উপমহাদেশের সিনেমা বিপ্লবের সারথি যারা

একটা জাতিকে পুরো বিশ্বের সামনে উপস্থাপন করার সর্বোত্তম উপায় হচ্ছে সংস্কৃতি মাধ্যম। বলা হয়ে থাকে, যে দেশের সংস্কৃতি যত উন্নত সে দেশ ততটাই উন্নত। বাংলাদেশ পাকিস্তান, ভারত এবং শ্রীলঙ্কাকে নিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশ গঠিত। ১৮৯৬ সালে মুম্বাইতে লুমিয়ের ব্রাদার্সের চলচ্চিত্র প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে এ উপমহাদেশে সিনেমার যাত্রা শুরু হয়। এই উপমহাদেশে সিনেমায় ঈর্ষণীয় পরিবর্তন আসে ভারতীয় সিনেমার মাধ্যমে। ভারতে চলচ্চিত্র যাত্রা শুরু হয় দাদাসাহেব ফালকে পরিচালিত প্রথম ফিচার ফিল্ম ‘রাজা হরিশচন্দ্র’, যা মুক্তি পায় ১৯১৩ সালে। তখনকার সময়ে একটা দৃশ্যের সঙ্গে অন্য দৃশ্য যুক্ত করা ছিল বেশ কষ্টসাধ্য। আধুনিক যুগে এসে এখন তা সহজসাধ্য হয়ে উঠেছে। আধুনিকতার এই যুগে লোমহর্ষক অনেক ঘটনাই চিত্রায়িত হচ্ছে।

উপমহাদেশের সিনেমা বিপ্লবের ছোঁয়া লাগে বাংলাদেশ, পাকিস্তানের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতেও। সেই ধারাকে যারা সুদীর্ঘ করেছিলেন তাদের বলা হয় পরিচালক। উপমহাদেশ অনেক জনপ্রিয় চলচ্চিত্র পরিচালক তৈরি করেছে। যারা স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি অর্জন করেন। যাদের সুনিপুণ দক্ষতায় নির্মিত হয় এক একটা কালজয়ী সিনেমা। আজ থাকছে উপমহাদেশের জনপ্রিয় পরিচালকদের গল্প কথা এবং তাদের অজানা কিছু তথ্য।

সত্যজিৎ রায়

ভারতবর্ষের সিনেমার কথা উঠতেই সর্বপ্রথম তার নামটি বারবার উচ্চারিত হয়। সিনেমার ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাবশালী চলচ্চিত্র নির্মাতাদের একজন। সত্যজিৎ রায়ের ভিন্নতা ছিল সিনেমা নির্মাণের পেছনে। সব পরিচালাক স্ক্রিপ্ট লিখতেন তবে তিনি স্ক্রিপ্ট লিখতেন না। বরং স্ক্রিপ্ট আঁকতেন। শুনে অবাক হচ্ছেন। অবাক হওয়ারই কথা। কারণ তার মধ্যে এক অদ্ভুত শক্তি ছিল। তিনি সিনেমাতে যে গল্প দর্শককে দেখাতে চাইতেন তা চিত্র আকারে লিখতে আর ক্যামেরার পেছনে যখন বসতেন একের পর এক সংলাপ বলে যেতেন। তার এই অসাধারণ গুণ তাকে এনে দিয়েছিল দেশি-বিদেশি অনেক পুরস্কার। তার উল্লেখযোগ্য সিনেমার মধ্যে ‘পথের পাচালী’ অন্যতম।

রাজকুমার হিরানি

সামাজিকভাবে প্রাসঙ্গিক থিমগুলোর সঙ্গে কমেডি মিশ্রিত করার অনন্য ক্ষমতার জন্য দর্শকের কাছে সুপরিচিত তিনি। তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম সফল এবং প্রভাবশালী চলচ্চিত্র নির্মাতা। মুন্না ভাই, থ্রি ইডিয়টস-এর বিদ্রোহী র‌্যাঞ্চো বা এলিয়েন-এর মতো চরিত্রগুলোর গল্প বলার শৈলী দ্বারা জটিল বিষয়গুলোকে দর্শকদের কাছে সহজ করে তোলে এবং ইতিবাচক তথ্য থাকে। হিরানি তার প্লটে জটিলতা এড়িয়ে চলেন এবং আকর্ষণীয় স্লোগান বা স্মরণীয় সংলাপের ব্যবহার করেন। থ্রি ইডিয়টস ‘অল ইজ ওয়েল’ এবং মুন্না ভাই এমবিবিএস-এর ‘জাদু কি ঝাপ্পি’ সংলাপগুলো এখনো আইকনিক হয়ে আছে। তার সিনেমাগুলো সূক্ষ্ম ভাবে সামাজিক নিয়মের সমালোচনা করে। প্রতিটা সিনেমার গল্পে প্রায়ই ইতিবাচকতা এবং মানবতাবাদের বার্তা থাকে।

সঞ্জয় লীলা বানসালি

একজন প্রখ্যাত ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা। তার সিনেমার দৃশ্যতে নান্দনিক ভিজ্যুয়াল, বড় সেট, আকর্ষণীয় পোশাক এবং ভিন্ন ধারার কোরিওগ্রাফি দর্শকদের মুগ্ধ করে। তিনি শুধু সিনেমা নির্মাতা নন। একজন প্রশিক্ষিত শাস্ত্রীয় সংগীতজ্ঞ। নিজের সিনেমার গান তিনি নিজ হাতেই লিখেন। ‘দেবদাস’ সিনেমার মাধ্যমে তিনি সফলতার চূড়ায় পৌঁছে যান। তারপরই কাজ করেন ‘গোলিয়ন কি রাসলীলা রাম-লীলা’, ‘বাজিরাও মাস্তানি’, ‘পদ্মাবত’-এর মতো জনপ্রিয় সিনেমাতে। তার পরিচালিত সিনেমাগুলোতে তিনি মহাকাব্যিক প্রেমের গল্প ফুটিয়ে তুলেন। পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং ফিল্মফেয়ার পুরস্কারসহ একাধিক পুরস্কার।

অনুরাগ কাশ্যপ

সিনেমা পরিচালকদের বিশেষ কিছু গুণ থাকে। যার মধ্য অন্যতম হলো অন্তর্দৃষ্টি। ভারতে ঘটে যাওয়া বড় দুর্ঘটনার মধ্যে আলোচিত ১৯৯৩ সালের বোম্বে বোমা হামলা এবং ঝাড়খণ্ডের কয়লা মাফিয়াকে কেন্দ্র করে চিত্রায়ণ করেন ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’ এবং ‘গ্যাংস অব ওয়াসেপুর’। তার সিনেমাগুলোতে অপরাধ, দুর্নীতি এবং সামাজিক সমস্যাগুলো খুব তীক্ষè এবং সূক্ষ্মভাবে উপস্থাপন করেন এই নির্মাতা। ফ্যান্টম ফিল্মস নামে তার একটি প্রযোজনা সংস্থা আছে। ভারতীয় ফিল্মকে বিশ্বব্যাপী দর্শকদের কাছে পৌঁছাতে তিনি অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন।

শোয়েব মনসুর

‘খুদা কে লিয়ে’ এবং ‘বোলে’র মতো জনপ্রিয় সিনেমার পরিচালনা করে দর্শক মহলে প্রশংসিত হন। তিনি একজন পাকিস্তানি চলচ্চিত্র নির্মাতা, টেলিভিশন প্রযোজক, লেখক এবং গীতিকার। মনসুর তার টেলিভিশন সিরিজ ‘আনকাহি’, ‘আলফা ব্রাভো চার্লি’ এবং ‘সুনেহরে দিন’-এর মাধ্যমে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। তার সিনেমাগুলোতে তিনি ধর্মীয় চরমপন্থা, নারীর অধিকার এবং সামাজিক নিষেধাজ্ঞার মতো সংবেদনশীল সামাজিক সমস্যাগুলোকে তুলে ধরেন।

জহির রায়হান

বাংলাদেশের ক্ষণজন্মা চলচ্চিত্র নির্মাতা ও কথাসাহিত্যিক। তারা সিনেমার প্রতিবাদী ভাষায় নড়ে গিয়েছিল তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের গদির আসন। বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের অন্যতম পথিকৃৎ তিনি। ‘জীবন থেকে নেয়া’ এবং ‘স্টপ জেনোসাইড’র মতো চলচ্চিত্রের জন্য তখন বাংলার ঘরে ঘরে পৌঁছে গিয়েছিলেন তিনি। ‘জীবন থেকে নেয়া’ ছবিতে প্রতীকী কাহিনির মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের স্বৈরাচারী শাসনকে চিত্রিত করা হয়েছিল। যা জনগণকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে উদ্বুদ্ধ করে। ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধেও তিনি ছিলেন সম্মুখ সারিতে। ১৯৬১ সালে তার পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র ‘কখনও আসেনি’ মুক্তি পায়। তারপর একে একে তিনি নির্মাণ করেন ‘কাজল’, ‘কাঁচের দেয়াল’, ‘বেহুলা’, ‘আনোয়ারা’, ‘সঙ্গম’ ও ‘বাহানা’।

তারেক মাসুদ

তিনি ‘সিনেমা ফেরিওয়ালা’ নামে পরিচিত। তার স্বল্পদৈর্ঘ্য এক একটা সিনেমা যেন জীবন্ত ইতিহাসের স্বাক্ষী। ‘নর সুন্দর’ স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবিটা দেখেননি এমন মানুষ হয়তো খুঁজে পাওয়া কষ্টসাধ্য। ‘মানুষ মানুষের জন্য’ সেøাগানের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত হয়েছিল এটি। মাটির ময়না (দ্য ক্লে বার্ড)-এর জন্য আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেছিলেন তিনি। যা কান চলচ্চিত্র উৎসবে ফিপ্রেসকি পুরস্কার জিতেছিল। তার সিনেমাগুলো প্রায়শই বাংলাদেশের সামাজিক-রাজনৈতিক ইতিহাস ও জীবন ঘনিষ্ঠ গল্পকে কেন্দ্র করে নির্মিত হতো।

হুমায়ূন আহমেদ

কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন, ‘এমন জীবন তুমি করিবে গঠন, মরণে হাসিবে তুমি/কাঁদিবে ভুবন’ যার ভাব অর্থ ‘সেই ধন্য নরকুলে’ যার আপন কর্ম দ্বারা জগৎ জানে। হুমায়ূন আহমেদ তেমনই একজন যিনি তার সৃষ্টিশীল কর্ম দিয়ে বেঁচে থাকবেন প্রতিটি বাঙালীর হৃদয়ে। তার মতো মানুষ পৃথিবীর বুকে শত সহস্র বছরে একজন জন্মগ্রহণ করেন। গল্প বলার ধরন, সদাচরণ এবং বুদ্ধিবৃত্তিক কর্ম দিয়ে তিনি নাম লিখিয়েছেন অমর শিল্পী তালিকায়। তার সিনেমাগুলোতে শহর ছেড়ে গ্রামের সৌন্দর্য এবং দৈনন্দিন জীবনের চিত্রায়ণ প্রধান্য পেয়েছিল। গ্রামবাংলার মেঠোপথ আর সাধারণ মানুষ ছিল তার সিনেমার প্রাণ। হুমায়ূন আহমেদের উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রর মধ্যে অন্যতম ‘আগুনের পরশমণি’ এবং ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’।