বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কর্মীদের দুটি দাবি মেনে নিয়ে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ নিরসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আপাতত বিমান কর্মীদের কভিডকালীন কর্তিত বেতন ফেরত প্রদান ও ক্যাজুয়াল শ্রমিকদের চাকরি স্থায়ীকরণের বিষয়ে সম্মত হয়েছে বিমান।
আজ সোমবার (১২ আগস্ট) দিনভর বলাকা ভবনে বিমানের ব্যবস্থাপক ও পরিচালকের বৈঠক শেষে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাছাড়া আমলাদের সরিয়ে যোগ্য কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দিতে বিক্ষোভও করা হয়েছে।
বিমানের ব্যবস্থাপক ও সিইও জাহিদুল ইসলাম ভুঞা জানান, দাবিগুলো যৌক্তিক ও ন্যায্য। অনেক আগে থেকেই এগুলো বিবেচনাধীন ছিল। তবে আপাতত কর্তিত বেতন ফেরত প্রদান ও ক্যাজুয়ালদের স্থায়ী করার মতো বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। এখন রেজুলেশান করে অফিস আদেশ জারি করার কাজ চলছে।
সংশ্লিষ্টরা জানায়, বিমানের পাইলটদের সংগঠন (বাপা), কেবিন ক্রু অ্যাসোসিয়েশনসহ অন্যান্য সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের দাবি-দাওয়া তুলে ধরেন। তারপরই বিমানের বোর্ড রুমে সব পরিচালকদের নিয়ে বৈঠকে বসেন তিনি। এসব দাবির বিষয়ে কর্তৃপক্ষ নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে।
জানা গেছে, কোটা বিরোধী আন্দোলনের সময় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ঢেউ পড়ে বিমানেও। গত ৫ আগস্ট ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর থেকে বিমান কর্মীরা এসব দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিক্ষোভ সমাবেশ শুরু করেন। তারা মন্ত্রণালয় থেকে প্রেষণে আসা আমলাদের প্রত্যাহার, আইন বিভাগের ডিজিএম রাশেদ মেহের চৌধুরীকে বরখাস্ত, কভিড মহামারির সময় বিমানের স্টাফদের কর্তিত বেতন ফিরিয়ে দেওয়া, বিমানের ৩ হাজার অস্থায়ী কর্মচারীদের চাকরি স্থায়ী করা, ৬ হাজার জনবলের পেনশনের আওতাভুক্ত করার জোর দাবি জানান। বিমানকমীর্দের প্রতিবাদ সমাবেশের কারণে কয়েকদিন অফিস হাজির হওয়া থেকে বিরত থাকেন ঊধ্র্বতন কর্মকর্তারা। আজ বৃষ্টিতে ভিজে বিমানের শত শত কর্মকর্তা-কর্মচারী বলাকা ভবনের সামনে মেইন রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ সমাবেশ করেন। এ সময় তারা সড়কে ট্রাফিকের দায়িত্ব পালনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ এবং তাদের মাঝে ছাতা ও মাস্ক বিতরণ করেন। শিক্ষার্থীরাও বিমানের এসব দাবিকে যৌক্তিক ও ন্যায্য বলে স্বীকার করেন।
বিমান সূত্র জানিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে এয়ারলাইন্সটিতে বেতন ভাতাদি, পদোন্নতি,বদলি,পদায়ন ও বিদেশ ভ্রমণ নিয়ে নানা ধরণের বৈষম্য, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি চলে আসছে। সর্বোপরি বিমানের দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের কোনঠাসা করে মন্ত্রণালয় থেকে অপেশাদার অনভিজ্ঞ কর্মকর্তা দিয়ে চালানো হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটিকে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও প্রতিবন্ধকীতা মুখে পড়েছে। এতদিন মুখ খোলার কোনো সুযোগ ছিল না। এখন দেশের বড় ধরণের পরিবর্তন আসার সুযোগে এসব দাবি নিয়ে মাঠে নামতে হচ্ছে। বিমানকর্মীরা আশাবাদী বর্তমান সরকারের সময় তারা ন্যায় বিচার পাবেন।
এ অবস্থায় সোমবার সকালে বলাকা ভবনে বিমানের বিভিন্ন ইউনিটের প্রতিনিধিরা ব্যবস্থাপনা পরিচালকে সঙ্গে দেখা করে তারা এসব দাবি সম্বলিত স্মারকলিপি প্রদান করে। তারপই জরুরি বৈঠকে বসেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক। এর আগে গত সপ্তাহে বিক্ষুব্ধ বিমানকর্মীরা বিমানের জিএম (অ্যাডমিন) রওশান ও লিগ্যাল বিভাগের রাশেদ মেহের চৌধুরীর রুমে তালা ঝুলিয়ে দেন। তারা বিমানের চিফ ফাইন্যানশিয়াল অফিসার (সিএফও) মো. নওশাদ হোসেন ও লিগ্যাল অ্যাফেয়ার্স বিভাগের ডিজিএম মো. রাশেদ মেহের চৌধুরীকে অবরুদ্ধ করেন। রোষের মুখে একপর্যায়ে তারা পালিয়ে অফিস ছাড়তে বাধ্য হন।
তাদের অভিযোগ, বিমানের সিএফও দীর্ঘদিন ধরে বিমানে অনিয়ম-দুর্নীতি করে যাচ্ছেন। সবচেয়ে বড় অভিযোগ আনা হয়েছে— বিমানের লিগ্যাল অ্যাফেয়ার্স বিভাগের ডিজিএম মো. রাশেদ মেহের চৌধুরীর বিরুদ্ধে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিমানের শ্রমিকদের হয়রানি করে যাচ্ছেন। তার মধ্যে ফাইল ঠেকিয়ে ঘুষ আদায়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পলাতক মেয়র ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপসের ছত্রছায়ায় বিমানে নানা ধরণের দুর্নীতি ও হয়রানি করায় সবাই অতিষ্ঠ। সর্বোপরি তিনি বিমানের বিভিন্ন মামলা ঝুলিয়ে লাখ লাখ টাকা আত্মসাত করেন। যেই বিষয়গুলো বিমানেই নিষ্পত্তিযোগ্য, সেগুলোকে আদালতে ঠেলে দিয়ে কমিশন বাণিজ্য করে চলছেন। বার বার তার বিরেুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হবার পরও কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি।