের জন্য মোটা অঙ্কের টাকা দেওয়া হবে। আপনারা যে ১১ দফা দিয়েছেন, সেগুলো নিয়ে আমরা রবিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বসব আপনাদের প্রতিনিধিদল নিয়ে। এ ছাড়া কোনো জুনিয়র পুলিশ সদস্য সিনিয়র পুলিশ সদস্যের কাছে হয়রানি হবেন না থানা পর্যায়ে।’

বিকেল ৪টায় এ মতবিনিময় শুরুর আগে আইজিপি রাজারবাগ পুলিশ লাইনস হাসপাতালে গিয়েছিলেন আহত পুলিশ সদস্যদের দেখতে। বক্তব্যে সেটাও উল্লেখ করেন। এ সময় উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা পুলিশ বাহিনীর সংস্কার চেয়ে স্লোগান দেন। হারুন, বিপ্লবসহ উচ্চাভিলাষী পুলিশ সদস্যসহ বিতর্কিত সদস্যদের বিচারের দাবি তোলেন।

তবে দাবিদাওয়া নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সভার বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেন উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা। তারা বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টাকে রাজারবাগে আনতে হবে। আলোচনা হবে এখানেই।

এ বিষয়ে ‘বাংলাদেশ পুলিশ বৈষম্যবিরোধী কেন্দ্রীয় কমিটির’ অন্যতম সমন্বয়ক কনস্টেবল শোয়াইবুর রহমান বলেন, ‘আমরা রবিবারের মিটিংয়ের বিষয়ে এখন পর্যন্ত (রাত ৮টা ৪৫) কোনো সিদ্ধান্ত নিইনি। আমাদের জীবনের নিরাপত্তা না পাওয়া পর্যন্ত কাজে ফিরব না। প্রয়োজনে পুলিশের নাম, পোশাক সব সংস্কার করতে হবে। আইজিপিকে জনগণের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। এ ছাড়া পুরো পুলিশ বাহিনীকে সংস্কার করে নতুন বাহিনী করতে হবে। এ বাহিনীর ঘোষণা দেবেন ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা। এ ক্ষেত্রে আমরা আইজিপি স্যারের কথাও শুনব না।’