আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট গঠন করে ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসেন শেখ হাসিনা। তারপর টানা ২০২৪ সাল পর্যন্ত সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতায় থেকেছে তার দল আওয়ামী লীগ। এ সময় জোটের সঙ্গীরা কখনো মন্ত্রিসভায় ছিলেন, কখনো সরকারের বাইরে থেকে শেখ হাসিনাকে সমর্থন দিয়ে গেছেন। কিন্তু ছাত্র গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ও প্রধানমন্ত্রিত্ব ছেড়ে শেখ হাসিনা ভারতে চলে যাওয়ার পর জোট সঙ্গীদের কেউ দলটির সঙ্গে নেই। বরং তারা দায় দিচ্ছে আওয়ামী লীগকে।
ইতিমধ্যে ১৪ দলভুক্ত তরিকত ফেডারেশন ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) বিগত সরকারের কোনো অপরাধের দায় নেবে না বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছে।
গত তিন সংসদে বিরোধী দল হিসেবে আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে থাকা জাতীয় পার্টিও এখন দূরে সরে গেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনা সরকারকে যদি জাতীয় পার্টির পাশাপাশি ১৪-দলীয় জোটের শরিক দলগুলো অবৈধভাবে স্বীকৃতি না দিত, তাহলে আজ দেশের এমন পরিণতি নাও হতে পারত। আওয়ামী লীগেরও করুণ পরিণতি হতো না। তারা মনে করেন, শুধু আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা কেন শাস্তির আওতায় আসবেন, তাদেরও শাস্তির আওতায় আনতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাবেক সমাজসেবা সম্পাদক ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম নেপথ্যের নেতা মো. আখতার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শেখ হাসিনার পাশাপাশি গণহত্যার জন্য হাসানুল হক ইনু, রাশেদ খান মেনন ও আনোয়ার হোসেন মঞ্জুদেরও দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। গণভবনে সর্বশেষ ১৪ দলের বৈঠক থেকে ইনু, মেনন ও মঞ্জুরাই ছাত্রদের ওপর সরাসরি গুলি করার পরামর্শ দিয়ে আন্দোলনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শক্তি বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন।’
গত ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গতকাল ২০ আগস্ট পর্যন্ত ২০টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ১৯টি হত্যা মামলা।
ক্ষমতার পট-পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোট ও বিরোধী দল জাতীয় পার্টিকে দৃশ্যপটে দেখা যাচ্ছে না। একাধিক দলের নেতারা আত্মগোপনেও চলে গেছেন। এরই মধ্যে শেখ হাসিনার সঙ্গে জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু ও বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননের নামে হত্যা মামলাও দায়ের করা হয়েছে। তবে গত সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টির কোনো নেতার নামে মামলা এখন পর্যন্ত হয়নি। প্রশ্ন আছে, বিরোধী দল হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও গণতন্ত্র ও জনগণের মঙ্গলে জাতীয় পার্টির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
পর্যালোচনায় উঠে এসেছে, গত দেড় দশক আওয়ামী লীগের মিত্রশক্তি ও জোটসঙ্গী হিসেবে কাজ করেছে ১৪ দল ও মহাজোটের শরিক রাজনৈতিক দলগুলো। তারাই আওয়ামী লীগকে অবৈধভাবে টানা ক্ষমতায় থেকে দেশ পরিচালনায় সহযোগিতার পাশাপাশি স্বীকৃতিও দিয়েছে। পাশাপাশি দিয়েছে বুদ্ধি-পরামর্শও। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ও শেখ হাসিনার দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পর মাঠ-ময়দানে শুধু আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা আন্দোলনকারীদের তোপের মুখে পড়ছেন। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছাত্র-জনতার হাতে হতাহত হয়েছেন কয়েকশ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী। আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায় থেকে তৃণমূলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী আত্মগোপন করেছেন।
বিএনপি ও সমমনা দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারকে সমর্থন করে যাওয়া ও ক্ষমতার সুবিধা নেওয়া বিরোধী দল জাতীয় পার্টি এবং ১৪-দলীয় জোটের শরিক দলগুলোর নেতারা শেখ হাসিনা সরকারকে ‘স্বৈরাচার ও দানব’ হয়ে উঠতে সহযোগিতা করেছেন।
অবশ্য সাবেক বিরোধী দল ও আওয়ামী লীগ জোটের দলগুলোর কয়েকজন নেতার বক্তব্য জানতে কয়েক দফা ফোন করেও তাদের ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে যখন প্রথম শেখ হাসিনা সরকার গঠন করেন, তখন থেকেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে জাতীয় পার্টি (জেপি) চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর সঙ্গে। ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগের সঙ্গে দুই দফা মন্ত্রীও ছিলেন তিনি। এরশাদের জাতীয় পার্টির (জাপা) ছেড়ে আলাদাভাবে দল করেন মঞ্জু। তিনি ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের যোগাযোগমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। পরে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলে যোগ দেয় তার দল জেপি। ২০১৪ সালে দশম সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকারেও মঞ্জু পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। একই মন্ত্রিসভায় মেনন ও ইনুও ছিলেন। সর্বশেষ ২০২৪ সালে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেপি থেকে মঞ্জু ও ইনু সরাসরি নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেও পরাজিত হন। মেনন বিজয়ী হন। শিল্প মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়াও।
শুধু বিরোধী দলে নয়, মহাজোট সরকারেও ছিল জাতীয় পার্টি। এরশাদ প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূতের দায়িত্ব পালন করেন। তার ভাই দলের বর্তমান চেয়ারম্যান ও বিগত সংসদের বিরোধী দল নেতা জিএম কাদেরও সরকারের মন্ত্রী ছিলেন।
১৪ দলের আরেক সমালোচিত নেতা নজিবুল বশর মাইজভান্ডারি। তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান তিনি। এই নেতা আওয়ামী লীগকে বৈধতা দেওয়ার পাশাপাশি জামায়াত নিষিদ্ধের দাবিতে মামলাও করেন। অভিযোগ আছে, জামায়াত নিষিদ্ধ করার জোর প্রচেষ্টা ছিল মাইজভান্ডারির।
নাগরিক ঐক্যের চেয়ারম্যান মাহমুদুর রহমান মান্না দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শেখ হাসিনাকে সবসময় এই ছোট দলগুলোই শক্তিশালী করেছে, বিশ্বের কাছে স্বীকৃতি দিয়েছে। ১৯৯৬ সালে যদি আনোয়ার হোসেন মঞ্জু আর ২০১৪ সালে এরশাদ জাতির সঙ্গে বেইমানি না করতেন, তাহলে দেশবাসীকে বছরের পর বছর স্বৈরাচারের অত্যাচার সহ্য করতে হতো না।’ তিনি বলেন, ‘জিএম কাদের, হাসানুল হক ইনু, রাশেদ খান মেনন, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ও নজিবুল বশররা কোনোভাবেই এ গণহত্যার দায় এড়াতে পারেন না। সারা দেশে যেসব হত্যা মামলা হচ্ছে, সেখানে সহযোগী হিসেবে তাদের নামও আসা উচিত।’