অবরুদ্ধ বত্রিশ বিরুদ্ধ চিত্র

হাতে লাঠিসোঁটা নিয়ে গত বুধবার রাত থেকেই রাজধানীর ধানম-ির ৩২ নম্বর ঘিরে অবস্থান নিয়েছিল শত শত লোক। লাঠির মাথায় জাতীয় পতাকা বাঁধা। আশপাশ এলাকার সড়কগুলোতে ‘সন্দেহভাজন’ লোকজনকে মারধর, আটকে রাখা, মোবাইল ফোন চেক করার মতো ঘটনাও ঘটেছে। এমন ‘অবরুদ্ধ’ ৩২ নম্বরে কেউ বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে যেতে পারেননি। প্রতি বছরই এ দিনটিতে শেখ মুজিবের ঐতিহাসিক বাড়িটি ঘিরে থাকত শোকের আবহ। শ্রদ্ধার ফুল হাতে হাজার হাজার মানুষের পদচারণা। এবার সেখানে বেজেছে গান। দেখা গেছে অবস্থান নেওয়া লোকজনের উচ্ছ্বাস।

পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে গতকাল বৃহস্পতিবার সেখানে যা ঘটেছে, এমন ঘটনা আর ঘটেনি বলে জানান শুক্রাবাদে বসবাস করা অন্তত ডজনখানেক জ্যেষ্ঠ নাগরিক। তারা বলছিলেন, আওয়ামী লীগ আরও কঠিন সময় পার করেছে। কিন্তু ৩২ নম্বরে নির্মিত শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে যে যার মতো এসেছেন, শ্রদ্ধা জানিয়ে চলে গেছেন।

শুক্রাবাদের বাসিন্দা আজগর আলীর বয়স ৭২ বছর। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অনেক শাসনামল দেখেছি, আজকের ১৫ আগস্ট ঘিরে যে চিত্র এখানে দেখেছি, তা আর কখনো দেখিনি, দেখব বলে মনেও হয় না।’ আজগর আলী বলেন, ‘কেন এমন ঘটনা ঘটল তার পুনর্মূল্যায়ন ও পর্যালোচনা হওয়া উচিত।’

ছেষট্টির ৬ দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন ও ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধ শেষে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতা অর্জন ইতিহাসের এসব কালপর্বের সাক্ষী ৩২ নম্বরের বঙ্গবন্ধু ভবন।

১৯৬১ সালের ১ অক্টোবর থেকে এ বাড়িতে বসবাস শুরু করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেখানেই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে নিহত হন তিনি।

গত ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয় আওয়ামী লীগ সরকার। ওইদিন বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসা বঙ্গবন্ধু ভবনে আগুন দেওয়া হয়।

পাল্টা অভ্যুত্থান হওয়ার আশঙ্কায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মী-সমর্থকরা বুধবার রাত থেকে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের বাড়ি ও আশপাশের সড়কে অবস্থান নেন। সেদিন সেখানে প্রদীপ প্রজ¦¦ালন করতে গিয়ে হামলার শিকার হন অভিনয় শিল্পী রোকেয়া প্রাচী।

গতকালও ভোর থেকে বঙ্গবন্ধু ভবনের সামনের সড়কে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতির ধারেকাছে কাউকে ঘেঁষতে দেওয়া হয়নি। পাশের সড়কে মাইকে ঘোষণা করা হয়, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কেউ এ দেশে থাকতে পারবে না। শত শত মানুষের থেমে থেমে সেøাগান-মিছিলে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে ওই এলাকা।

অবরুদ্ধ ৩২ নম্বর : ধানম-ি ৩২ নম্বর এলাকার বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরের চারপাশ, রাসেল স্কয়ার ও পান্থপথ মোড়, কলাবাগান মোড়, ২৭ নম্বর মোড় আর আবাহনী মাঠ এলাকা ছিল অনেকটাই অবরুদ্ধ। সকাল থেকে ধানম-ি লেক দিয়ে চলাচলের রাস্তা খোলা রেখে বাকি পথ ব্যারিকেড দিয়ে বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। বাজানো হয়েছে স্বাধীনতার গান। প্যারোডি গানের সঙ্গে নাচতেও দেখা যায় কাউকে কাউকে। সকাল থেকে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে বিচ্ছিন্নভাবে কেউ কেউ আসার চেষ্টা করলেও তাদের লাঞ্ছিত করে সেখানে অবস্থান নেওয়া অসংখ্য লোকজন। কিশোর, যুবক, মধ্যবয়সী অসংখ্য মানুষ আশপাশে থাকা সব অলিগলিতে পাহারায় ছিল। আওয়ামী লীগের কিছু কর্মী-সমর্থক সকালে ধানম-ি ৩২ নম্বরের দিকে এলে তাদের ধাওয়া খেয়ে ফিরে যায়।

সকাল সাড়ে ৯টার দিকে মিরপুর রোড থেকে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরের প্রবেশমুখে ব্যারিকেডের সামনে আবদুর রাজ্জাক নামে প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটির এক শিক্ষার্থী হ্যান্ডমাইকে ঘোষণা দিচ্ছিলেন, ‘সকালে আওয়ামী লীগের দুষ্কৃতকারীরা ৩২ নম্বরের সামনে এসে ঝামেলা করার চেষ্টা করেছিল, ছাত্র-জনতা তাদের প্রতিহত করেছে। এখন যাদের ধরবেন উপযুক্ত প্রমাণ না পেলে কিছুই করবেন না। দুষ্কৃতকারীদের নিউ মডেল কলেজে আটকে রাখবেন।’

রাতে দেখা গেছে, ৩২ নম্বরে ঢোকার মুখে ঝুলছে ‘জাতীয় স্বৈরাচার মুক্ত দিবস’ লেখা বড় ব্যানার টানানো।

কালো পোশাক বা সন্দেহ হলেই জেরা-তল্লাশি : আশপাশে কালো পোশাক পরা কাউকে দেখলেও মেজাজ হারিয়েছেন অবস্থান নেওয়া লোকজন। মিরপুর রোডের দুই লেন দিয়ে চলাচল করা যাত্রাবাহী গণপরিবহনগুলো তল্লাশি করতেও দেখা গেছে।

পথে চলাচল করা কোনো ব্যক্তিকে দেখে আওয়ামী লীগের সমর্থক হিসেবে সন্দেহ হলেই তার মোবাইল ও মানিব্যাগ তন্নতন্ন করে তল্লাশি করতে দেখা গেছে। তল্লাশিতে আওয়ামী লীগের দলীয় সংশ্লিষ্টতা পেলেই তাকে মারধর করা হচ্ছিল। একাধিক হ্যান্ডমাইক থেকে অবস্থান নেওয়া লোকজনের উদ্দেশে বারবার বলা হচ্ছিল, ‘পুরো শরীরে মারেন, মাথায় মাইরেন না।’

সকালে সন্দেহভাজক এক ব্যক্তির মানিব্যাগ তল্লাশি করে আওয়ামী লীগের এক নেতার ভিজিটিং কার্ড পায় অবস্থানকারীরা। তারপর তাকে বেধড়ক পিটুনি দেওয়া হয়। পিটুনির শিকার ওই ব্যক্তির নাম-পরিচয় জানা যায়নি। কাজে বের হওয়া পথচারী ও স্থানীয় বাসিন্দারা অবস্থানকারীদের এমন আচরণে বিরক্ত ও শঙ্কিত।

পান্থপথ এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, ‘আমি প্রতিদিনের মতো আজ (গতকাল) সকাল সাড়ে ৬টার সময় লেকে হাঁটতে যাচ্ছিলাম। রাসেল স্কয়ার পার হয়ে ময়লার ডিপোর পেছনের রাস্তা ধরে যাওয়ার সময় একদল ছেলে আমার পথরোধ করে। তারপর জানতে চায় কোথায় যাচ্ছি। আমি হাঁটতে যাওয়ার কথা বললে, তাদের পক্ষ থেকে বলা হয় আজ হাঁটতে যেতে হবে না। বাসায় যান। এ সময় আমাদের পাশ দিয়ে কালো গেঞ্জি গায়ে একটি ছেলে যাচ্ছিল। ওই ছেলেকে ডেকে দলটির একজন জিজ্ঞেস করে, কালো পোশাক পরেছেন কেন? শোক পালন করছেন? শোক লাগছে? তার সঙ্গে খুবই বাজে ব্যবহার তখন, হুট করে আমার পকেট হাত ঢুকিয়ে দেয় একজন তল্লাশি করার জন্য মোবাইল চায়। কেন এমন করছে, এরা আসলে কারা?’

সন্দেহ হলেই মারধর করে আটক : সরেজমিন দেখা গেছে, ধানম-ি ৩২ নম্বর ও এর আশপাশের অবস্থানকারীদের হাতে আটক হওয়া প্রায় ৩০ জনকে উদ্ধার করেছেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা। দুপুর ১টার দিকে সেনাবাহিনীর চারটি এবং বিজিবির একটি গাড়ি এসে থামে নিউ মডেল কলজের সামনে। সেনাসদস্যরা গাড়ি থেকে নেমেই হুইসেল বাজিয়ে নিউ মডেল কলেজের সামনে থাকা শিক্ষার্থীদের সরিয়ে দেন। পরে কয়েকজন সেনাসদস্য কলেজের ভেতরে ঢুকে আটকে রাখাদের বের করে গাড়িতে তোলেন। এর মধ্যে একটি গাড়িতে ৯ নারী এবং দুুটি গাড়িতে ২০ জনের বেশি পুরুষকে দেখা গেছে। এরপর পান্থপথের দিকে চলে যায় গাড়িগুলো। এ সময় অবস্থান নেওয়া লোকজন সন্দেহভাজন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্য করে ভুয়া ভুয়া সেøাগান দেয়।

এর আগে সকাল ৮টার পর থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত ১০০ জনের বেশি লোকজনকে আওয়ামী লীগ সন্দেহে মারধর করতে দেখা যায়। কিল-ঘুসি ছাড়াও লাঠি, পানির পাইপ দিয়ে মারধর করে। অনেককেই নিউ মডেল কলেজের মধ্যে আটকে রাখে।

এ ছাড়া পথে ভিডিও চিত্র ধারণ করা ও ছবি তুলতে থাকা এবং শেখ মুজিবুর রহমান ও আওয়ামী লীগসংশ্লিষ্ট কিছু মোবাইলে পাওয়ায় কয়েকজনকেও আটক করতে দেখা যায়। সন্দেহজনক ব্যক্তিদের মোবাইল চেক করে রাস্তায় থাকা আন্দোলনকারীরা।

দুপুর সাড়ে ১২টার আগে আসাদ গেট থেকে সায়েন্স ল্যাবমুখী একটি প্রাইভেট কার থামায় আন্দোলনকারীরা। ঢাকা মেট্রো গ ২০-৮১৪৮ নম্বরের কালো রঙের গাড়িটির সামনে নৌকাখচিত শোপিস দেখে ভাঙচুর করা হয়। গাড়িতে থাকা দুজন মহিলা ও ড্রাইভার গাড়ি থেকে নেমে পালিয়ে যান। এর আগে কারওয়ান বাজার থেকে রাসেল স্কয়ারের দিকে প্রগতির কফি কালারের একটি গাড়ি (ঢাকা মেট্রো ঘ ১১-৭৯৮১) আরেকটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়।

প্রতক্ষ্যদর্শীরা জানায়, এ গাড়িতে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কাগজপত্র পাওয়া যায় বলে জানান। পরে ভাঙচুর করা দুটি গাড়িই রাসেল স্কয়ারের সড়কে বাম পাশে রাখা হয়।

বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৩-এ ‘গৃহ ও যোগাযোগের রক্ষণ’ বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা, জনসাধারণের নৈতিকতা বা জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে প্রত্যেক নাগরিকের প্রবেশ, তল্লাশি ও আটক হতে স্বীয় গৃহে নিরাপত্তা লাভের অধিকার থাকবে এবং চিঠিপত্রের ও যোগাযোগের অন্যান্য উপায়ের গোপনতা রক্ষার অধিকার থাকবে। অর্থাৎ গোপনীয়তা একজন ব্যক্তির সংবিধান স্বীকৃত অন্যতম একটি মৌলিক অধিকার। মোবাইল ফোনে মানুষের ব্যক্তিগত ও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা, তথ্য বা ছবি থাকতে পারে, যা ঘাঁটাঘাঁটি করা একজন ব্যক্তির গোপনীয়তার অধিকারের চরম লঙ্ঘন। এ ছাড়া একজন ব্যক্তির গোপনীয়তার সঙ্গে তার মর্যাদার সম্পর্ক জড়িত বলেও মনে করেন আইনজ্ঞরা।

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কদের। জবাবে অন্যতম প্রধান সমন্বয়ক ও অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্য ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘কারও ফোন চেক করা, নিরস্ত্র-নিরপরাধ ব্যক্তির ওপর চড়াও হওয়া নিন্দনীয়। একইভাবে গ্রেপ্তার করা ব্যক্তিদের মিডিয়ায় বাজেভাবে উপস্থাপন মানবাধিকার লঙ্ঘন। অপরাধীদের আইনের প্রক্রিয়া অনুসারে বিচার করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের অভ্যুত্থান ন্যায় ও নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ, জীবনের নিরাপত্তা ও সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা আমাদের ছাত্র-নাগরিক অভ্যুত্থানের লক্ষ্য ছিল। আমাদের যেমন প্রতিরোধ জারি রাখতে হবে অন্যদিকে নিজেদের অভ্যুত্থানের স্পিরিট বজায় রাখতে হবে।’

ধানম-ি থানার ওসি এমরান হোসেন জানান, তাদের থানায় ২৫ জনকে সোপর্দ করেছে ধানম-ি ৩২ নম্বর এলাকা থেকে। সকাল থেকে সন্ধ্যা ৬টা নাগাদ তাদের আটক করা হয়েছিল। তাদের ১৫ জনকে পরিবারের জিম্মায় দেওয়া হয়। এর মধ্যে অনেকেই মারধরের শিকার হয়েছেন। যাদের চিকিৎসা দরকার।

ওসি এমরান হোসেন সন্ধ্যায় বলেন, ‘ধানম-ি ৩২ নম্বর সড়কের আশপাশ এলাকায় লাঠিসোঁটা নিয়ে অবস্থান করছে অনেক লোকজন। তারা অনেককেই সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করে আমাদের কাছে দিচ্ছে। থানা হেফাজতে থাকা ১৫ জনকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। আরও সাতজনের বেশি লোক এখনো থানায় আছেন।’

সাংবাদিকদের উদ্দেশে ঘোষণা : হ্যান্ডমাইকে ঘোষণা দিয়ে সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলা হয়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মী-সমর্থক যারা ৩২ নম্বরে অবস্থান নিয়েছিল তাদের কর্মকাণ্ডের ছবি ও ভিডিও ধারণ না করতে। পেশাগত দায়িত্বের অংশ হিসেবে ছবি ও ভিডিও ধারণ করার সময় লাঞ্ছিত হয়েছেন কয়েকজন ফটোসাংবাদিক ও প্রতিবেদক।