কাওয়ালি গানের ইতিহাস

গান শুনতে কার না ভালো লাগে? গান শুনে না এমন মানুষ কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। গান রচিত হয় সুর, তাল, লয়ের যুগলবন্দিতে। গান মানুষের মনের কথা বলে। গানের সুরে সুরে ঠোঁট মেলানোতে এক অন্যরকম শান্তি খুঁজে পাওয়া যায়। গান শব্দটিকে কোনো ভাবার্থ দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব না। মানুষের অবসাদ বা চিন্তা নিরসনের জন্য গান এক অন্যতম ওষুধ।

সংস্কৃতির স্বভাবই বয়ে চলা। সে দেশ, কাল, সময়ের সীমা মানে না। সময়ের সঙ্গে সংস্কৃতির উপাদানের রূপ বদলায়। উপমহাদেশে গানের ভিন্ন ভিন্ন ধরন পাওয়া যায় যেমন কাওয়ালি, বাউল, ভাটিয়ালি, গীতিকবিতা, জারি-সারি, দেশাত্মবোধক, বিদ্রোহী ও আধুনিক গান। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যে গান আমাদের মুখে উচ্চারিত হয় তার পূর্বজন্ম হয়েছিল কাওয়ালি গানের মাধ্যমে। আজ জানব সেই কাওয়ালি গানের ইতিহাস।

কাওয়ালি গান মূলত দক্ষিণ এশিয়ায় উদ্ভূত সুফি ইসলামি ভক্তিমূলক গানের একটি রূপ। বিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে এ গানের জনপ্রিয়তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ছড়িয়ে পড়ে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি স্বতন্ত্র ধারায় পরিণত হয়েছে। ‘কাওয়ালি’ শব্দটির উৎপত্তি আরবি ‘কাওল’ বা ‘কাওলুন’ থেকে, যার অর্থ বাক্য। এর বহুবচন হলো ‘কাওয়ালি’, অর্থাৎ কথামালা বা বাক্যমালা। কাওয়ালি গান একদল গায়ক এবং সংগীতশিল্পী দ্বারা পরিবেশিত হয়। একজন প্রধান গায়ক, কোরাস এবং যন্ত্রশিল্পীদের সমন্বয়ে দলগুলো গঠিত হয়। গান পরিবেশনের জন্য ব্যবহার হয় হারমোনিয়াম, তবলা এবং অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র।

কাওয়ালির গানের বিকাশ কয়েক দিনে হয়নি। বহু শতাব্দীর সাধনায় আজ সর্বস্তরে জনপ্রিয় এই গান। যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য কবি ও সংগীতজ্ঞদের নাম। কাওয়ালি গান সর্বপ্রথম রচনা করেন আমির খসরু (১২৫৩-১৩২৫)। তিনি একজন বিশিষ্ট সুফিসাধক এবং পণ্ডিত। তিনিই প্রথম কাওয়ালির ফর্ম সৃষ্টি করেন। তার হাত ধরে কাওয়ালি সংগীতের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের ভিত্তি স্থাপন হয়। সেই সময় থেকে ফার্সি, আরবি এবং ভারতীয় বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহারের ইতিহাস পাওয়া যায়া। কাওয়ালি গানের সুপ্রাচীন ঐতিহ্য অধিক বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার।

বাংলাদেশের কাওয়ালি গানের পরিচিতি

বাংলাদেশের কাওয়ালি গানের ইতিহাস ততটা সমৃদ্ধ না। কালেভদ্রে দুয়েকটা প্রশংসা পেলেও পাকিস্তান এবং ভারতের মতো সমৃদ্ধ না। আমির আলি খান কাওয়ালি গানের জন্য সুপরিচিত। কাজী নজরুল ইসলাম কাওয়ালি গায়ক না হলেও, তার কাজের মধ্যে রয়েছে কাওয়ালি ও ভক্তিমূলক গান। বাংলাদেশের কাওয়ালি গানগুলো সুফি রহস্যবাদ এবং আধ্যাত্মিক ভক্তির ওপর নির্ভর করে রচিত। এই ধরনের কাওয়ালি গানগুলো ধর্মীয় ও বিবাহ বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হয়।

জনপ্রিয় ১০টি কাওয়ালি গান

‘তেরে বিন না লাগদা’, ‘পহেলে তো কাভি’, ‘কোই ইয়ে ক্যাসে’, ‘আল্লাহ হু’, ‘মেরা পিয়া ঘর আয়া’শিল্পী নুসরাত ফতেহ আলি খান। ‘দামা দাম মাস্ত কালান্দর’, ‘ভার দো ঝোলি মেরি’- শিল্পী সাবরি ব্রাদার্স। ‘মাস্ত কালান্দর’, ‘মেরা কোই না’- শিল্পী আবিদা পারভীন। ‘ঝুলে ঝুলে লাল’- রুনা লায়লা। কাওয়ালি গানের ধারাকে ৩ শতাব্দী ধরে লালন করছেন নুসরাত ফতেহ আলি খানের পরিবার। তার পরিবার পূর্বপুরুষ থেকে বর্তমান প্রজন্ম প্রায় সবাই কাওয়ালি গানের ওস্তাদ। কাওয়ালি সংগীতের অন্যতম কালপুরুষ ধরা হয় ওস্তাদ নুসরাত ফতেহ আলি খানকে। তার হাত ধরেই কাওয়ালি গান পৌঁছে গেছে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে।

বিশ্বব্যাপী ১০ জন জনপ্রিয় কাওয়ালি গায়ক

ওস্তাদ নুসরাত ফতেহ আলি খান

আবিদা পারভীন

সাবরি ব্রাদার্স (গোলাম ফরিদ সাবরি ও মকবুল আহমেদ সাবরি)

আজিজ মিয়ান

ফরিদ আয়াজ

রাহাত ফতেহ আলি খান

আমজাদ সাবরি

রুনা লায়লা

চাঁদ নিজামী

ক্বারি ওয়াহেদ মাহমুদ

কাওয়ালি গানের ভবিষ্যৎ

কাওয়ালি সংগীতের ভবিষ্যৎ অনেকটাই অনিশ্চিত। কারণ বর্তমানে গানের রচয়িতারা পুরাতন ফর্ম থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সুর, বাদ্য ঠিক রেখে সংগীতের মূল ধারা নষ্ট করছেন। কাওয়ালি গানের ঐতিহ্য রক্ষা করা যেতে পারে তার আধ্যাত্মিক এবং সাংস্কৃতিক শেকড় বজায় রেখে

সংরক্ষণ এবং শিক্ষা : কাওয়ালি সংগীতের ইতিহাস, ঐতিহ্য ভবিষ্যতের প্রজন্মের কাছে পৌঁছাতে গানগুলো সংরক্ষণ এবং কৌশলগুলো নথিভুক্ত করার পাশাপাশি প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি করতে হবে।

সুর এবং লয় উদ্ভাবন : সমসাময়িক শিল্পীরা নতুন উদ্ভাবনী শব্দ তৈরি করতে জ্যাজ, রক এবং ইলেকট্রনিক বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার করে অন্যান্য সংগীত শৈলীর সঙ্গে কাওয়ালিকে মিশ্রিত করছেন। তাই কাওয়ালি গানের ঐতিহ্যগত উপাদানগুলো রক্ষায় দেশি বাদ্যযন্ত্র ব্যবহারে উৎসাহী এবং সুর, লয় সংরক্ষণ জরুরি।

বিশ্বের সর্বস্তরে পৌঁছানো : স্ট্রিমিং পরিষেবা এবং সোশ্যাল মিডিয়ার উত্থান কাওয়ালি গানকে বিশ্বব্যাপী শ্রোতাদের কাছে পৌঁছাতে সাহায্য করছে। সংগীতের বৃহত্তর প্রসারে উপমহাদেশ ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিকভাবে জনপ্রিয়তা বাড়াতে শিল্পীদের সহযোগিতা

এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের উৎসাহ বাড়াতে হবে।