বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের পদত্যাগের হিড়িক পড়েছে। শেখ হাসিনা পালিয়েছেন, নতুন জাতীয় সরকার গঠন হয়েছে। তাহলে উপাচার্যরা পালাবেন, মানে পদত্যাগ করবেন কেন? কারণ খুব সহজ। তারা যতটা না ওই সব প্রতিষ্ঠানের তার থেকে বেশি শেখ হাসিনা বা তার দলের। এমনটা কি হওয়ার কথা ছিল? এসব দলকানা উপাচার্য তাদের প্রতিষ্ঠানে উন্নয়নে বিশেষ করে শিক্ষা-গবেষণার কী হাল করেছেন, তা বলাই বাহুল্য।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা এবং গবেষণার ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করবে কি না, তা মোটা দাগে নির্ভর করে শিক্ষক এবং ছাত্রদের সৃষ্টিশীল মেধা চর্চার মাধ্যমে। মেধার উপস্থিতি এবং মেধা চর্চার সুযোগ, এই দুইয়ের সমন্বয় না হলে বিশ্ববিদ্যালয়ে সৃষ্টিশীল মেধা চর্চার সুযোগ থাকে না, অর্থাৎ শিক্ষা এবং গবেষণার সাফল্য স্তিমিত হয়ে যায়। একটা কথা বলে রাখা দরকার, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা ও গবেষণার পরিধি এবং ব্যাপ্তি কী হতে পারে, সে একটা ভিন্ন আলোচনা। সেই আলোচনা পাশে রেখে, বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক পরিবেশে মেধার উপস্থিতি এবং মেধা চর্চার সুযোগ কতটুকু ছিল তা প্রশ্নসাপেক্ষ। দলকানা উপাচার্য এবং শিক্ষক, দলীয় ছাত্ররাজনীতি এবং সর্বোপরি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে একই সঙ্গে স্থানীয় এবং দলকানা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাপট একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা-গবেষণার মানকে কীভাবে ব্যাহত করে, তার একটি বিশ্লেষণ করা যাক।
দলকানা উপাচার্য
প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন উপাচার্য সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী। একজন উপাচার্যের অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা এবং সর্বোপরি দেশে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শিক্ষক এবং গবেষক হিসেবে সুনাম তার বিশ্ববিদ্যালয়ের সফল পরিচালনার জন্য অপরিহার্য। একজন উপাচার্য তার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা এবং গবেষণার সর্বোচ্চ সুযোগ নিশ্চিত করবেন, এটাই তার প্রধান দায়িত্ব। এক কথায়, উপাচার্যের কর্মনীতি এবং কার্যক্রমের মধ্যেই নির্ভর করে বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধার উপস্থিতি এবং সৃষ্টিশীল মেধা চর্চার পরিবেশ। সন্দেহ নেই যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালনার ক্ষেত্রে উপাচার্যের সঙ্গে সরকারের সুসম্পর্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু এর অর্থ এই না যে, উপাচার্যকে একটি সরকারের রাজনৈতিক ইশতেহারের মুখপাত্র হয়ে কাজ করতে হবে। অর্থাৎ রাজনৈতিক মতাদর্শ দিয়ে পরিচালিত একজন উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার মূল দায়িত্ব পালনে যে ব্যর্থ হবেন, এটাই স্বাভাবিক।
একজন দলকানা উপাচার্য, শিক্ষক নিয়োগ কিংবা ছাত্ররাজনীতির ক্ষেত্রে পক্ষপাতদুষ্ট পৃষ্ঠপোষকতা করে একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে কীভাবে কলুষিত করে তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখানোর প্রয়োজন নেই। সুতরাং এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত হবে। উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে বাদ দিয়ে তার অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা ও সর্বোপরি দেশে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শিক্ষক ও গবেষক হিসেবে সুনামকে বিবেচনায় আনা জরুরি।
দলদাস শিক্ষক নিয়োগ
দলীয়করণের মন্ত্রণায় দলকানা উপাচার্য শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধার তুলনায় দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতাকে প্রাধান্য দেয় তার অসংখ্য উদাহরণ দেওয়া যাবে। রাজনৈতিক মদদপুষ্ট এসব শিক্ষক রাজনৈতিক দলের চাটুকারিতার মাধ্যমে ‘হালুয়া-রুটির’ ভাগ নিতে অর্থাৎ পদ-পদবির জন্যই ব্যস্ত থাকেন। শিক্ষা বা গবেষণায় তাদের ভূমিকা নামমাত্র। সর্বোপরি গণবিরোধী রাজনৈতিক কর্মকান্ডের বিবেচনায় বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক শিক্ষকদের অবস্থান সাকল্যে দেশের স্বার্থবিরোধী। ২০২৪ সালের এই ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের একটি জ্বলন্ত উদাহরণ।
বলাই বাহুল্য, বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর আন্তর্জাতিক মানের গবেষণায় বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কর্মরত শিক্ষকদের অবদান নিতান্তই নগণ্য। হাতেগোনা কয়েকজন শিক্ষক ব্যতিরেকে দেশে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় অধিকাংশ শিক্ষকদের কোনো ভূমিকা নেই। এর একটি প্রধান কারণ হচ্ছে, ওই সব রাজনৈতিক শিক্ষকরা গবেষণা থেকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেই নিজেদের নিয়োজিত রাখাকে লাভজনক মনে করেন। শিক্ষকদের দলীয় রাজনৈতিক উপস্থিতি বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধা চর্চাকেই শুধু ব্যাহতই করে না, উপরন্তু উপেক্ষিত মেধাবীরা দেশের সার্বিক উন্নয়নে কোনো ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হন এবং অনেক ক্ষেত্রে দেশত্যাগ করতেও বাধ্য হন।
যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গতানুগতিক ধারায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের প্রচলন বন্ধ করা উচিত হবে। প্রচলিত ধারায় কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য স্নাতকোত্তর পাস করা ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার রেওয়াজ এক ধরনের অলিখিত আইনে পরিণত হয়েছে। এই রেওয়াজের পরিবর্তন আনতে হবে। এ ছাড়া শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু স্নাতকোত্তর ডিগ্রির পরিবর্তে ন্যূনতম পিএইচডি ডিগ্রি থাকার বাধ্যবাধকতা থাকা প্রয়োজন। মেধা এবং অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগের জন্য অন্তর্বর্তী জাতীয় সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
ছাত্ররাজনীতি
জাতি বা রাষ্ট্র হিসেবে রাজনীতিতে বাংলাদেশ নামক এই ভূখণ্ডের স্বাধীনতার পূর্বে এবং পরে ছাত্রসমাজের ভূমিকা ঐতিহাসিকভাবেই প্রমাণিত। ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধ আর ৯০-এর দশকে এরশাদের স্বৈরশাসনের অবসান এসব গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে ছাত্রসমাজের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসের ছাত্রদের নেতৃত্বে গণ-অভ্যুত্থান। বলা বাহুল্য, বিগত কয়েক বছরে সরকারি দলের ছাত্র সংগঠনের দানবীয় দাপটে ছাত্রছাত্রীদের মুক্ত রাজনৈতিক চিন্তা প্রকাশের কোনো সুযোগ ছিল না। উপরন্তু দলীয় ছাত্রদের অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে, এমনকি মৃত্যুবরণও করেছে অনেক মেধাবী ছাত্রছাত্রী। এরই একটি মর্মান্তিক হৃদয়বিদারক উদাহরণ হচ্ছে বুয়েটের আবরার যার কথা যুগ যুগ ধরে মানুষ স্মরণ করবে।
২০২৪ সালের এই গণ-অভ্যুত্থান এটাই প্রমাণ করে যে, একটি রাজনীতিসচেতন ছাত্রসমাজ গঠনে অর্থাৎ ছাত্রছাত্রীদের মাঝে রাজনৈতিক বিচক্ষণতা বিকাশের জন্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা অপ্রয়োজনীয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের কর্মতৎপরতা বা ছাত্রদের রাজনৈতিক সচেতনতা যে এক নয়, তার একটা জ¦লন্ত উদাহরণ হচ্ছে সদ্য ঘটে যাওয়া এই ছাত্র গণ-অভ্যুত্থান। রাজনীতিসচেতন একটি তরুণ সমাজ গড়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের যে প্রয়োজনীয়তা নেই, সেটা নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয়েছে। সুতরাং এই নতুন বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করাই বাঞ্ছনীয়।
দলীয়-স্থানীয় কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং স্থানীয় প্রশাসন
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্তিত্বের মূলে রয়েছে ছাত্রছাত্রী এবং শিক্ষক। ছাত্রছাত্রী এবং শিক্ষকরা আছেন বলেই একটি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠে। একই সঙ্গে ছাত্রছাত্রী এবং শিক্ষকদের অবস্থান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে দাপ্তরিক এবং আনুষঙ্গিক কাজের জন্য নিয়োজিত হন প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং কর্মচারীরা। বিভিন্ন জেলায় স্থাপিত বিশ্ববিদ্যালয়ে এই দাপ্তরিক এবং আনুষঙ্গিক কাজের জন্য কর্মকর্তা এবং কর্মচারী নিয়োগে স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক মদদপুষ্ট এমন অনেক ‘শক্তিশালী’ কর্মকর্তা এবং কর্মচারী বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো বা স্থাপনা তৈরি, ছাত্র ভর্তি থেকে শুরু করে নতুন কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিক্ষক নিয়োগে প্রভাব ফেলে। উপাচার্য এবং শিক্ষকরা অনেক ক্ষেত্রেই তাদের হাতে জিম্মি হয়ে যান। সর্বোপরি রয়েছে দলকানা স্থানীয় প্রশাসনের প্রকাশ্য এবং প্রচ্ছন্ন প্রভাব। এসব রাজনৈতিক প্রভাবের হাত থেকে বিশ্ববিদ্যালয়কে রক্ষা করতে রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে সব শিক্ষকদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা এবং গবেষণার স্বার্থে একমত হয়ে কাজ করা প্রয়োজন।
শেষ কথা
বিগত অনেক বছরে বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলোকে যেভাবে দলীয়করণ করা হয়েছে তা থেকে সহসা মুক্তি পাওয়া সহজ হবে না। তবে ছাত্রদের ডাকে রাজনৈতিক আদর্শ, ধর্ম, পেশা নির্বিশেষে সবার অংশগ্রহণে যদি একটা গণ-অভ্যুত্থান বা গণজাগরণে একটি স্বৈরাচারী সরকারের পতন হতে পারে, তবে সব শিক্ষকের প্রচেষ্টায় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা এবং গবেষণার যথার্থ প্রবেশ ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
দীর্ঘ বিশ বছর দেশের বাইরে শিক্ষকতা করার অভিজ্ঞতা থেকে আমি অসংশয়ে এ কথা বলতে পারি যে, বাংলাদেশের ছাত্রছাত্রীদের মেধা এবং প্রতিভা অতুলনীয়। দেশের বাইরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশ থেকে আসা এবং বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ছাত্রছাত্রীদের সাফল্য এ কথাই প্রমাণ করবে। ‘দ্বিতীয়’ স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মেধার ভিত্তিতে সব নিয়োগের সঙ্গে সঙ্গে মেধাচর্চার পরিবেশ ফিরে আসুক।
প্রসঙ্গক্রমে একটি কথা বলে রাখা প্রয়োজন, ২০২৪ সালের এই গণ-অভ্যুত্থান ছাত্রদের চৌকস এবং দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্বের একটা অর্জন। একই সঙ্গে এ কথাও অনস্বীকার্য যে, দীর্ঘ অনেক বছরের নির্যাতন, বঞ্চনার শিকার লাখ লাখ পরিবারের সদস্যদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, ঘৃণা এবং বিদ্রোহ তাদের এই অর্জনের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল। সুতরাং ছাত্রছাত্রীসহ সব শ্রেণির মানুষের সমর্থনে আমাদের এই স্বপ্ন পূরণ অসম্ভব হবে না।
লেখক: অধ্যাপক, সহযোগী ডিন, ডেন্টাল অনুষদ, মালয় বিশ্ববিদ্যালয় কুয়ালালামপুর, মালয়েশিয়া
m.tariqur.rahman@gmail