যেকোনো রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বা ক্ষমতার পালাবদলে, সাময়িকভাবে দেশ জুড়ে এক ধরনের অস্থিরতা দেখা দেয়। কিন্তু সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জরুরি কোনো সেবা বন্ধ থাকে না। এর কারণ হচ্ছে, মানুষের নৈমিত্তিক চাহিদা যেন পূরণ হয়। দেশের মানুষের কল্যাণ চিন্তা করেই, সরকারি বা বেসরকারিভাবে কিছু কিছু সেবাকে সমস্ত রাজনৈতিক প্রতিকূল পরিস্থিতিতে চলমান রাখা হয়। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দলীয় পরিচয় ব্যবহার করা সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গা-ঢাকা দিয়েছেন। একইভাবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্তাব্যক্তিরাও পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিএনপিপন্থি চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন। সরকারের বিদায়ের ফলে এখন ড্যাবের চিকিৎসকরা এসব পদ দখলে নিতে মরিয়া হয়ে উঠছেন এবং তাদের হামলা ও অপমানের ভয়ে কর্মস্থলে যাচ্ছেন না স্বাচিপ নেতারা।
কেবল রাজধানী ঢাকা নয়, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিদিন রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। নতুন সরকার দায়িত্ব নিলেও এই হাসপাতালের আওয়ামী লীগপন্থিরা এখনো হাসপাতালে আসতে ভয় পাচ্ছেন। সরকার পরিবর্তনের পর থেকে চিকিৎসা সংশ্লিষ্টদের উপস্থিতি অনেক কম। নতুন সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন নূর জাহান বেগম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিষয়টি আমার জানা ছিল না। আমি দ্রুত সব বিষয়ে খোঁজ নেওয়া শুরু করব। ইতিমধ্যে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করার। হাসপাতাল কিংবা স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা করার সুযোগ নেই। কোথাও যদি রোগীরা সেবাবঞ্চিত হন কিংবা চিকিৎসার পরিবেশে বিঘ্ন ঘটে আমরা ব্যবস্থা নেব।
নিরাপত্তার স্বার্থে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এটিএম বুথ বন্ধ রেখেছে ব্যাংকগুলো। ফলে নগদ টাকার সংকটে পড়েছেন অনেক গ্রাহক। গতকালের মধ্যেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলে ব্যাংক কর্মকর্তারা আশা করলেও রাজধানীর অধিকাংশ এটিএম বুথ বন্ধ ছিল। যেগুলো খোলা ছিল সেগুলোর বেশিরভাগে টাকা ছিল না। ফলে একাধিক বুথে গ্রাহকদের দৌড়াদৌড়ি করতে দেখা গেছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার ঘাটতি ও ডাকাতির ভয়ে, কমবেশি সব টাকা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানই এ সমস্যায় পড়েছে। গতকাল ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় দখল করার উদ্দেশ্যে গুলিবর্ষণ করেছে সন্ত্রাসীরা। এলোপাতাড়ি গুলিতে আহত হয়েছেন ব্যাংকের ৬ কর্মকর্তা।
এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকা এসআইবিএল (সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি)-এর নিয়ন্ত্রণ নেন আগের উদ্যোক্তা পরিচালকরা। এ ছাড়া একই গ্রুপের অধীনে কয়েক মাস আগে নিয়ন্ত্রণে যাওয়া ন্যাশনাল ব্যাংকে আবার মালিকানা বদলের তোড়জোড় চলছে। বর্তমানে ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান এবং পরিচালকরা পালিয়ে রয়েছেন। সব মিলিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বেশিরভাগ ব্যাংকঋণ অনুমোদন ও বিতরণ বন্ধ রাখা হয়েছে। ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, আইএফআইসিসহ অর্ধ ডজন ব্যাংকে অস্থিরতা থাকার ফলে স্বাভাবিকভাবেই লেনদেনে বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে হবে। এ কারণেই যেকোনো সেবার ক্ষেত্রে বাড়তি নিরাপত্তা দেওয়া দরকার। যেকোনো পরিস্থিতিতে জরুরি সেবা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। কোনো রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে আন্দোলন বা ক্ষোভের সুযোগে ভিন্ন কোনো পক্ষ যেন ফায়দা নিতে না পারে, সেই বিষয়টি অন্তর্বর্তী সরকারকেই নিশ্চিত করতে হবে। যেকোনো সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে, সর্বাগ্রে বিবেচনায় যেন থাকেন সাধারণ মানুষ। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, এই বিষয়গুলো অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করবেন। প্রত্যাশা থাকবে, রাজনৈতিক উত্থান-পতনে জনগণ সম্পর্কিত কোনো ধরনের সেবাই বিঘিœত হবে না। দেশের মানুষের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হয়ে উঠুক।