সম্প্রতি আন্দোলন ঘিরে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে শিক্ষার্থী ও নিরপরাধ লোকজনের মৃত্যু এবং পাল্টা হামলার শিকার হওয়া এক নজিরবিহীন ঘটনা। অভিযোগ ওঠে, পুলিশ রাজনৈতিক নেতাদের মতো কথা বলেছে। এসব ঘটনায় একদিকে পুলিশের মনোবলে প্রভাব পড়ে, অন্যদিকে বাহিনীতে অস্থিরতা তৈরি হয়। এ অবস্থায় ‘পুলিশ জনগণের বন্ধু’ হিসেবে পুলিশের ভাবমূর্তি ফেরাতে বাহিনীতে সংস্কার আসছে।
পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, আগামী ছয় মাসের মধ্যে পুলিশে আমূল পরিবর্তন আসছে। রাজনীতির বেড়াজাল থেকে বাহিনীটিকে বের করে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের মধ্যে বিশদ আলোচনা হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরও কাজ শুরু করে দিয়েছে। কোন কোন আইন সংশোধন করা যায় তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা চলছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে পুলিশের পোশাক ও মনোগ্রাম পরিবর্তন করা হবে। এখন মনোগ্রামে ‘নৌকা প্রতীক’ রয়েছে। চলতি মাসের মধ্যেই বড় ধরনের রদবদল করা হবে। ইতিমধ্যে বদলির তালিকা প্রায় গুছিয়ে আনা হয়েছে।
পুলিশও দাবি করে আসছে, তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে চায়। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে পরিত্রাণ চায়। সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাও বলেছেন, পুলিশকে জনবান্ধব করতে যা যা করা দরকার তাই করা হবে। পুলিশের কোনো সদস্য রাজনৈতিক বলয়ে থেকে কোনো কিছু করতে পারবেন না।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রম নিয়ে সমালোচনা রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলও একাধিকবার উদ্বেগ জানিয়েছে। তবে সর্বশেষ কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের নির্বিচারে গুলির ঘটনা জনরোষ তৈরি করে। এর ধারাবাহিকতায় গণঅভ্যুত্থানে পতন ঘটে আওয়ামী লীগ সরকারের। দেশের বেশ কয়েকটি থানায় ভাঙচুর ও আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। হামলায় নিহত হন অন্তত ৪২ পুলিশ সদস্য।
এর আগে ২০০৭ সালে পুলিশের সংস্কারের জন্য ‘বাংলাদেশ পুলিশ অধ্যাদেশ ২০০৭’ প্রস্তাব করে পুলিশ সদর দপ্তর। তৎকালীন আইজিপি নুর মোহাম্মদ পুলিশের স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন নিশ্চিত করতে নানাভাবে চেষ্টা করেছেন। পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যরাও চাচ্ছিলেন রাজনৈতিক বাহু থেকে মুক্ত হতে। প্রস্তাবিত পুলিশ অধ্যাদেশে এমন কিছু বিধানের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা কার্যকর হলে পুলিশে বিদ্যমান নানা সমস্যা অনেকাংশ কমে আসবে। পুলিশ সদস্যদের ওপর রাজনৈতিক খবরদারি করার সুযোগ থাকবে না। পুলিশের জবাবদিহিতার ব্যবস্থা থাকবে, জাতীয় পুলিশ কমিশন, অভিযোগ কমিশন, নীতিনির্ধারণী গ্রুপ গঠন ইত্যাদি বিধান কার্যকর করার মধ্য দিয়ে পুলিশের ব্যাপক সংস্কার হবে। এখন আবার এ নিয়ে আলোচনা চলছে। প্রস্তাবিত অধ্যাদেশে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে থেকেই পুলিশ বিভাগের জন্য পৃথক পুলিশ বিভাগ রাখার প্রস্তাব করা হয়। বিভাগের প্রধানের পদবি হবে ‘চিফ অব পুলিশ’। চিফ অব পুলিশের অধীনে থাকবেন ইন্সপেক্টর জেনারেল, অ্যাডিশনাল ইন্সপেক্টর জেনারেল, ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল থেকে শুরু করে পুলিশের অন্য পদবির কর্মকর্তারা। পুলিশ বিভাগের ইন্সপেক্টর জেনারেলদের মধ্য থেকে একজনকে সরকার চিফ অব পুলিশ হিসেবে নিয়োগ দেবে। সরকারি জনগুরুত্বপূর্ণ জরুরি কোনো কাজে যেকোনো ব্যক্তিকে বিশেষ পুলিশ নিয়োগ করার বিধান আছে প্রস্তাবিত ওই অধ্যাদেশে। পুলিশ কমিশনার, জেলা পুলিশ সুপার অথবা চিফ অব পুলিশ থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত যেকোনো কর্মকর্তা সরকারের অনুমতি নিয়ে বিশেষ পুলিশ নিয়োগ করতে পারবেন। সেসব ব্যক্তি বেতনভাতা পাবেন। প্রস্তাবটি ওয়ান ইলেভেনের সময় প্রধান উপদেষ্টার কাছে পাঠানো হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে গঠন করা হয় পর্যালোচনা কমিটি। কমিটি অধ্যাদেশের ২৩টি ধারাসহ কয়েকটি উপধারার ব্যাপারে আপত্তি জানায়। তার মধ্যে ছিল আইজিপি নিয়োগ প্রক্রিয়া, এএসপি নিয়োগ, সরকার কর্তৃক পুলিশ কর্মকর্তাকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা না থাকা, পুলিশ প্রশাসনের ক্ষমতা, ইউনিট প্রধানের ক্ষমতা, পুলিশের আইন উপদেষ্টা, অর্থ উপদেষ্টা ও বিশেষজ্ঞ নিয়োগ, জেলা পুলিশ সুপারের ক্ষমতা, জাতীয় পুলিশ কমিশন গঠন, পুলিশ সদস্যদের পদোন্নতি, পুলিশ প্রধানের ক্ষমতার বিধান রাখা নিয়ে আপত্তি তোলে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার চলে যায়। আওয়ামী লীগ আমলেও প্রস্তাবিত অধ্যাদেশটি চাপা পড়ে যায়।
নাম প্রকাশ না করে পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা রাজনৈতিক বলয় থেকে বের হতে নানাভাবে চেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হই। সব রাজনৈতিক দল আমাদের ব্যবহার করে ফায়দা নেয়। এবার সময় এসেছে একটু হলেও ঘুরে দাঁড়ানো। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার চেষ্টা করছে পুলিশ বাহিনী সংস্কার করতে। সংস্কার করা জরুরি। আইজিপি থেকে শুরু করে কনস্টেবল পর্যন্ত সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। রাজনৈতিক সরকার পুলিশের কোনো কাজে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। পুলিশ দায়িত্ব পালন করবে স্বাধীনভাবে। আমাদের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাও পুলিশের সংস্কার নিয়ে বেশ আন্তরিক।’
তিনি আরও বলেন, পুলিশের পোশাক ও মনোগ্রাম পরিবর্তন হবে। দ্রুত সময়ের মধ্যে তা করার চেষ্টা চলছে। ২০০৭ সালে প্রস্তাবিত অধ্যাদেশ নিয়েও আলোচনা চলছে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে সংস্কারের উল্লেখযোগ্য কাজ হবে বলে তিনি আশা করেন।
পুলিশের রাজনীতিকীকরণের জন্যই আজকের এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী বলে মন্তব্য করেন এ পুলিশ কর্মকর্তা। তিনি বলেন, সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯ এর বিধি-২৫ (১) এ বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারী কোনো রাজনৈতিক দলের বা তাদের অঙ্গসংগঠনের সদস্য হতে পারবেন না। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে কোনোভাবে যুক্ত হতে বা কোনো প্রকারে অংশগ্রহণ বা সহযোগিতা করতে পারবেন না। বিধি ২৫ (৩) এ বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারী আইন পরিষদ নির্বাচনে কোনো প্রকার প্রচারণা অথবা অন্য কোনোভাবে হস্তক্ষেপ বা প্রভাব প্রয়োগ অথবা অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। অথচ বাহিনীতে এসবের বালাইয়ে নেই। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘গত দেড় দশকে পুলিশে নতুন পদ সৃষ্টি হয়েছে ৮৩ হাজার। আর নিয়োগ হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজারের মতো। পুলিশের এই নিয়োগের বড় অংশই ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। সদ্য ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকের শাসনামলে তাদের ব্যবহার করা হয়েছে মূলত ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার হাতিয়ার হিসেবে।’
অন্তর্র্বর্তী সরকারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, ‘পুলিশ যা করেছে, তা নিঃসন্দেহে অমার্জনীয়। সেটার জন্য যারা সবচেয়ে দায়ী, তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই পদক্ষেপ নেওয়া হবে। পুলিশকে কীভাবে রাজনীতিমুক্তভাবে পরিচালিত করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হবে। দ্রুত সময়ে সংস্কার করা হবে। পুলিশকে এমনভাবে সংস্কার করতে হবে যেন তাদের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে কেউ ব্যবহার করতে না পারে।’
বাংলাশে পুলিশ বৈষম্যবিরোধী কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যতম সমন্বয়ক কনস্টেবল শোয়াইবুর রহমান বলেন, ‘পুলিশের যে কলঙ্ক হয়েছে সেটা মোছার জন্য প্রয়োজনে পুলিশের নাম, পোশাক সব পরিবর্তন করতে হবে। এতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই।’
আন্দোলনে থাকা পুলিশ সদস্যদের প্রথম দাবিই ছিল দায়িত্ব পালনকালীন তাদের জীবনের নিরাপত্তা। এরপরই তীব্রভাবে তারা চেয়েছেন, সরকার ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত কর্মপরিবেশ। এজন্য তারা পুরো পুলিশ বাহিনী পুনর্গঠন করার দাবি তুলেছিলেন। তাদের এমন দাবির পরিপ্রেক্ষিতে গত শুক্রবার রাজারবাগে পুলিশ মহাপরিদর্শক মো. ময়নুল ইসলাম বলেন, ‘বাহিনীটাকে নতুন করে সংস্কার করার জন্য যতটুকু করণীয় সেগুলোর প্রতিটাই আমরা নেব। আমাদের পিআরপির একটা প্রজেক্ট যেটা আটকে ছিল, যেটায় আমরা যুগান্তকারী আধুনিক পুলিশ গঠনের জন্য উদ্যোগ নিয়েছিলাম। ওই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে পারলে পুলিশ হবে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত। হবে গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকারের পক্ষে অনুকূল। আমাদের লক্ষ্য, এমন একটা পুলিশ বাহিনী গঠন করা, যে পুলিশ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে গ্রহণযোগ্য।’
রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকার বিষয়টি সঠিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলেও বাহিনীর নাম ও পোশাক পরিবর্তনের বিষয়টি অযৌক্তিক মনে করেছেন পুলিশের সাবেক সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কর্মকর্তা ও পুলিশ সংশ্লিষ্ট গবেষকরা। এ বিষয়ে সাবেক আইজিপি মুহাম্মদ নুরুল হুদা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নাম বা পোশাক পরিবর্তনের দাবিগুলোর কোনো যৌক্তিকতা নেই। অন্যগুলোর আছে বা থাকতে পারে। সেগুলোর মধ্যে রিক্রুটমেন্ট, পদোন্নতির ব্যাপারগুলো। রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের যে ব্যাপারটা তুলে ধরেছে সেটা তো ভালো। রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ হওয়া তো উচিত না।’ তিনি বলেন, ‘আইনের কোথাও তো বলা হয়নি আপনি রাজনীতিকদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবেন। আপনি আইন মোতাবেক কাজ করবেন এটা বলা আছে। এটা যদি আপনি না করেন তাহলে ব্যক্তিগত পর্যায়ে আপনার দোষ। আপনাকে যারা নির্দেশনা দেয়, তাদের দোষ। মূল দোষটা হচ্ছে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ।’
গণতান্ত্রিক পুলিশিংয়ের ধারণাটা কী এমন প্রশ্নে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুকের কাছে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গণতান্ত্রিক পুলিশিংয়ের ধারণাটাই বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর মধ্যে নেই এবং তারা এটা বুঝতেও চায় না। বুঝতে যতটুকু চায়, তার চেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে সরকার ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের কারণে তারা সেটা পারে না। এখানে মূলনীতি হচ্ছে নাগরিক ও রাষ্ট্রের প্রতি তার শ্রদ্ধা, মর্যাদা ও অধিকারগুলোকে যথাযথভাবে নির্ণয় করা। আসল কথা হচ্ছে, মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন পুলিশ গঠনের জন্য যেটা দরকারি, সে বিষয়গুলো হলো নাগরিকদের প্রতি শ্রদ্ধা, প্রত্যেক মানুষের জন্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা। নাগরিকের যে অধিকার ও ন্যায্যতা সেগুলো প্রতিষ্ঠা করাই হলো ডেমোক্রেটিক পুলিশ বা গণতান্ত্রিক পুলিশ।