আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তার সরকারের সময়ের বেশ কয়েকজন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, পুলিশ ও র্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগের তদন্ত শুরু হয়েছে। অভিযোগের তদন্ত করতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থায় গত বুধবার আবেদন করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবী। এদিকে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গতকাল বৃহস্পতিবার নতুন করে আরও একটি অভিযোগ দায়ের হয়েছে। অন্যদিকে জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা বলেন, প্রচলিত আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনে এসব হত্যাকা-ের বিচার সম্ভব।
বুধবারের আবেদনটি জমা দেওয়ার পর তদন্ত সংস্থা এটিকে মামলা হিসেবে রেজিস্ট্রিভুক্ত করে। তদন্ত সংস্থার উপপরিচালক (প্রশাসন) মো. আতাউর রহমান এ মামলার প্রধান তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাকে নিয়ে ছয়জনের একটি কমিটি তদন্তকাজ শুরু করেছে। এ ছাড়া এই ছয়জনকে আরও বেশ কয়েকজন তদন্ত কর্মকর্তা সহযোগিতা করবেন বলে জানা গেছে। ইতিমধ্যে তদন্তকারী কর্মকর্তারা ঘটনার সময়কালে পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা শুরু করেছেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থায় গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের আরও একটি অভিযোগ দায়ের হয়েছে। গত ২০ জুলাই ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চিটাগং রোডে পুলিশের গুলিতে নিহত মো. মেহেদীর বাবা মো. সানাউল্লাহর পক্ষে এ অভিযোগটি দাখিল করা হয়। সানাউল্লাহকে আইনি সহায়তা দেওয়া সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী গাজী এমএইচ তামিম বিষয়টি দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করে বলেন, তদন্ত সংস্থা অভিযোগটি তদন্তের জন্য গ্রহণ করেছে।
আইসিটি আইনে বিচার চলবে : গত বুধবার সচিবালয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে অন্তর্বর্তী সরকারের আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল বলেন, ‘১৯৭৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন আছে, ২০০৯ ও ২০১৩ সালে এই আইনের সংশোধনী হয়েছে। সেই আইনে আমরা জুলাই গণহত্যা; আগস্টের প্রথম পাঁচ দিনের গণহত্যাও বোঝাচ্ছি। এর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারের জন্য ইতিমধ্যে ছোটখাটো গবেষণা করেছি। আমরা দেখেছি, এ আইনের অধীনে হত্যাকা-ে জড়িত ব্যক্তি ও যারা আদেশ দিয়েছেন এবং যারা বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন, তাদের সবাইকে বিচারের আওতায় আনা সম্ভব।’
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে গুলিতে নিহত হত্যাকা-ের বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে করার বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্তে একমত পোষণ করেছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা। তারা বলেন, প্রচলিত এ আইনে এই ধরনের বিচারের বিষয়ে করণীয় বলা আছে।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ আইনের সংশ্লিষ্ট ধারা বিশ্লেষণ করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২০১৩-তে আইনটি সংশোধনের পর বলা হয়েছে, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। এখানে এটি বলা নেই যে, যুদ্ধের সময়, কখন কী এসব কিছু বলা নেই। আইনে এটা বলা হয়েছে, এ আইন হওয়ার আগে-পরে যেকোনো সময় যদি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হয় তাহলে এই ট্রাইব্যুনাল এর বিচার করতে পারবে। তিনি বলেন, ‘মামলা হবে। মামলার তদন্ত হবে। সেখানে কীভাবে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, তা নির্দিষ্ট করে তুলে আনবে। এরপর বিচারের পর্যায়ে আসবে।’
যা আছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে : ১৯৭৩ সালে প্রণীত আইনের ৩(১) ধারায় বলা আছে, আইনের দুই নং উপধারায় উল্লিখিত যেকোনো অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী [বা সংস্থা] বা কোনো সশস্ত্র, প্রতিরক্ষা বা সহায়ক বাহিনীর কোনো সদস্যের জাতীয়তা যাই হোক না কেন, তা যদি এই আইন প্রবর্তনের আগে বা পরে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে সংঘটিত হয়, তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার বিচারের এবং শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা থাকবে।
অর্থাৎ মানবতাবিরোধী অপরাধ, শান্তিবিরোধী অপরাধ, গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, জেনেভা কনভেনশনবিরোধী কাজসহ আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে যেকোনো অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি বা দল, সেনাবাহিনী কিংবা তাদের সহযোগী সশস্ত্র বাহিনীর বিচারের ক্ষমতা ট্রাইব্যুনালকে দেওয়া হয়েছে।
এ আইনের অধীনেই সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিচার করা সম্ভব বলে বিবিসি বাংলাকে জানান বাংলাদেশ সরকারের অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘১৯৭৩-এর যে আইনটা আছে, ওখানে ক্রাইম অ্যাগেইনস্ট হিউম্যানিটির (মানবতাবিরোধী অপরাধ) সংজ্ঞা অনুসারে এটি অফেন্স (অপরাধ) হিসেবে আসে, অন্যগুলোর মধ্যে না।’ অর্থাৎ, আইনের ৩ নং ধারার ২(ক) উপধারায় উল্লিখিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আনা যেতে পারে।
এই ধারা অনুযায়ী, হত্যা, নির্মূল, দাসত্ব, নির্বাসন, কারাবরণ, অপহরণ, বন্দীকরণ, নির্যাতন, ধর্ষণ বা কোনো বেসামরিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংঘটিত অন্যান্য অমানবিক কাজ বা রাজনৈতিক, জাতিগত বা ধর্মীয় ভিত্তিতে নিপীড়নের মতো ক্ষেত্রগুলোতে এই ট্রাইব্যুনালে বিচার করা যাবে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) প্রসিকিউটর হিসেবে কাজ করেছেন রানা দাশগুপ্ত। তবে গত ১৩ আগস্ট তিনি পদত্যাগ করেছেন। তিনি বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদেরও সাধারণ সম্পাদক। রানা দাশগুপ্ত বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘এ আইনের একটা লম্বা প্রেক্ষাপট আছে। এটা করা হয়েছিল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে। সেখানে যারা যুদ্ধাপরাধ করেছে, তাদের বিচার করার জন্য এ আইনটি করা হয়।’ ফলে এখন যে প্রেক্ষাপটে বিচারের কথা বলা হচ্ছে, তা প্রযোজ্য হয় না বলে তিনি মনে করেন।
যে প্রক্রিয়ায় হবে তদন্ত কার্যক্রম : তদন্ত কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে গতকাল একাধিক তদন্ত কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখন তারা গত ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত যত ঘটনা ঘটেছে, কতজন নিহত হয়েছে, আহত হয়েছে কতজন, তা নিয়ে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো সংগ্রহ করে তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এ কার্যক্রম শেষে তদন্ত সংস্থা ঘটনাস্থলগুলো নির্ধারণ করবেন। এরপর ঘটনাস্থল পরিদর্শন, ভুক্তভোগীদের জবানবন্দি নেওয়ার পর আসামিদের বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হবে। এর মধ্যে যেসব আসামি গ্রেপ্তার আছেন তাদের শ্যেন অ্যারেস্ট দেখানো এবং যারা গ্রেপ্তার নেই তাদের বিষয়ে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আদেশ দিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আবেদন করবে তদন্ত সংস্থা। তদন্ত কর্মকর্তারা বলেন, এসব প্রক্রিয়া শেষে তদন্ত সংস্থা অভিযোগ তৈরি করে প্রসিকিউশনে দাখিল করবেন। এরপর বিষয়টি বিচারের পর্যায়ে আসবে।
তদন্তকারী কর্মকর্তা আতাউর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখন ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান ও প্রসিকিউশন প্যানেল নেই। ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করতে হবে। তবে আমরা আমাদের কাজ এগিয়ে নেব। পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শেষ হলেই আমরা প্রতিবেদন উপস্থাপন করব।’ তিনি বলেন, ‘যেহেতু সরকার ইতিমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে যে, জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে এসব হত্যার তদন্ত হবে, এখন তত্ত্বাবধানের রূপরেখা কেমন হবে, জাতিসংঘ এসে যদি আমাদের দিকনির্দেশনা দেয় তাহলে সরকার ও জাতিসংঘ যেভাবে বলবে, সে অনুযায়ী কার্যক্রম চলবে।’
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অভিযোগ : বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় গত ৫ আগস্ট পুলিশের গুলিতে নিহত সাভার ডেইরি ফার্ম হাই স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র আরিফ আহমেদ সিয়ামের বাবা মো. বুলবুল কবিরের পক্ষে গত বুধবার এ আবেদনটি করেন অ্যাডভোকেট গাজী এম এইচ তামিম। এতে অভিযোগটি নথিভুক্ত করে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩ এর ৮ ধারা অনুযায়ী আসামিদের বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের আরজি জানানো হয়েছে।
আবেদনে শেখ হাসিনা ছাড়া আরও যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে তারা হলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, সাবেক ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান ও কতিপয় অসাধু পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্য, অতিরিক্ত কমিশনার মো. হারুন অর রশীদ, র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক মো. হারুন অর রশিদসহ কতিপয় অসাধু র্যাব কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়েছে। একই সঙ্গে সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনকে আসামির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আসামিদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৭৩ এর ৩ (২), ও ৪ (১), ৪ (২) ধারা অনুযায়ী গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়, আন্দোলকারী ছাত্র-জনতাদের সমূলে বা আংশিক নির্মূল করার হীনউদ্দেশ্যে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলন প্রতিহত করতে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতাকে সমূলে বা আংশিক নির্মূল করার নির্দেশনা দেন। এতে বলা হয়, আসামি ওবায়দুল কাদের, তৎকালীন সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও এমপি একই উদ্দেশ্যে উসকানিমূলক বক্তব্য ও নির্দেশনা দেন। আসামি শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের ও অন্যান্য আসামির এমন নির্দেশনায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের নেতাকর্মী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দেশব্যাপী বিভিন্ন স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীদের ওপর আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা করে তাদের নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে।
আওয়ামী লীগ সরকারের করা আইন : আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছিল আওয়ামী লীগ সরকার। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। জামায়াত-বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতার বিচার হয় এই ট্রাইব্যুনালে। তাদের সাজাও কার্যকর হয়েছে। এখন ছাত্র-জনতার আন্দোলনকালে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডে আওয়ামী লীগের সভাপতি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আরও অনেকের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তাদের বিচার করার উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।