কোটা সংস্কার আন্দোলনে নিহত

গুলি পেটে ঢুকে পিঠ দিয়ে বের হয় ইসমামুলের

সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থা সংস্কারের স্বপ্ন নিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন ১৬ বছরের তরুণ মোহাম্মদ ইসমামুল হক। গত ৫ আগস্ট ছাত্র জনতা যখন চূড়ান্ত বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে তার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে গুলিবিদ্ধ হন ইসমামুল। পুলিশের ছোড়া গুলি তার পেটের মাঝ বরাবর লাগে এবং পিঠ দিয়ে বের হয়ে যায়। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেকে) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় এই তরুণের।  ফলে ছাত্র জনতার চূড়ান্ত বিজয় রাজপথে থেকে দেখতে পারেননি তিনি, এমনকি অংশ নিতে পারেননি বিজয় মিছিলেও।

চট্টগ্রাম জেলার লোহাগাড়া থানার বাসিন্দা ইসমামুল। তার বাবা নুরুল হক ২০১৭ সালে মারা যান। তার মৃত্যুর পর একমাত্র উপার্জনকারীকে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে যায় পরিবারের সদস্যরা। ৩ সন্তানকে নিয়ে জীবন যুদ্ধ শুরু করেন মা সাহেদা বেগম। স্বামীর মৃত্যুর পর ধার দেনা করে সংসার চালান। পরিবারের অভাব দূর করতে ও আহার জোগাতে কাজের সন্ধানে বের হন ইসমামুল। মৃত্যুর আগেও তিনি রাজধানীর চকবাজারে একটা জুয়েলারি দোকানে চাকরী করতেন। জুয়েলারি দোকান থেকে যে টাকা আয় করতেন তা গ্রামে পাঠিয়ে দিতেন।

ইসমামুলের ভাই মহিবুল হক দেশ রূপান্তরকে জানান, ৫ আগস্ট সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অবস্থান কর্মসূচী ছিল। আমার ভাই ইসমামুল এই কর্মসূচীতে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে যুক্ত হয়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিতি বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে সরকারের পদত্যাগের দাবিতে উপস্থিত ছাত্র জনতা সকাল সাড়ে ১১টার দিকে শহীদ মিনার থেকে মিছিল নিয়ে চানখারপুলের দিকে রওনা হয়। মিছিলে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়। এ সময় ইসমামুলের শরীরে এসে গুলি লাগে।

তিনি কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, পুলিশের একটা গুলি আমার ভাইয়ের পেটের মাঝ বরাবর লাগে এবং পিঠ দিয়ে বের হয়ে যায়। তাকে মিছিল থেকে দ্রুত উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তার অবস্থার অবনতি হলে আইসিউতে নেওয়া হয়। এর দুদিন পর ৭ আগস্ট চিকিৎসাধীন অবস্থায় আমার ভাই মারা যায়।

ইসমামুলের মৃত্যুর ঘটনায় মহিবুল হক বাদী হয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার শাহবাগ থানায় মামলা দায়ের করেছেন। মামলার এজাহারে তিনি উল্লেখ করেন, সহকারী পুলিশ কমিশনার ইমরুল ইসলামের সরাসরি নির্দেশ ও অনুমোদনক্রমে অজ্ঞাতনামা পুলিশদের দ্বারা মিছিলে গুলি করা হয়। এছাড়া মামলায় সাবেক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল, সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার হাবিবুর রহমান, ডিবি প্রধান হারুন অর রশিদ, সহকারি পুলিশ কমিশনার শুভ্র দাসকেও নির্দেশদাতা হিসেবে উল্লেখ করেন।

শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে শামিল হয়ে মারা যাওয়া ইসমামুলের পরিবারের আর্থিক অবস্থা শোচনীয় বলে জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. সাকিব। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২০১৭ সালে তার বাবা মারা যান। চকবাজারের একটা জুয়েলারি দোকানে চাকরি করে সংসার চালাতেন। সম্ভবত বিজয়ের চূড়ান্ত মুহূর্তের আগে শেষ গুলি হয় ইসমামুলের ওপর। সেদিন ১২টার দিকে শাহবাগ থেকে হাজার হাজার ছাত্র জনতা গণভবন দখলের উদ্দেশ্যে রওনা দেই। 

পরিবারের সদস্যরা জানান, তাদের আর্থিক অবস্থা শোচনীয়। বড় ছেলে মহিবুল ও মেজো ছেলে ইসমামুল কাজ করে সামান্য যে টাকা আয় করতেন তা দিয়েই সংসার খরচ চালাতে হত। আগে থেকে দেনায় জর্জরিত থাকায় তাদের সংসার খরচ চালানো কষ্টকর ছিল। ইসমামুলের মৃত্যুর পর পরিবার চালানো আরও কঠিন হয়ে পড়ল।