স্বাস্থ্য ব্যয়ের লাগাম টানা যাচ্ছে না কিছুতেই

দেশের মানুষের গড় আয়ের চেয়ে গড়ব্যয় দ্বিগুণ হয়েছে জুলাই মাসে। ব্যয়ের ক্ষেত্রে খাদ্যপণ্য অন্যতম ভূমিকা রাখলেও, স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় ব্যাপক হারে বেড়েছে। যদিও স্বাস্থ্য খাতে অবকাঠামোর উন্নয়নে বিপুল অঙ্কের ব্যয় করেছে বিগত সরকার। তারপরও স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া যেন নাগরিকের কাছে সোনার হরিণ। গত এপ্রিল থেকে স্বাস্থ্য খাতের মূল্যস্ফীতি গড় মূল্যস্ফীতির চেয়েও বেশি। এ খাতের ওষুধ থেকে শুরু করে চিকিৎসা ব্যয় এখন মানুষের লাগামের বাইরে।

সম্প্রতি জুলাই মাসের ভোক্তা মূল্যসূচক (সিপিআই) তথ্য প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। এতে দেখা যায়, জুলাইয়ে স্বাস্থ্য খাতের মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১৩ দশমিক ২৭ শতাংশ হয়েছে। এর অর্থ ২০২৩ সালের জুলাইয়ে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় ১০০ টাকা হলে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে তা বেড়ে হয়েছে ১১৩ টাকা ২৭ পয়সা। একই মাসে দেশের গড় মূল্যস্ফীতি ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশ।

স্বাস্থ্য খাতের এ চিত্র শুধু জুলাইয়ে নয়, গত এপ্রিল থেকে এ খাতের মূল্যস্ফীতি মানুষের সাধ্যের বাইরে। গত মার্চ মাসে স্বাস্থ্য খাতের মূল্যস্ফীতি ছিল ২ দশমিক ১৬ শতাংশ, কিন্তু এপ্রিলে তা এক লাফে বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ। এরপর আর নিয়ন্ত্রণে আসেনি। মে মাসে ১২ শতাংশের ঘরে এলেও জুন ও জুলাইয়ে ১৩ শতাংশের ওপরেই আছে।

চলতি বছরের বাজেটেও স্বাস্থ্য খাতের ব্যয় কিছুটা বাড়ানো হয়েছে। যদিও বার্ষিক উন্নয়ন বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন ব্যয় অন্য খাতের ব্যয়ের তুলনায় সামান্য। পরিবহন ও যোগাযোগ খাতেই সবচেয়ে বড় বরাদ্দ দিয়ে আসছিল আওয়ামী লীগ সরকার। তবে সরকার পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের এই বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের জন্য রাখা হয়েছে ৪১ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৫ দশমিক ২ শতাংশ এবং জিডিপির শূন্য দশমিক ৭৪ শতাংশ।

এ বছরের শুরু থেকেই দেশের সব ধরনের ওষুধের দাম বাড়িয়েছে কোম্পানিগুলো। বিভিন্ন কোম্পানির উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং বিক্রি থেকে আয়ের হিসাব পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, দাম বাড়ানোর হার অস্বাভাবিক। এই অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির অজুহাত হিসেবে কোম্পানিগুলো ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন ও আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়াকে দায়ী করছে। এ সময় গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধিও উৎপাদন খরচ বাড়িয়েছে বলে জানিয়েছেন ওষুধ কোম্পানিগুলোর শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা।

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২ মার্চ একটি শীর্ষ কোম্পানি তাদের উৎপাদিত ওষুধগুলোর মধ্যে ২৪টির দাম বাড়িয়েছে। এর মধ্যে ক্যাপসুল ট্রিওসিম-২০০-এর দাম প্রতিটি ২৮ দশমিক ৫ শতাংশ বা ১০ টাকা বাড়িয়ে ৪৫ টাকায় নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া কোম্পানিটির উৎপাদিত ট্যাবলেট মনোকাস্ট, ক্যাপসুল নার্ভালিন, ট্যাবলেট রিলেনটাস, ফ্যামোম্যাক্সসহ বিভিন্ন ওষুধের দাম প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। ব্রঙ্কিয়াল অ্যাজমাসহ ফুসফুসের রোগে ব্যবহার হয় এ কোম্পানির ট্যাবলেট ফিক্সোলিন। ৪০০ মিলিগ্রামের এই ওষুধের প্রতি পিসের দাম গত ফেব্রুয়ারি মাসেও ৫ টাকা ছিল। কিন্তু এক ধাক্কায় এর দাম ১৪০ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ১২ টাকা।

গত ফেব্রুয়ারিতে আরেকটি কোম্পানির উৎপাদিত ১১টি ওষুধের দাম বাড়ানো হয়েছে। তাদের ওষুধের দাম ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এর মধ্যে ৩০ পিসের এরিস্টোগোল্ড ট্যাবলেটের প্যাকেটের দাম ২৭০ থেকে ৩৯০, স্টাফেন ২৫০ থেকে ৪০০ ও অ্যারোডিন সলিউশন ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা করা হয়েছে। এর আগেও কোম্পানিটি বিভিন্ন সময়ে তাদের ব্র্যান্ডের ওষুধের দাম ব্যাপক হারে বাড়িয়েছে। একইভাবে সাম্প্রতিক সময়ে একটি শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি তাদের উৎপাদিত এমব্রোক্স, সেফোটিল, সেফ-৩, সেফট্রোন, ক্লোফেনাকসহ ২৩টি ব্র্যান্ডের ওষুধের দাম বাড়িয়েছে। অন্যান্য ওষুধ উৎপাদনকারী কোম্পানিও একইভাবে দাম বাড়াচ্ছে।

বিভিন্ন কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, এক বছরে ওষুধের কাঁচামালের দাম গড়ে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বেড়েছে। তবে গত দুই বছরে ডলার, কাঁচামাল ও জ¦ালানির দাম যতটা না বেড়েছে, এর চেয়ে অনেক বেশি বেড়েছে তাদের উৎপাদিত ওষুধের দাম।

ওষুধের দাম ব্যাপক হারে বেড়ে যাওয়ায় এ খাতে জনসাধারণের ব্যয়ও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের এক জরিপ অনুযায়ী, চিকিৎসা ব্যয়ের ৬৪ শতাংশই এখন ওষুধের পেছনে খরচ হচ্ছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর লাগামহীন দর বাড়ার কারণে নিম্ন আয়ের অনেকেই জরুরি প্রয়োজন না হলে ওষুধ কিনছে না।

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, করোনা মহামারী ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে দেশের প্রায় সব খাতের ব্যবসা-বাণিজ্য অনেক চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামাল ও জ¦ালানির দাম বাড়ায় সব কোম্পানির উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। অনেক কোম্পানির মুনাফা ব্যাপক হারে কমে গেছে, কোনো কোনো খাতের কোম্পানি পড়েছে লোকসানে। তবে এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ওষুধ উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো। দু-একটি ব্যতিক্রম বাদ দিলে প্রায় সব ওষুধ কোম্পানি দেশের অর্থনৈতিক অস্থিরতার এমন সময়ে উচ্চ মুনাফা বজায় রেখেছে। ২০২২-২৩ হিসাববছরে দেশে ওষুধের মার্কেট সাইজ ছিল সাড়ে ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৩৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকার। গড়ে ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে ওষুধের বাজারের।