আমরা যারা বিদেশে থাকি, তাদের প্রতিদিনকার আলোচনার প্রধান বিষয় থাকে দেশের চলমান ঘটনা। সেটা বাংলাদেশি বা বিদেশি যাদের সঙ্গেই আড্ডা হোক। এসব আড্ডায় আমার আমেরিকান বন্ধুদের কেউ কেউ প্রশ্ন করেন, বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে তার দেশের মানুষের পার্থক্য কী। এর উত্তরে আমি তাদের যা বলি তা এক কথায়, তোমরা বেশি মস্তিষ্ক নির্ভর, আর আমরা বেশি হৃদয় নির্ভর।
জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে আগস্টের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত আমার সঙ্গে প্রতিদিনকার আড্ডায় আমরা যে আবেগপ্রবণ এক জাতি তা তারা টের পেয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই তারা আপডেট জানছিল। বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা একটা ন্যায্য আন্দোলনে নেমেছে। কিন্তু সরকার তাদের বিরুদ্ধে দলীয় ছাত্র সংগঠন ও পুলিশ লেলিয়ে দিয়েছে। পুলিশ গুলি চালিয়ে শত শত শিক্ষার্থীকে হত্যা করেছে। প্রতিবাদে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীসহ দেশের সাধারণ মানুষ তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে, আন্দোলন রূপ নিয়েছে গণ-অভ্যুত্থানে। শিক্ষার্থীরা এক দফা দাবি দিয়েছে সরকার পতনের। তা নৃশংসভাবে দমনের চেষ্টা করেছে সরকার। তাতে লাশের সংখ্যা বেড়েছে। শিক্ষার্থী-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের এক পর্যায়ে সরকারপ্রধান দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন।
গণআন্দোলনের এসব দিনে আমার চব্বিশ ঘণ্টা কাটত মোবাইল ফোনে চোখ রেখে, ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে আর আমেরিকান বন্ধুরা এলে তাদের এসব গল্প শুনিয়ে। আগস্টের দুই, তিন ও চার তারিখ আমি যখন তাদের বলেছি, আমাদের জুলাই মাস এখনো চলছে। এসব তারিখ আমাদের কাছে এখন ৩১, ৩২, ৩৩, ৩৪... জুলাই। তখন তারা সায় দিয়েছে উপলব্ধি করেছে, বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ের জোর।
আমার কাছে তারা শুনেছে, গণআন্দোলনে শরিক হয়েছে অনেক স্কুল শিক্ষার্থীও। তাদের মধ্যে প্রায় অর্ধশত শিশু প্রাণ হারিয়েছে পুলিশের ছোড়া গুলিতে। গুলি ছোড়া হয়েছে হেলিকপ্টার থেকেও। চার বছরের শিশু আহাদের চোখ দিয়ে গুলি ঢুকে মাথায় আটকে ছিল। ছাদে খেলতে গিয়ে মাথায় গুলি লাগে ছয় বছরের রিয়া মনির। জানালা বন্ধ করতে গিয়ে গুলিতে মারা যায় ১১ বছরের সামির। রাবার বুলেটে নিহত স্কুলছাত্র তাহমিদের লাশেও গুলি লাগার খবর শুনে বন্ধু জ্যাকব আমার কাছে জানতে চেয়েছে, তোমাদের দেশের লোকজনের কাছে অস্ত্র নেই? এটা তো যুদ্ধ। তারা কেন অস্ত্র নিয়ে প্রতিরোধ করছে না, গুলি চালাচ্ছে না? আমি তখন বলেছি, আমাদের মানুষের কাছে আগ্নেয়াস্ত্র নেই। তারা গুলির বিরুদ্ধে লড়াই করছে খালি হাতে। আগ্নেয়াস্ত্রের বিরুদ্ধে তারা কাজে লাগাচ্ছে একতার সাহস।
গণ-অভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর নানা ঘটনা ঘটছে। অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছে। এর মধ্যে কিছু ইতিবাচক ও কিছু নেতিবাচক ঘটনা ঘটেছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে কেউ কেউ সদ্য ক্ষমতা হারানো আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বাড়ি-ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা করেছেন। কোথাও কোথাও আগুন দেওয়া হয়েছে। এসবের মধ্যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরও রয়েছে। আওয়ামী লীগের অনেকে এসব হামলাকে সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ হিসেবে অনলাইনে প্রচার করেছে। ভারতীয় অনেক সংবাদমাধ্যমও এসব ঘটনাকে অতিরঞ্জিত করে দেখিয়েছে। দেশে অনেক থানা এখন পর্যন্ত ফেরেনি স্বাভাবিক কার্যক্রমে। সরকারের নিপীড়নে সহযোগী অনেক পুলিশ সদস্য পালিয়েছে। প্রায় পুলিশহীন এক দেশে বেশিরভাগ মানুষ ধৈর্য, সম্প্রীতি ও নতুন বাংলাদেশ গড়ার পক্ষেই থেকেছে শেষমেশ।
শিক্ষার্থীরা সড়কে ট্রাফিক কন্ট্রোলের দায়িত্ব পালন করছে। বিভিন্ন স্থানে বাজার মনিটরিংয়ে যাচ্ছে তাদের অনেক গ্রুপ। দেশ জুড়ে চলছে পদত্যাগের হিড়িক। ঢাকার সড়কে প্রতিদিন, নানা দাবি নিয়ে দাঁড়াচ্ছে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। এত এত ঘটনা এখন ঘটছে যে, তাল রাখা যাচ্ছে না।
গত এক মাসে নানা ঘটনার ভিডিও ও ছবি নাড়া দিয়েছে। চোখ ভিজে উঠেছে। এসব ঘটনার মধ্যে সম্প্রতি একটা ছবি সবার হৃদয় স্পর্শ করেছে। ঢাকার বিএএফ শাহীন কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী শাফিক উদ্দিন আহম্মেদ আহনাফ। ২০২৫ সালে যার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল। গত ৪ নভেম্বর শিশু আহনাফ ভয়হীন প্রাণে সড়কে নেমেছিল প্রতিবাদে। দেশ স্বৈরাচারমুক্ত হয়েছে। সহপাঠীরা ফিরেছে শ্রেণিকক্ষে। কিন্তু ফেরা হয়নি আহনাফের। সহপাঠীরা তার আসনে রেখেছে একগুচ্ছ ফুল, যা আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছে আহনাফের আত্মত্যাগ।
আহনাফের মতো এমন শত শত বাবা-মা তাদের সন্তানকে হারিয়েছে এবারের গণ-অভ্যুত্থানে। এর আগে বাংলাদেশের কোনো আন্দোলনে এত প্রাণহানি ঘটেনি। আহনাফের বাবা নাসির উদ্দিন আহমেদ, সন্তানের প্রাণের বিনিময়ে চাচ্ছেন, দেশটা সুন্দর হোক। আর এসব ঘটনা শুনে আমার ভিনদেশি বন্ধু ব্রায়ান যে প্রশ্ন করেছেন আমার মনে হয় তা এখন সব চিন্তাশীল বাংলাদেশিরই প্রশ্ন। তিনি জানতে চেয়েছিলেন, আমরা কীভাবে এসব কিশোর-তরুণের আত্মত্যাগ স্মরণীয় করে রাখব? গণ-অভ্যুত্থানে পাওয়া নতুন বাংলাদেশ আমরা কীভাবে নির্মাণ করব?
এই প্রশ্ন আমাকেও ভাবিয়েছে। মনে হয়েছে, এসব তরুণ প্রাণের আত্মদান যেন নতুন নতুন ঘটনার নিচে চাপা না পড়ে। তারা যেন সংখ্যায় পরিণত না হয়। তাদের প্রত্যেকের নাম, আত্মত্যাগের গল্প, তারা কেমন বাংলাদেশ চেয়েছিল তা যেন বাংলাদেশ জানে। জীবনব্যাপী শোকের মধ্যেও প্রতিটা পরিবার যেন এই অনুভব নিয়ে বাঁচতে পারে, তাদের সন্তান পথে হারিয়ে যায়নি। এখন দেশের সবার চোখে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন। এই অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থান এক অভূতপূর্ব বাংলাদেশ গড়ার যে সুযোগ এনে দিয়েছে, তা যেন কথার কথা না হয়।
লেখক : কবি ও সাংবাদিক
kmisil85@gmail.com