স্বাধীন চারুশিক্ষা নীতির রূপরেখা প্রস্তাব-১

নতুন বাংলাদেশের শিল্পচর্চা এগিয়ে নিতে শিক্ষার্থীবান্ধব একটি স্বাধীন চারুশিক্ষা নীতির রূপরেখা প্রস্তাব করেছেন শিল্পী সোহরাব রাব্বি। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শিল্পকর্মের মাধ্যমে যে ক’জন শিল্পী ডিজিটাল মাধ্যম ও বিদেশের মাটিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন, তিনি তাদের মধ্যে অন্যতম। শিল্পী সোহরাব রাব্বির শিক্ষার্থীবান্ধব একটি স্বাধীন চারুশিক্ষা নীতির রূপরেখা প্রস্তাবনার প্রথম কিস্তি প্রকাশিত হলো আজ বুধবার (২১ আগস্ট)।

লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে চারুশিক্ষার বিদ্যমান কার্যক্রম ও তার পাঠ্যক্রম খুঁটিয়ে দেখলে সহজেই অনুমেয়, শুধুমাত্র স্কিল বা দক্ষতায় প্রাধান্য দিয়ে গড়া এই কলোনিয়াল মনস্তত্ত্বের-চাকরিবাদী, টেকনিক্যাল শিক্ষা কেন সমকালীন সাংস্কৃতিক ও শিল্প চর্চার অনুপযোগী। জাতীয়তাবাদী ধারণা কেন্দ্রে রেখে এরূপ শিক্ষাব্যবস্থা যতদিন চালু থাকবে চারুশিক্ষার বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ, সৃজনশীলতা ও দক্ষতার সুচিন্তিত প্রয়োগ সম্ভব হবে না। একইসঙ্গে প্রায়োগিক জ্ঞানকে সমকালীন সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও বৈশ্বিক জ্ঞানজগতের চর্চার প্রেক্ষিতে ব্যবহারের উপযোগী করে গড়ে তোলা যাবে না। ছাত্রজনতার গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে যখন নানামুখী সংস্কারের দাবি উঠছে, এমন সময়ে শিক্ষার্থীবান্ধব স্বাধীন চারুশিক্ষানীতি ও পাঠ্যক্রমের আমূল পরিবর্তনের কোনো বিকল্প আমাদের সামনে খোলা নেই। 

গত ১০ বছরের ঢাকা, চট্টগ্রাম, জাহাঙ্গীরনগর এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার পাঠ্যক্রম পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, নানা অনুষদে ও বিভাগে পাঠ্যসূচির বা সিলেবাসের খণ্ডিত পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করার প্রয়াস থাকলেও যে চারুশিক্ষা কাঠামোর ও পদ্ধতির ভেতরে এসব পরিবর্তন সংঘটিত হচ্ছে, তাতে করে সেসব পরিবর্তনের ফলাফল শিক্ষার্থীবান্ধব হয়ে হাজির হচ্ছে না কিংবা ভবিষ্যতেও হবার সম্ভাবনাও ক্ষীণ। বাংলাদেশের চারুশিক্ষাকে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা ও লিঙ্গ নির্বিশেষে জনমানুষের বহু সংস্কৃতির নান্দনিক প্রকাশ ও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে দায়িত্বপ্রাপ্ত পূর্বতনদের অনীহা লক্ষ্য করা যায়। এছাড়াও চারুশিক্ষার সুস্পষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের এবং বহুক্ষেত্রে শিক্ষকদের মধ্যেও অস্পষ্ট ধারণা থাকার দরুণ এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে বলে আমি মনে করি। 

উল্লেখ্য, বাংলাদেশে ১৯৪৮ সালে কলকাতায় শিক্ষাপ্রাপ্ত শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের নেতৃত্বে ‘গভর্নমেন্ট আর্ট ইনস্টিটিউট’, ১৯৬৩ সালে ‘পূর্ব-পাকিস্তান চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়’, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ‘বাংলাদেশ চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়’ এবং ১৯৮৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাঠামোর অধীনে ‘চারুকলা ইনস্টিটিউট’, এবং ২০০৮-এ ‘চারুকলা অনুষদ’ হিসেবে বর্তমান অনুষদীয় রূপ পরিগ্রহণ করে। আশ্চর্যজনক শোনালেও চারুশিক্ষানীতির কোনো নিজস্ব সুসংগত রূপরেখা এতো বছরেও প্রণীত হয়নি। এটিও এই উদ্যোগের একটি প্রভাবক। এই সংকট নিরসনে অচিরেই দেশে ও বিদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা চারুশিক্ষার্থী, অভিজ্ঞ ও মেধাবী শিল্পী-শিল্পগবেষক এবং একাডেমিকদের অংশগ্রহণ ও সহযোগীতায় স্বাধীন চারুশিক্ষা নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে অগ্রসর হওয়া জরুরি প্রয়োজন। 

এই প্রকল্পের অংশ হিসেবে নতুন বাংলাদেশের স্বাধীন চারুশিক্ষানীতির একটি খসড়া রূপরেখা আমি কয়েকটি ধাপে প্রস্তাব করব, যার উদ্দেশ্য হবে সকল আগ্রহী চিন্তুক ও গবেষকদের মতামতের মধ্য দিয়ে একটি শিক্ষার্থীবান্ধব স্বাধীন শিল্পশিক্ষানীতির পূর্ণাঙ্গ পরিশীলিত রূপ খুঁজে পাওয়া এবং এর বাস্তবায়নে উদ্যোগ গ্রহণ করা।

বিশ্ববিদ্যিালয় পর্যায়ে চারুশিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে কেমন হওয়া উচিত—

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে চারুশিক্ষা শুধুমাত্র দক্ষ কারিগর তৈরিই নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয়ে পঠিত অপরাপর বিষয়গুলোর সাথে তার যুগপোযোগী আদানপ্রদান, সহাবস্থান, যোগাযোগসেতু এবং নতুন সৃজনশীল জ্ঞান উৎপাদন ও চর্চা পদ্ধতি তৈরীর দিক-প্রদর্শক হিসেবে কাজ করে। তাই যার সৃজনশীল চিন্তা প্রক্রিয়াকে অন্য কোথাও জায়গা দেওয়া যায় না, তিনি শিল্পশিক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসেন। তাই এ সময়ের চারুশিক্ষা চর্চার প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত সমসাময়িক শিল্পকলার সৃজনশীল বৈচিত্রগুলো অনুধাবন করার পাশাপাশি এর সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য জ্ঞান কাণ্ডের সমালোচনামূলক ভাষ্যগুলোর (ক্রিটিকাল ডিসকোর্সের) প্রভাবকে বুঝতে চেষ্টা করা। সমকালীন শিল্পকলার ইন্টারডিসিপ্লিনারি বা শিল্প সৃজনের বিভিন্ন মাধ্যমের আন্তঃসম্পর্কীয় চর্চার বিশাল একটি ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করে একজন শিল্পীর নিজস্ব রেফারেন্স পয়েন্টগুলো খুঁজে পেতে, তার চর্চার পার্থক্য বিন্দুগুলোকে চিহ্নিত করতে এবং এর সৃজনশীল বিকাশ নিশ্চিত করতে সহায়তা করা।  

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চারুশিক্ষার এমন পরিবেশ তৈরি করা, যার লক্ষ্য হবে—

১. একজন শিল্প শিক্ষার্থীকে স্বাধীনভাবে তার আগ্রহের জায়গাকে চিহ্নিত করা, তার চর্চাকে শিখতে এবং নিজস্ব গবেষণা পদ্ধতি তৈরিতে উৎসাহী করা।

২.শিক্ষার্থীকে সমকালীন শিল্পচর্চার প্রতি উৎসাহী ও উদ্দীপ্ত করা যায় এমন শিক্ষার্থীবান্ধব শিক্ষাপদ্ধতি তৈরি এবং সমকালীন শিল্পে যেসব অনন্য সাধারণ প্র্যাকটিশনার আছে তাদের কাজের তাৎপর্য অনুধাবন করতে সচেষ্ট করে তোলা। 

৩. শিক্ষার্থীকে ব্যবহারিক ভাবে কিছু শিল্পকর্ম (বডি অফ ওয়ার্ক) তৈরী করা এবং কাজ নিয়ে সমালোচনামূলক লেখা তৈরীতে সহায়তা করা, যেখানে সে তার সৃজনশীলতার বহিঃপ্রকাশ, উদ্দেশ্য ও বোঝাপড়া লিখিতভাবে প্রকাশের সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। 

৪. কারিগরি দক্ষতা বা স্কিল তৈরীর সুযোগ করে দেওয়া।

৫. তাকে বুদ্ধিবৃত্তিক পরিপক্কতা তৈরীতে সহায়তা করা এবং তার যোগাযোগ দক্ষতার বিকাশ ঘটানোর সুযোগ তৈরী করা । 

৬. এমন একটি দায়িত্বশীল শিক্ষাকাঠামো তৈরি করা হবে যেখানে ব্যক্তিগত উদ্ভাবন এবং ঝুঁকি গ্রহণে শিক্ষার্থীকে উৎসাহী করে তোলা যাবে।

৭. সমসাময়িক সংস্কৃতিতে শিল্পকলার ভূমিকা এবং অনুশীলন সম্পর্কে তাকে সচেতন করে তোলা যাবে।

৮. সর্বোপরি শিক্ষা পরবর্তী সময়ের জন্য এবং পড়াশোনার বাইরেও নিজের উন্নয়নে কীভাবে কাজ করতে হবে তার জন্য প্রস্তুত করা যাবে। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুশিক্ষা, অর্থাৎ বিএফএ এবং এমএফএ সম্পন্ন করার পর প্রতিটি শিক্ষার্থী নিম্নবর্ণিত চার বিভাগের প্রত্যেকটিতে সক্ষমতাগুলো অর্জন করবে। এই দক্ষতাকে কেন্দ্র করেই মান ও এসেসমেন্ট করা হবে। শিক্ষার্থীর এই দক্ষতা  অর্জন করতে প্রয়োজনীয় শিক্ষাকাঠামো, রিসোর্স তৈরি এবং দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ ও কোর্স পরিচালনা বিশ্ববিদ্যালয়কে নিশ্চিত করতে হবে।

সক্ষমতাগুলো হলো:

তত্ত্বজ্ঞান ও বোঝাপড়ার সক্ষমতা

১. সমসাময়িক শিল্পচর্চা বিষয়ে ঐতিহাসিক এবং তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটগুলোর একটি সুসংগত ও বিশদ/গভীর জ্ঞান আয়ত্ব করা;

২. নিজের অনুশীলনের সাথে প্রাসঙ্গিক সমালোচনামূলক এবং তাত্ত্বিক মডেলগুলোর একটি সুস্পষ্ট বোঝাপড়ার প্রমাণ করতে পারা;

৩. তৈরি শিল্পকর্মের মূল বিবেচ্য দিকগুলো এবং এর সাথে জড়িত উদ্বেগগুলোর (কনসার্ন) একটি সুসংগত বোঝাপড়া প্রদর্শন করতে পারা;

বুদ্ধিবৃত্তিক বা কগনেটিভ দক্ষতা

৪. অন্যদের কাজ বিশ্লেষণ, আলোচনা এবং বিতর্কের প্রয়োজনে নিজের গবেষণা ও চিন্তাকে সুস্পষ্টভাবে ও ক্রিটিক্যালি দেখতে পারা;

৫. নিজের প্র্যাকটিস বোঝার এবং বিকাশের জন্য ঐতিহাসিক, তাত্ত্বিক এবং সমসাময়িক চিন্তার মডেলগুলোর সুচিন্তিত, সৃজনশীল ও কল্পনাশক্তির মিশেলে ব্যবহার করতে পারা;

৬. তুখোড় সমালোচনার ভেতর দিয়ে নিজের কাজকে বিবেচনা করতে পারার স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষমতা অর্জন করা;

স্পেশালিস্ট স্কিল বা দক্ষতা

৭. যেসব দক্ষতা আপনার অনুশীলনে সাহায্য করবে এবং বিকাশ ঘটাতে প্রয়োজন তার উপযুক্ত উপায় এবং উপকরণ একত্রিত করা ও শেখা;

৮.  ব্যবহারিক ও কনসেপচুয়াল আইডিয়ার দক্ষতার আত্মবিশ্বাসী প্রয়োগ করতে পারা;

৯. সৃজনশীল ও উদ্ভাবনী সমালোচনা পদ্ধতির ভেতর দিয়ে নিজের কাজ এবং কন্টেম্পোরারি আর্ট এর সম্পর্ক তৈরি করা

হস্তান্তরযোগ্য কারিগরি দক্ষতা এবং অন্যান্য গুণাবলী

১০. একক ও গ্রুপ ভিত্তিক ক্রিটিক বা মিটিংগুলোতে ব্যক্তিগত অধ্যয়ন, অভিজ্ঞতা এবং জ্ঞানের সম্পূর্ণ ও কার্যকর প্রয়োগ বজায় রাখা;

১১. নিয়মিত নিজের কাজ সামষ্টিক পরিসরে উপস্থাপন করা, এর সাথে সম্পর্কিত চিন্তা ও উদ্বেগগুলো স্পষ্টভাবে এবং আত্মবিশ্বাসের সাথে প্রকাশ করা;

১২. শিল্পীর গবেষণা কাজে তথ্য, উপাত্ত ও প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার করা।

শিক্ষাব্যবস্থার রূপরেখা

এই লক্ষ্য অর্জন করতে চারু শিক্ষাব্যবস্থায় বিভাগ ও অনুষদীয় বেড়াজাল ভেঙে দিয়ে ঢেলে সাজাতে হবে । তিনটি ভাগে/মডিউলে এবং অ্যাসেসমেন্ট পারসেন্টেজে চারুশিক্ষাকে পরিচালানা করতে হবে। এটি একটি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত সমকালীন চারুশিক্ষার মডেল।

                       ১. ইন্টারডিসিপ্লিনারি স্টুডিও প্র্যাকটিস  (৬০%) 

                       ২. ক্রিটিক্যাল স্টাডিস (৩০%)

                       ৩. প্রফেশনাল প্র্যাকটিস ও ওয়ার্কশপ (১০%)

১.স্টুডিও প্রাকটিস

স্টুডিও প্র্যাকটিস চারুশিক্ষার কেন্দ্রবিন্দু ও শিল্পীকে তার নিজের শিল্প চর্চার আপন ভুবন খুঁজে নিতে প্রধান সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এখানেই শিল্পী তার সেল্ফ লার্নিং প্রক্রিয়া এবং সহপাঠীদের (peer learning) সাথে চর্চা ও জ্ঞানের আদান-প্রদান করে আপন সত্ত্বার বিকাশ করতে সাধন করে এবং নিজস্ব প্রকাশভঙ্গী তৈরি করে। তাই প্রথম বর্ষে সকল শিক্ষার্থীকে স্বাধীন বা ওপেন ডিসিপ্লিনারি প্র্যাকটিসের ও নিরীক্ষার সুযোগের ভেতর দিয়ে তার আগ্রহের জায়গা এবং প্রতিশ্রুতিশীল মাধ্যম নির্বাচন করতে সহায়তা করা হবে। কিন্তু তাকে ওই মাধ্যম বা মিডিয়ায় আবদ্ধ না করে তার আগ্রহ, দক্ষতা ও উদ্বেগগুলোকে স্বাধীনভাবে চর্চা করতে দেয়া হবে যাতে করে পরবর্তী বছরগুলোতে সে নিজস্ব প্রকাশভঙ্গী, নিজস্ব দক্ষতা, কর্ম ও গবেষণা পদ্ধতি আবিষ্কারের ভেতর দিয়ে নিজস্ব চর্চা-পদ্ধতি তৈরি করে নিতে স্বক্ষম হয়। প্রতিটি শিক্ষার্থীকে একটা ক্লাসে স্টুডিও স্পেস প্রদান করা হবে। প্রতিটি শিক্ষক এখানে মেন্টর বা গুরুর ভূমিকা পালন করবে এবং তার প্রতি আগ্রহী শিক্ষার্থীদের নিয়ে মাধ্যম ও প্রকরণ নির্বিশেষে একটি ক্লাস গঠিত হবে। প্রতিটি মেন্টরের অধীনে একটি স্টুডিও থাকবে যেখানে শিক্ষার্থীরা সার্বক্ষণিক কাজের সুযোগ পাবে। যে কোনো শিক্ষার্থী দ্বিতীয় বর্ষ থেকে বিষয় ভিত্তিক মেন্টরের অধীনে স্টুডিওতে যুক্ত হবে। প্রতি সেমিস্টার বা বছর শেষে তার চর্চার প্রয়োজনে আলোচনা সাপেক্ষে মেন্টর পরিবর্তন করতে পারবেন এবং পছন্দের অন্য মেন্টরের স্টুডিওতে ট্রান্সফার ও কাজ করতে পারবেন। গ্রুপ সাইজ নির্ধারিত হবে স্টুডিও স্পেসের এভেইলেবিলিটির ওপর নির্ভর করে।

২. ক্রিটিক্যাল স্টাডিজ

ক্রিটিক্যাল স্টাডিজ হলো চর্চিত শিল্পকলার সাথে, নৃবিজ্ঞান, ইতিহাস, ফিলোসফি, আরকিওলজি, রাজনীতি, প্রতিবেশ, যুদ্ধনীতি, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও বৈশ্বিক সম্পর্ক বিনির্মাণ করে সেল্ফ এক্সপ্রেশন তৈরির জ্ঞানতত্ত্ব। ক্রিটিকাল স্টাডিজ শিল্প ও সাংস্কৃতিক নির্মাণের বিস্তৃতি ও বৈচিত্র্যময়তার ক্ষেত্র অন্বেষণ করতে সাহায্য করে; তাদের উপস্থাপন ও যোগাযোগের বিভিন্ন ফর্মের মাধ্যমে শিল্প ও সাংস্কৃতিক চর্চার উপাদানগুলোকে স্পষ্ট করে তুলতে সহায়তা করে। এই সমালোচনামূলক অধ্যয়ন শিল্পীর কনসেপচুয়াল এবং ব্যবহারিক জ্ঞানকে বিভিন্ন এপ্রোচ, মেথডোলজি এবং ডিসকোর্সের ভেতর দিয়ে একত্রিত করতে সহায়তা করে। শৈল্পিক ও সাংস্কৃতিক চর্চার ধারণাগুলো একটা সতত পরিবর্তনশীল নেটওয়ার্কের অংশ, তাই এই পাঠ্যক্রম এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে শিল্পশিক্ষার ওপর এই পরিবর্তনশীলতার যতগুলো অভিঘাত আছে সবগুলোকেই আলোচনায় আনা যায় এবং প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য যেটি গুরুত্বপূর্ণ তা সে বেছে নিতে পারে। বর্তমানে ঘটমান যে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চ্যালেঞ্জগুলো আমাদের সামনে আছে, তা কীভাবে বাস্তবতাকে প্রভাবিত করছে—তা ঔপনিবেশিকতা থেকে দ্রুত পরিবর্ধণশীল ডিজিটাল টেকনোলজি বা প্রতিবেশ বা ক্লাইমেট যাই হোক না কেনো শিল্পীকে এসব ব্যাপারে অবগত করাই ক্রিটিকাল স্টাডিজের কাজ।

এই মডিউলের প্রথম বর্ষে শিক্ষার্থীরা লেকচার, সেমিনার ও মিউজিয়াম ভিজিটের মধ্য দিয়ে বেসিক শিল্পকলার ইতিহাস ও তাদের প্রয়োগ নিয়ে জানবে। বেসিক শিল্পকলার ম্যাটেরিয়াল টেকনিক সম্পর্কে জানবে ও নিজের চর্চায় প্রয়োগের চেষ্টা চালাবে। দ্বিতীয় বর্ষে ক্রিটিক্যাল স্টাডিজ সেমিনার, লেকচার, গ্যালারি, মিউজিয়াম ভিজিট করে তাদের অভিজ্ঞতা ও চিন্তা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার এবং প্রতিক্রিয়া জানানোর সুযোগ পাবে-লেকচার ফিডব্যাক সেশনের মাধ্যমে, লিখিত প্রেজেন্টেশন বা নিবন্ধের মাধ্যমে এবং নিজেদের চর্চার মাধ্যমে। তৃতীয় বর্ষে নিজের চর্চার সাথে সম্পর্কিত বিষয় ভিত্তিক সেমিনারে অংশ নিয়ে লিখিত সাবমিশন ও ফিডব্যাকের ভেতর দিয়ে ডিসার্টেশনের খসড়া তৈরী করবে এবং চতুর্থ বর্ষে একক টিউটোরিয়ালের মাধ্যমে পছন্দের শিক্ষকের সাথে ডিসার্টেশন বা গবেষণা সম্পন্ন করবে।

৩. প্রফেশনাল প্র্যাকটিস ও ওয়ার্কশপ

কারিগরি দক্ষতা অর্জন ও আর্টওয়ার্ক প্রোডাকশনের জন্য বর্তমান কারিগরি শিল্প শিক্ষাকে ঢেলে সাজিয়ে ওয়ার্কশপ ভিত্তিক ফরম্যাটে নিয়ে আসতে হবে। এতে করে প্রত্যেক শিক্ষার্থী তার পছন্দের মাধ্যম বেছে নিয়ে সেই টেকনিক্যাল স্কিল অর্জন করতে পারবে এবং নিজ নিজ চর্চায় প্রয়োগ করতে পারবে। দক্ষ কারিগরদের এনে প্রতি সেমিস্টার এর শুরুতে ওয়ার্কশপের আয়োজন করতে হবে এবং নিম্নোক্ত ওয়ার্কশপগুলোর প্রত্যেকটিতে দুইজন কারিগরি দক্ষতা সম্পন্ন ওয়ার্কশপ লিডার নিয়োগ দিয়ে পরিচালনা করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা সারা বছর নানা মাধ্যমে আর্টওয়ার্ক তৈরি করতে পারে।     
    
১. কাঠ কর্মশালা
২. মেটাল কর্মশালা
৩. প্রিন্ট মেইকিং কর্মশালা
৪. সিরামিক ও প্লাস্টার কর্মশালা 
৫. ডিজিটাল প্রিন্টিং কর্মশালা
৬. ক্রাফ্ট ও বয়ন কর্মশালা
৭. থ্রি-ডি প্রিন্টিং কর্মশালা
 ৮. অডিও ও ভিডিও প্রসেসিং কর্মশালা 

এছাড়াও বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা অর্জনের লক্ষ্যে জলরং, তেলরং, ডিজিটাল ড্রইং কিংবা নানা রকম কাস্টিং কর্মশালা আয়োজন ও নির্মাণ করা যেতে পারে ছাত্রদের প্রয়োজন অনুসারে। প্রফেশনাল প্রেজেন্টেশন, পোর্টফোলিও তৈরি, নানা প্রায়োগিক জায়গায় আন্তর্জাতিক মানের অ্যাপ্লিকেশন তৈরির ওয়ার্কশপ ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিশিষ্ট শিল্পীদের আর্টিস্ট-টক এর ব্যবস্থা করতে হবে।

এই কিস্তিতে সংক্ষেপে স্বাধীন চারুশিক্ষা নীতির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে কথা বললাম ও কি উপায়ে একটি নতুন শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ন করা যাবে তা নিয়ে সংক্ষিপ্ত ইঙ্গিত প্রদান করলাম। পরবর্তী কিস্তিতে যথাক্রমে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিল্প শিক্ষার্থী বাছাইয়ের পোর্টফোলিও মেথড, এই ব্যবস্থার আউটকাম, স্টুডিও প্র্যাকটিস, ক্রিটিকাল স্টাডিস, প্রফেশনাল প্র্যাকটিস এবং এই ব্যবস্থায় ৩৬০ ক্রেডিট বিন্যাস ও অ্যাসেসমেন্ট প্রক্রিয়া এবং চারু শিক্ষায় শিক্ষক নিয়োগের স্বচ্ছ প্রক্রিয়া নিয়ে সবিস্তারে আলাপ করব। অংশীজনদের মতামত ও দিকনির্দেশনা মূলক মন্তব্য আশা করছি। সে সব আমলে নিয়ে রিভিউ করা হবে এবং ভবিষ্যতে পরিমার্জন করা হবে।

সোহরাব রাব্বি

লেখক: শিল্পী সোহরাব রাব্বির শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হয়েছে দেশ ও পাশ্চাত্যের গুরুত্বপূর্ণ মিউজিয়াম ও প্রদর্শনশালায়। তিনি গোল্ডস্মিথস, ইউনিভার্সিটি অব আর্টস লন্ডন (যুক্তরাজ্য) এবং ইউনিভার্সিটি অব ফাইন আর্টস, হামবুর্গে (জার্মানি) শিল্পকলা ও প্রতিবেশ বিষয়ক গবেষণা করছেন, অংশগ্রহণ করেছেন একাডেমিক কারিকুলাম তৈরি ও শিক্ষক নিয়োগ কার্যক্রমেও।  sohorabrabbey@gmail.com