‘এক পা হারাইছি, মনোবল হারাইনি’

রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটো) বা পঙ্গু হাসপাতাল। এই হাসপাতালে সচারচর সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের ভর্তি করানো হয়। কিন্তু হাসপাতালটির সাম্প্রতিক চিত্র এখন পুরোই ভিন্ন। হাসপাতালটির প্রত্যেকটি ইউনিটে এখন রোগীদের বাড়তি চাপ। বিশেষ করে হাসপাতালটির নিচতলার ক্যাজুয়ালিটি-২ এর ৫৬টি বেডের সব কয়েকটিতেই কোটা সংস্কার আন্দোলনে গুলিবিদ্ধরা চিকিৎসা নিচ্ছেন। গুলির আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হওয়ায় কারোর পা কেটে ফেলা হয়েছে, আবার কারও পায়ে লাগানো হয়েছে লোহার রড। আবার পুলিশের গুলিতে কারও হাড় ভেঙে টুকরো হয়ে গেছে। গুলিবিদ্ধরা এখনো অসহনীয় যন্ত্রনা নিয়ে হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছেন।

গুলিবিদ্ধ অনেকের যখন ড্রেসিং করানো হচ্ছে তখন তাদের আত্মচিৎকারে হাসপাতালের পরিবেশ ভারী হয়ে উঠছে। আজ মঙ্গলবার (২০ আগস্ট) দুপুর ১টার দিকে শেরেবাংলা নগরের জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটো) বা পঙ্গু হাসপাতাল গিয়ে ঠিক এমন চিত্র চোখে পড়েছে। 

হাসপাতালটির নিচতলার ক্যাজুয়ালিটি-২ এর জি-২৪ নম্বর বেডে শুয়ে আছেন ১৯ বছর বয়সী মো. রাকিব হোসেন। নারায়নগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের পাইনাদি প্রি-ক্যাডেট স্কুলের নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থী। গত ২০ জুলাই সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলনে নারায়নগঞ্জের চিটাগাং রোডে অংশ নেয়। সেই রাকিবের বাম পায়ে গুলি লাগে। উপস্থিত সহপাঠীরা গুলিবিদ্ধ অবস্থায় রাকিবকে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাকে ঢাকা মেডিকেলে পাঠানো হয়। ঢাকা মেডিকেলে অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় তার সহপাঠীরা নিয়ে যান জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে। সেখানে কিছু পরীক্ষা করানোর পর রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর) বা পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়।

 

পঙ্গু হাসপাতালে গত ২২ জুলাই দুপুরে মো. রাকিবের বাম পা কেটে ফেলা হয়। সেদিন হতেই হাসপাতালটির নিচতলার ক্যাজুয়ালিটি-২ এর জি-২৪ নম্বর বেডে কাটা পায়ের চিকিৎসা চলছে। পা হারানো রাকিবের দেখাশুনা করছেন তার মা রিনা বেগম। সেখানেই কোটা সংস্কার আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে এক পা হারানো রাকিবের সঙ্গে কথা হয়েছে দেশ রূপান্তরের।

তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত ২০ জুলাই স্কুলের বন্ধুরা মিলে নারায়নগঞ্জের চিটাগাং রোডে কোটা সংস্কার আন্দোলনে যাই। ওইদিন সকাল থেকেই পুলিশ আমাদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে থাকে। তবুও শিক্ষার্থীরা আন্দোলন চালিয়ে যায়। আন্দোলনের এক পর্যায়ে পুলিশ গুলি করতে করতে এগিয়ে আসলে আমরা পালিয়ে যাই। পরে আবার আমরা এগুতো থাকলে হঠাৎ একটি গুলি আমার বাম পায়ের হাঁটুর নিচে লাগে। গুলি লাগার সঙ্গে সঙ্গেই প্রচুর রক্ত ঝড়তে শুরু করে। তখন মনে হচ্ছিলো আমি আর বাঁচবো না। পরে আমার পাশে থাকা বন্ধুরা একটি রিক্সায় করে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যায়। তারপর স্বভাবত আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। পরে জানতে পারি আমাকে অ্যাম্বুলেন্স করে ঢাকা মেডিকেলে নেওয়া হয়।’

ওই সময়ের পরিস্থিতির ভয়াবহতা মনে করতেই চোখে পানি আসে রাকিবের। কান্নাজড়িত কন্ঠে দেশ রূপান্তরকে আরও বলেন, ‘আমি তো বেঁচে আছি, কিন্তু এই আন্দোলনে আমাদের অনেক ভাই শহীদ হয়েছেন। আমার মতো অনেকের পা কেটে ফেলতে হয়েছে। আমরা কখনোই আর স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবো না। তাই নতুন সরকারের চাওয়া যারা আমাদের এই পরিস্থিতি করেছে তাদের উপর্যুক্ত শাস্তি হোক। দেশে শান্তি নেমে আসুক, এতেই আমাদের আত্মত্যাগ সফল হবে। এক পা হারায়ছি কিন্তু মনোবল হারায়নি।’

গত ২১ জুলাই থেকে আজ পর্যন্ত রাকিবের দেখাশুনা করছেন তার মা রিনা বেগম। গত ৫ আগস্ট পর্যন্ত ছেলের চিকিৎসা নিয়ে নানা হয়রানির মধ্যে পড়তে হয়েছে তাকে। এমনকি চিকিৎসার সকল ব্যয়ভার করতে হয়েছে। কিন্তু নতুন সরকারের ঘোষণার পর বর্তমানে হাসপাতালের পক্ষ থেকে ফ্রি চিকিৎসা ও ওষুধের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

রিনা বেগম দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত ২০ জুলাই আমার ছেলের বন্ধুরা মোবাইল ফোনে জানায় রাকিবের পায়ে গুলি লাগছে, তাকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এই খবর শুনার পর আমরা ঢাকার আসার জন্য অ্যাম্বুলেন্স খুঁজতে থাকি। কিন্তু ওইদিন রাতে অনেক অনুরোধের পরেও কোনও অ্যাম্বুলেন্স চালক ঢাকায় যেতে রাজি হয়নি। পরের দিন ভোরে আমরা পঙ্গু হাসপাতালি আসি। এসে দেখি তার বন্ধুরা তখনও তার সঙ্গে আছে। গত ২২ জুলাই আমার ছেলের পা কেটে ফেলা হয়েছে। সরকার পতনের আগ পর্যন্ত আন্দোলনে আহত কিংবা শিক্ষার্থী পরিচয় দেওয়া যেতো না।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘শেখ হাসিনা যেভাবে অর্ডার দিয়ে গুলি করাইছে, যারা করছে তাদের বিচার যেন আল্লাহই করে। আমি কার কাছে বিচার চাইলে বিচার পামু জানিনা। তাই আমি আল্লাহ কাছে বিচার দিয়েছি। আমার সন্তান এক মাস ধরে হাসপাতালে বসে কষ্ট পাচ্ছে। আমার ছেলের মতো অনেক মায়ের সন্তান এখন হাসপাতালে কাতরাচ্ছে, আবার অনেকে মারা গেছে। শেখ হাসিনা অন্যায়ভাবে আমাদের সন্তানদের হত্যা করতে গুলির নির্দেশ দিয়েছিলো। তাই ওর বিচার আল্লাই করছে। নতুন সরকারের আমাদের প্রত্যাশা একটাই তারা যেন আহতদের পাশে দাঁড়ায়। এই দেশে যেন জুলাই -আগস্ট মাসের পুনরাবৃত্তি না ঘটে। যে মাসে শত শত মায়ের বুক খালি হয়েছে।’   

জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর)’র পরিচালক অধ্যাপক কাজী শামীম উজ্জামান বলেন, আমাদের এখানে ভর্তি হওয়া রোগীদের সকলের খরচ আমরা বহন করছি। আমাদের এখানে বর্তমানে ১৪৪ জন রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ, অপারেশন সব আমরা বিনামূল্যে দিচ্ছি। যারা গুরুত্বর আহত তাদেরকে আমার ভর্তি করে চিকিৎসা দিচ্ছি। আমরা এসব রোগীদের জন্য ডেডিকেটেড একটা ওয়ার্ড করেছি।