১১ দিন মর্গে পড়েছিল জসিমের মরদেহ

ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালাতেন জসিম উদ্দিন সরকার (৩২)। ছাত্র গণআন্দোলনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের দিন গত ৫ আগস্ট বাসা থেকে বের হয়ে আর ফেরেননি তিনি। ফোন বন্ধ থাকায় যোগাযোগও করতে পারেননি জসিমের প্রথম স্ত্রী বানেছা বেগম। তিনি ভেবেছিলেন, জসিম হয়তো দ্বিতীয় স্ত্রীর কাছে গেছে। খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন সেখানেও নেই। এরপর থেকে জসিমকে খুঁজতে থাকেন তারা। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবসহ পরিচিত অনেক স্থানে খুঁজলেও জসিমের কোনো হদিস মেলেনি। কয়েক দিন পার হয়ে গেলেও বাসায় না ফেরায় দুশ্চিন্তায় পড়ে যায় তার পরিবার। কাকতালীয়ভাবে গত ১৩ আগস্ট স্বামীর নম্বরে ফের ফোন দিলে রিসিভ করেন অন্য একজন। পরে জানতে পারেন আজমপুর এলাকায় জসিম গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তাকে একটি ক্লিনিকে ভর্তি করেছিলেন ফোন রিসিভ করা ওই ব্যক্তি।

এরপর ওই ক্লিনিকে জসিমের খোঁজে যায় তার পরিবার। কিন্তু ওই নামে কোনো রোগী নেই বলে জানায় ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ। একপর্যায়ে জানা যায় ওই ক্লিনিকে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) মর্গে রাখা হয়েছে। গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যাওয়ার ১১ দিন পর গতকাল শুক্রবার ঢামেক মর্গে গিয়ে খুঁজে পান স্বামীর মরদেহ। দ্বিতীয় স্ত্রীর কাছে আছেন ভেবে এতদিন নিজেকে সান্ত্বনা দিলেও স্বামীর লাশ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন বানেছা বেগম। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলছিলেন, ‘আমগো একা কইরা চইলা গেলা, আমগো দেখবো কেডা। কেন গেছিলা ওইহানে (আজমপুর)। কারা মেরে ফেলল আমার স্বামীরে। আমরা বাঁচব কীভাবে?’ জানা গেছে, জসিমের বাড়ি জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলার নয়ানগর গ্রামে। বর্তমানে প্রথম স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে উত্তরখান ময়নারটেক এলাকায় থাকেন।

স্বামীর বিষয়ে জানতে চাইলে বানেছা বেগম দেশ রূপান্তরকে জানান, জসিমের দ্বিতীয় স্ত্রী নারায়ণগঞ্জে থাকেন। প্রথমে ভেবেছিলেন, জসিম হয়তো তার কাছে আছেন। গত ১৩ আগস্ট জসিমের ফোনে আবার কল করলে অন্যপ্রান্ত থেকে এক ব্যক্তি কলটি রিসিভ করেন এবং তিনি বলেন, গত ৫ আগস্ট জসিম উত্তরা আজমপুর এলাকায় বুকে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন। তখন তাকে স্থানীয় একটি ক্লিনিকে নিয়েছিলেন ওই ব্যক্তি। এরপর থেকে জসিমের ফোনটি তার কাছে। পরবর্তী সময়ে ওই ক্লিনিকে গিয়েও জসিমকে পাওয়া যায়নি। একপর্যায়ে জানতে পারেন, সেখানে বেশ কয়েকজন মারা যাওয়ার পর লাশগুলো ঢামেক মর্গে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেই খবরে গতকাল সকালে মর্গে এসে স্বামী জসিমের মরদেহ দেখতে পান। মূলত জসিমের পরনের লাল শার্ট ও নেভি ব্লু জিন্স প্যান্ট দেখে শনাক্ত করেন তিনি। চেহারা কিছুটা বিকৃত হয়ে গেছে।

ঢামেক মর্গের ইনচার্জ রামু চন্দ্র দাস জানান, সহিংসতার ঘটনায় গতকাল একটি মরদেহ শনাক্ত হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার আল মামুন আমানতসহ দুটি মরদেহ শনাক্ত করে স্বজনরা নিয়ে গেছেন। এখনো আরও পাঁচটি বেওয়ারিশ লাশ মর্গে রয়েছে। তাদের সঠিক তথ্য ও পরিচয় পাওয়া গেলে তাদের মরদেহগুলো দিয়ে দেওয়া হবে।