আহতদের চিকিৎসা 

কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারীদের ডাকা কর্মসূচি বাস্তবায়নের সময় আগ্নেয়াস্ত্র এবং বিভিন্ন রকম হামলার ফলে সারা দেশে আহত হয়েছেন হাজার হাজার। এদের মধ্যে গুরুতর আহত হয়েছেন প্রায় ১৮০০ ছাত্র-জনতা। ঢাকা, রংপুর, চট্টগ্রাম, টাঙ্গাইল, রাজশাহী, কুমিল্লা, বগুড়া, ময়মনসিংহ, খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়া, বরিশাল, সিলেটসহ বিভিন্ন জেলা-উপজেলার হাসপাতাল ও ক্লিনিকে তারা চিকিৎসাধীন রয়েছেন। যাদের অধিকাংশই গুলিবিদ্ধ। জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণে, বেশিরভাগ প্রাণহানি ও আহত হওয়ার জন্য দায়ী করা হয়েছে নিরাপত্তা বাহিনী এবং আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত ছাত্র সংগঠনকে। এই হামলায় দেশ জুড়ে আন্দোলনকারীদের মধ্যে কারও চোখ গেছে, কারও হাত-পা আবার কেউ চিরজীবনের জন্য হয়েছেন শয্যাশায়ী। এ বিষয়ে শনিবার দেশ রূপান্তরে ‘বুলেটের ক্ষত নিয়ে বাঁচার লড়াই’ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। কারও পায়ে, কারও পেটে আবার কারও চোখের পাশ দিয়ে গুলি লেগে এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে গেছে। অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রের গুলিতে আহত বহু মানুষ এখনো চিকিৎসা নিচ্ছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের সাধারণ ওয়ার্ড আর নিবিড় পরিচর্যা ইউনিটে (আইসিইউ)। বুলেটের দগদগে ক্ষত নিয়ে জীবন ও মৃত্যুর মুখোমুখি তারা। ঢামেক হাসপাতালের এই ইউনিটে কর্তব্যরত এক চিকিৎসক বলেন, ‘এখানে যারা চিকিৎসা নিচ্ছেন সবার অবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ। কারও কারও অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রচুর রক্ত লাগছে। এদের মধ্যে শিক্ষার্থী, দিনমজুর এবং পথচারী রয়েছেন। গত সোমবার পর্যন্ত শুধু ঢামেক হাসপাতালের বিভিন্ন ইউনিট ও ওয়ার্ডে আন্দোলনে আহত ১৮৪ জন চিকিৎসাধীন ছিলেন। যাদের মধ্যে প্রায় সবাই গুলিবিদ্ধ। এই হিসেবে রাজধানী ঢাকাসহ দেশব্যাপী অন্যান্য হাসপাতালে আহত মানুষের প্রকৃত সংখ্যা কেমন হতে পারে? 

এরই মধ্যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হতাহতদের ব্যাপারে অনুসন্ধান করতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় একটি কমিটি গঠন করেছে। জানা গেছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যেসব ছাত্র-জনতা আহত হয়েছেন, সরকারি হাসপাতালে তাদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসহ যাবতীয় ব্যয় সরকার বহন করবে। বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোকেও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আহত ছাত্র-জনতার চিকিৎসা বিল গ্রহণ না করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। প্রয়োজনে এসব বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছাত্র-জনতার সব বিল সরকার বহন করবে বলেও জানানো হয়েছে বিজ্ঞপ্তিতে। ইতিমধ্যে সুচিকিৎসার লক্ষ্যে ঢামেক হাসপাতালে বিশেষায়িত ডেডিকেটেড কেয়ার ইউনিট গঠন করা হয়েছে। এতে আহতদের সর্বোচ্চ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে কর্তৃপক্ষ।  

অসংখ্য ছাত্র-জনতাকে নতুন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জীবন পার করতে হচ্ছে। অধিকাংশই গুলিবিদ্ধ অচল, আবার কেউ শারীরিক প্রতিবন্ধী। বর্তমানে বিছানাই তাদের একমাত্র ভরসার জায়গা। পরিবারের মানুষদের কাছে জিজ্ঞাসা কবে ফিরতে পারবেন তারা স্বাভাবিক জীবনে? কী উত্তর দেব আমরা! নিশ্চিতভাবে কেউ তা জানে না। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হতাহতের ব্যাপারে খোঁজখবর করতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে একটি কমিটি করেছে। কমিটির সদস্যরা তাদের কর্মপন্থা ঠিক করতে আজ রবিবার বৈঠক করবেন। বৈঠকে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া  হোক আহতদের শুধু চিকিৎসার ব্যয়ভার না, ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য একটি আর্থিক ব্যবস্থা যেন সরকার থেকেই করা হয়। যারা আন্দোলনে নিহত হয়েছেন, সবার নাম-ঠিকানা হয়তো এখনো জানা সম্ভব হয়নি। চূড়ান্ত তালিকা করে তাদের পরিবারের আর্থিক ভার সরকারকে নিতে হবে।

যারা এ রকম নৃশংস আক্রমণের সঙ্গে জড়িত ছিল তাদের যেন উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণাদির ওপর ভিত্তি করে কঠিন শাস্তির মুখোমুখি করা হয়। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে কোনো শান্তিপূর্ণ আন্দোলন এ রকম সহিংস হয়ে ওঠার নেপথ্য কারণ বের করে, তার উৎসমুখ যেন চিরতরে বন্ধ করা হয়। গুরুতর আহতদের অসহায় দীর্ঘশ্বাস আমাদের বিবেককে এমন প্রশ্ন করতে শেখাক আমরা কতদিন ন্যায্য পাওনার জন্য রক্ত আর জীবন দেব, আহত হব? কবে বাস্তবায়িত হবে সৌহার্দ্য এবং শান্তির সমাজ! এই চাওয়া কি অনেক বেশি কিছু! কে দেবে উত্তর? আমরা সেই প্রতীক্ষায় থাকলাম।