‘যৌক্তিক সময়’

বাংলাদেশ একটি অস্থির ও অনিশ্চিত সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে  স্বৈরাচার পতনের পর দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কার্যত উধাও হয়ে গেছে। সম্প্রতি থানাগুলো সক্রিয় হতে শুরু করেছে, পুলিশ সদস্যরা ফিরছেন। অর্থনীতির চাকাও প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু হলেও স্বাভাবিক হয়নি এখনো। ইতিমধ্যে বিবিএস-এর হিসাবে জুলাই মাসে মূল্যস্ফীতি ১১.৬৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা একটি রেকর্ড। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে অর্থনীতির চাকা সচল করা গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম কাজ। যদিও অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব দ্রুততম সময়ে নির্বাচন আয়োজন করে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। কিন্তু, তড়িঘড়ি করে নির্বাচন দিলেই হবে না।

সবার আগে দরকার আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ও অর্থনীতি সচল করা। এরপর প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দিতে বিচার বিভাগ থেকে শুরু করে নির্বাচন কমিশন, নির্বাচনী আইন ইত্যাদির সংস্কার দরকার। অনেকে সংবিধানের আমূল পরিবর্তনের কথাও উল্লেখ করছেন। আশার কথা, রাজনৈতিক দলগুলোও এ ব্যাপারে ধৈর্যধারণ করবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে জানা গেছে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে পরিবেশ তৈরি করে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য ‘যৌক্তিক সময়’ দিতে চায় রাজনৈতিক দলগুলো। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রাষ্ট্র সংস্কারের দাবিগুলোর প্রতি ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেছেন দলের নেতারা। সোমবার প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে পর্যায়ক্রমে দেশের সাতটি রাজনৈতিক দলের নেতারা বৈঠক করেন। নেতারা এই আন্দোলনে নিহতদের বিচারের জোরালো দাবিও জানান।

বৈঠক শেষে অতিথি ভবনের সামনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে কী কী করা যায়, এ বিষয়ে আমাদের মতামত দিয়েছি। তারা কী কী করেছে, কী কী করতে যাচ্ছে, তা আমাদের সঙ্গে শেয়ার করেছে। আমরা মনে করি, এ সরকারকে সহায়তা করা প্রতিটি দেশপ্রেমিক মানুষের একমাত্র কর্তব্য।’ তিনি জানান যে, বৈঠকে তারা নির্বাচন নিয়ে আলাপ করেননি। তিনি বলেন, ‘আমরা একটা কথা খুব পরিষ্কার করে বলেছি, বর্তমানে দেশে যে অস্থিরতা, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হচ্ছে, সাম্প্রদায়িকতার ধোয়া তোলা হচ্ছে এগুলোতে জনগণ যাতে বিভ্রান্ত না হন। জনগণ ঠিক আগের মতোই সেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে অক্ষুন্ন রেখে, তাদের নিরাপত্তা দিয়ে সরকারকে  যেন সহায়তা করে। আমরাও পুরোপুরিভাবে তাদের সেভাবে সহায়তা করছি।’

অন্যান্য দলের নেতারাও প্রায় একই সুরে আলাপ করেছেন। তবে, সর্বাত্মক সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি এবং নির্বাচন আয়োজনে সময় দিতে চাইলেও এসব দলের নেতারা সতর্ক করে দিয়েছেন যাতে সেই সময়টা কোনোভাবেই অযৌক্তিক না হয়। তা না হলে সরকারের গ্রহণযোগ্যতা হ্রাস পাবে। এ ছাড়াও নির্বাচন ইস্যুতে বিএনপিসহ বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সাবেক সরকারের হাজার হাজার মামলার বিষয়টিও বিবেচনা করা দরকার। এসব বিষয় আইনি পথে সমাধান করে ফিরতে হবে। শুধু রাষ্ট্রপতির আদেশকে সামনে রেখে চিন্তা করলেও আগামী দিনের রাজনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়বে। কেননা, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যারা অংশ নেবেন, তাদের অধিকাংশই আদালতের মাধ্যমে অযোগ্য ঘোষিত হয়ে আছেন। অবিলম্বে নির্বাচন চাইলে সে প্রক্রিয়া ব্যাহত হবে।

এসব কারণে অন্তর্বর্তী সরকার বেশ ভালোরকম সময় পাবেন বলেই মনে হচ্ছে। ফলে সরকারকে ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পনা করে আগাতে হবে। দেশের আইনশৃঙ্খলার যে চরম অবনতি হলো তা ঠিক করতে হবে। জনগণের সঙ্গে প্রশাসন ও বিশেষত পুলিশের আস্থার সম্পর্ক ফিরিয়ে আনতে হবে। এতদিন যেসব প্রতিষ্ঠান ও ব্যবস্থা দলীয়করণে কলুষিত হয়েছে  সেগুলোকে ঠিকঠাক করতে হবে। গণ-অভ্যুত্থান করা মানুষের ত্যাগ ও স্বপ্ন যাতে বৃথা না যায়।  দেশ যাতে টেকসই গণতন্ত্র পায় তা নিশ্চিত করতে হবে।