নজিরবিহীন বন্যা আক্রান্ত ৩৬ লাখ মৃত্যু ৮

পাহাড়ি ঢল আর অবিরাম বৃষ্টিতে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়েছে দেশের ১২ জেলা ফেনী, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, নোয়াখালী, রাঙ্গামাটি, কক্সবাজার, লক্ষ্মীপুর, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া। সরকারি হিসাবে এসব জেলার ৩৬ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বন্যায় এখন পর্যন্ত আটজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। বিভিন্ন মাধ্যমে পাওয়া তথ্যমতে, কুমিল্লায় চারজন, কক্সবাজারে দুজন এবং ফেনী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একজন করে মারা গেছে।

বন্যাকবলিত এলাকার মধ্যে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি ফেনীর ছাগলনাইয়া, ফুলগাজী ও পরশুরাম উপজেলার। দুর্গতদের সহযোগিতায় উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের পাশাপাশি সহযোগিতার জন্য পৌঁছেছে সেনাবাহিনী ও কোস্ট গার্ড। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে স্বেচ্ছাসেবীরাও যাচ্ছেন সেখানে। দুর্গত এলাকাগুলোতে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। বিঘিœত হচ্ছে মোবাইল নেটওয়ার্ক। ফলে দুর্গতদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক ফ্রি করতে নির্দেশনা দিয়েছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা মো. নাহিদ ইসলাম। অন্তর্র্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বন্যা পরিস্থিতির বিষয়ে সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখছেন এবং তিনি উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে তিনি এ নির্দেশনা দেন।

এদিকে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক শেষে তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, কোনো ধরনের আগাম সতর্কতা ও প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ না দিয়েই বাঁধ খুলে দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে ভারত অমানবিকতার পরিচয় দিয়েছে এবং বাংলাদেশের সঙ্গে অসহযোগিতা করছে। তবে ত্রাণ ও দুর্যোগ উপদেষ্টা ফারুক ই আজম সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলীয় কয়েকটি জেলায় হঠাৎ ভয়াবহ বন্যার কারণ হিসেবে ভারতের বাঁধ খুলে দেওয়ার যে অভিযোগ উঠেছে, সে বিষয়ে দেশটির সঙ্গে যোগাযোগ করছে বাংলাদেশ সরকার। তবে বিষয়টি ভারত সরকারের নজরে এলে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ডুম্বুর বাঁধ খুলে দেওয়াকে বাংলাদেশে বন্যার কারণ বলা হলেও বিষয়টি তথ্যগতভাবে সঠিক নয়।

অন্যদিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ভারতের ত্রিপুরার ধলাই জেলায় গোমতী নদীর ওপর থাকা ডুম্বুর বাঁধের গেট খুলে দেওয়ার কারণে বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোয় সাম্প্রতিক বন্যা পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে বাংলাদেশে এমন একটি উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়েছে। এটা বাস্তবে সঠিক নয়।

এ ছাড়া ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘আমরা উল্লেখ করতে চাই যে, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত গোমতী নদীর অববাহিকা (ক্যাচমেন্ট) এলাকায় কয়েক দিন ধরে এ বছরের সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশে এ বন্যা মূলত বাঁধের ভাটির দিকের বৃহৎ অববাহিকার পানির কারণে ঘটেছে।’

বিদ্যমান বন্যা পরিস্থিতিতে মোবাইল নেটওয়াকের সর্বশেষ অবস্থা ও প্রস্তুতি সম্পর্কে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা মো. নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‘বন্যাদুর্গত এলাকার ১৩ শতাংশ সাইট ডাউন আছে। কয়েকটি উপজেলায় অপটিক্যাল ফাইবার ড্যামেজ হওয়ার কারণে নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন হয়েছে। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন আছে কয়েকটি জায়গায়, সেখানে জেনারেটর ব্যবহার করা হচ্ছে। নেটওয়ার্ক একেবারে বিচ্ছিন্ন হলে ১০টি ভিএসএটি প্রস্তুত আছে। সংশ্লিষ্ট এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক ফ্রি করতে নির্দেশনা দেওয়া আছে।’

আবহাওয়া সংস্থাগুলো তথ্য অনুযায়ী, আগামী ২৪ ঘণ্টায় দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও তৎসংলগ্ন উজানে ভারী বৃষ্টিপাতের প্রবণতা কমে আসতে পারে। এ সময় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের মনু, খোয়াই, ধলাই নদীগুলোর সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি প্রাথমিকভাবে স্থিতিশীল থেকে পরবর্তী সময়ে উন্নতি হতে পারে। এ ছাড়া আগামী ২৪ ঘণ্টায় দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল, পূর্বাঞ্চল ও তৎসংলগ্ন উজানের ভারী বৃষ্টিপাতের প্রবণতা কমে আসতে পারে। এ সময় ফেনী, কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম জেলার মুহুরী, ফেনী, গোমতী, হালদা ইত্যাদি নদীগুলোর সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি প্রাথমিকভাবে স্থিতিশীল থেকে পরবর্তীকালে উন্নতি হতে পারে। এ ছাড়া ব্রহ্মপুত্র-যমুনা ও গঙ্গা নদনদীর পানি কমছে। তবে উত্তর-পূর্বাঞ্চললের সুরমা-কুশিয়ারা নদীর পানি সমতল বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা আগামী ২৪ ঘণ্টা অব্যাহত থাকতে পারে।

ফেনীতে একজনের মৃত্যু, মোবাইল নেটওয়ার্ক ও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন : ফেনীর ফুলগাজী উপজেলায় বন্যার পানিতে ডুবে একজন মারা গেছেন। তবে তার পরিচয় জানা যায়নি। গতকাল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

ফেনীর অধিকাংশ বাড়িতে ঢুকেছে পানি। জেলার একটি বড় অংশ এখন পানির নিচে। বন্যাকবলিত এলাকায় খাবার ও পানির প্রচণ্ড সংকট তৈরি হয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি বিপদে আছে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও শিশুরা। বন্যাদুর্গতদের সহযোগিতায় উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের পাশাপাশি সহযোগিতার জন্য পৌঁছেছে সেনাবাহিনী ও কোস্ট গার্ড। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে স্বেচ্ছাসেবীরাও সেখানে যাচ্ছেন। তবে স্থানীয়দের দাবি, যে পরিমাণ সহযোগিতা প্রয়োজন, সে তুলনায় খুব কমই এখন পর্যন্ত সেখানে পৌঁছেছে। সড়কগুলো পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় দ্রুত স্পিডবোট ও হেলিকপ্টারের মাধ্যমে বন্যাদুর্গতদের উদ্ধারের আবেদন তাদের।

বন্যা পরিস্থিতির কারণে বন্ধ রয়েছে উপদ্রুত এলাকার বিদ্যুৎ সরবরাহ। ফলে অনেকের মোবাইল ফোনের চার্জ শেষ হয়ে যাওয়ার পর আর যোগাযোগ করতে পারছেন না। সেই সঙ্গে বেশ কিছু মোবাইল টাওয়ার বিকল্প উপায়ে চালানোর ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হওয়ায় নেটওয়ার্কেও সমস্যা হচ্ছে। জেলায় বসবাস করা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে দেশের বাইরে ও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কর্মরত মানুষ উদ্বিগ্ন।

ফেনী সদরের ছনুয়া ইউনিয়নের ভাঙা তাকিয়া, কালীদহ ইউনিয়নের মাইজবাড়িয়াসহ সংলগ্ন এলাকায় গতকাল উদ্ধার কার্যক্রম চালিয়েছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের চট্টগ্রাম থেকে যাওয়া একটি দল। দুপুর ২টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ঘুরে দেখা গেছে, ফেনী সদরের ৬ নম্বর কালীদহ, ৭ নম্বর বালিগাঁও, ৯ নম্বর লেমুয়া, ১০ নম্বর ছনুয়া ইউনিয়নের প্রায় সব গ্রাম এখন পানির নিচে। এসব গ্রামের বেশিরভাগ একতলা ঘর তলিয়ে গেছে। ফসলি জমি, পুকুর, রাস্তাঘাট; সবকিছুই ডুবে আছে। কেউ কেউ কলাগাছ দিয়ে ভেলা বানিয়ে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার চেষ্টা করছে। আবার কেউ বুকপানিতে সাঁতরে গন্তব্যে যাওয়ার চেষ্টা করছে।

পানি উন্নয়নের বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের কর্মকর্তা পার্থ প্রতীম বড়–য়া জানান, বিপদসীমার ওপর ১৪টি স্টেশন আছে, সাতটি নদীতে। ৫২টির পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়েছে, ৫৮টিতে কমেছে। বন্যাকবলিত জেলা পাঁচটি মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, কুমিল্লা, ফেনী, চট্টগ্রাম। বন্যাকবলিত নদী হচ্ছে কুশিয়ারা, মনু, ধলাই, খোয়াই, গোমতী, ফেনী, হালদা। তিনি বলেন, ফেনীর রামগর পয়েন্টে গত ২৪ ঘণ্টায় ১৮৬ সেন্টিমিটার পানি বেড়েছে। পানি রয়েছে বিপদসীমার ২১৮ সেন্টিমিটার ওপর। পরশুরামের সঙ্গে আমাদেরও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

কুমিল্লায় ৪ মৃত্যু, বাঁধ ভাঙার আতঙ্ক : কুমিল্লায় বন্যায় এ পর্যন্ত চারজনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে দুজন বন্যার পানিতে তলিয়ে, একজন বৃষ্টির মধ্যে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে এবং একজন মাথায় গাছ পড়ে মারা গেছে।

মৃতরা হলেন নাঙ্গলকোট পৌরসভার দাউদপুর এলাকার কেরামত আলী (৪৫), কুমিল্লা শহরের ছোট এলাকার কিশোর রাফি (১৫), চৌদ্দগ্রাম উপজেলার সোনাকাটিয়া গ্রামের কানু মিয়ার ছেলে শাহাদাত হোসেন (৩৪)। এ ছাড়া লাকসামে পানিতে তলিয়ে মারা যাওয়া শিশুর নাম-পরিচয় জানা যায়নি।

কুমিল্লায় বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে গোমতী নদীর পানি। ভারী বৃষ্টি এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নদীতে পানি এখন থইথই করছে। এতে যেকোনো সময় গোমতী নদীর দুই পাড়ের বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এদিকে গোমতীর চড়ের ফসলাদি পানিতে তলিয়ে গেছে। নদীর চর তীরবর্তী শত শত মাছের ঘের, পুকুর, দীঘি, আউশ ধান, আমনের বীজতলা, শাকসবজিসহ নিম্নাঞ্চলের ফসলাদি তলিয়ে গেছে।

যেকোনো সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কায় জেলা প্রশাসনকে রেড অ্যালার্ট জারি করতে বলেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। গতকাল বিকেল ৫টায় বিপদসীমার ১০৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছিল। পাউবো কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গোমতী নদীর পানি বাড়তে থাকায় ঝুঁকির মুখে পড়েছে বাঁধ। কয়েকটি স্থানে ফাটলও দেখা দিয়েছে। এতে যেকোনো সময় বাঁধ ভাঙার আশঙ্কা রয়েছে। কুমিল্লা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খান মোহাম্মদ ওয়ালিউজ্জামান বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের পাঁচটি টিম বাঁধ পর্যবেক্ষণে গোমতীর পাড়ে অবস্থান করছে। কোথাও কোনো বাঁধে ফাটল দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মেরামত করা হচ্ছে। এ ছাড়া সেনাবাহিনী, জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, সংশ্লিষ্ট এলাকার পুলিশ, জনপ্রতিনিধি, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দারা কাজ করছে।

কুমিল্লার দক্ষিণাঞ্চলের উপজেলা নাঙ্গলকোট, মনোহরগঞ্জ ও চৌদ্দগ্রামের অধিকাংশ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। কুমিল্লা আদর্শ সদর, লাকসাম, বুড়িচং, বরুড়া, দেবিদ্বার, মুরাদনগর ও দাউদকান্দির নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় কষ্টের মধ্যে পড়েছেন এলাকার মানুষ। নাঙ্গলকোট উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা সুরাইয়া আক্তার লাকী জানান, এ উপজেলার প্রায় শতভাগ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। আমরা দুর্গতদের তালিকা করার চেষ্টা করছি। আশ্রয়কেন্দ্রগুলো চালু করা হয়েছে। বন্যাদুর্গতদের ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

এদিকে ডুবে গেছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম ও সদর দক্ষিণ উপজেলার অংশ। এতে চালকরা চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন। পাশাপাশি ১০ কিলোমিটার জুড়ে সৃষ্টি হয়েছে যানজট। মিয়া বাজার হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এসএম লোকমান হোসাইন বলেন, মহাসড়কে পানির কারণে যানবাহন চলাচলে ধীরগতি সৃষ্টি হয়েছে। যানজট নিরসনে হাইওয়ে পুলিশ কাজ করছে।

কুমিল্লার তিতাস উপজেলার তিনটি ইউনিয়ন বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। এতে আটকা পড়েছে অন্তত অর্ধলক্ষাধিক মানুষ। আটকে পড়াদের উদ্ধারে কাজ করছে উপজেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও বিভিন্ন স্বেচ্ছসেবী সংগঠন। দুর্ঘটনার আশঙ্কায় বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে কিছু এলাকায়। তিতাস উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুমাইয়া মমিন জানান, উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের পানিবন্দি মানুষদের আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য মাইকিং করা হয়েছে। স্বেচ্ছাসেবক টিম, স্কাউট টিম কাজ করছে।

বাঁধ ভেঙে আখাউড়ায় বন্যা, একজনের মৃত্যু : বাঁধ ভেঙে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। নতুন করে আরও কিছু গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এর মধ্যে বন্যার পানিতে ডুবে সুবর্ণা আক্তার নামে এক অন্তঃসত্ত্বা নারীর মৃত্যু হয়েছে। গত বুধবার দুপুর ২টার দিকে উপজেলার সদর ইউনিয়নের বীরচন্দ্রপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। সুবর্ণা একই গ্রামের পারভেজ মিয়ার স্ত্রী।

জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মনজুরুল আলম জানান, হাওড়া নদী ও জাজীর খালসহ বিভিন্ন স্থানে পানি বিপদসীমার কাছাকাছি রয়েছে। অতিক্রম করলে আরও নতুন করে এলাকা প্লাবিত হতে পারে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সুশান্ত সাহা জানান, পাহাড়ি ঢলে ১৯৫ হেক্টর শাকসবজির জমি, ১২২ হেক্টর আমনের বীজতলা, ৩৪৪০ হেক্টর রোপা আমন ধানের জমি পানিতে তলিয়ে আছে। দ্রুত পানি সরে গেলে ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা কম। তবে পানি দীর্ঘস্থায়ী হলে ক্ষয়ক্ষতি বাড়তে পারে। এক সপ্তাহ পর ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরি করা হবে।

হবিগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতি অবনতি, ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ : জেলার পাঁচটি উপজেলার ২২টি ইউনিয়ন বন্যাকবলিত হয়েছে। এদিকে লস্করপুরে রেল ব্রিজটি হুমকির মুখে পড়ায় দুপুর ২টা থেকে সারা দেশের সঙ্গে সিলেটের রেল যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। সকাল ৯টায় সিলেট থেকে ঢাকামুখী কালনী আন্তঃনগর এক্সপ্রেস ট্রেন শায়েস্তাগঞ্জ অতিক্রম করে। বন্যাকবলিত উপজেলাগুলো হচ্ছে হবিগঞ্জ সদর, চুনারুঘাট, শায়েস্তাগঞ্জ, মাধবপুর ও নবীগঞ্জ। জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ বিভাগ সূত্র জানায়, এ পর্যন্ত ৮ হাজার ২৪০টি পরিবার পানিবন্দি ও ৩৩ হাজার ৪৬৮ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শামীম হাসনাইন মাহমুদ বলেন, ‘খোয়াই নদীর উৎপত্তিস্থল ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকার কারণে পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। গতকাল বেলা ৩টায় জেলা শহরের মাছুলিয়া পয়েন্টে খোয়াই নদীর পানি বিপদসীমার ১৯২ সেন্টিমিটার এবং সীমান্তের বাল্লা পয়েন্টে ২৭৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। আমরা ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে বালির বস্তা দিয়ে বাঁধ রক্ষার চেষ্টা করছি।’

অন্যদিকে শহরতলির জালালাবাদ গ্রামের পাশে খোয়াই নদীর বাঁধের ভাঙন দিয়ে প্রবল বেগে হাওরে পানি প্রবেশ করছে। ক্রমান্বয়ে ভাঙনটি বড় হচ্ছে। এ ছাড়া লস্করপুর ইউনিয়নে খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে যাওযায় বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। এ পর্যন্ত জেলায় ১১৬টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১৪০ জন আশ্রয় নিয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সূত্রে জানা গেছে, জেলায় এ পর্যন্ত ৯৩ হেক্টর রোপা আমনের বীজতলা, ১২০ হেক্টর আউশ ধান, ১২১ হেক্টর শাকসবজি বিনষ্ট হয়েছে।

হবিগঞ্জের বাঁধ ভেঙে কিশোরগঞ্জের হাওরে ঢুকছে পানি : সিলেট ও হবিগঞ্জ জেলার কয়েকটি বাঁধ ভেঙে কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন হাওরে প্রচ- বেগে ভারতের পানি ঢুকছে। এতে বন্যা দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছে জেলার হাওরাঞ্চলের ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম, নিকলী, করিমগঞ্জ ও তাড়াইল উপজেলাবাসী। এসব এলাকার নদনদীর পানি ঘণ্টায় ঘণ্টায় তীব্রবেগে বাড়ছে। ডুবছে আমন ধানের জমি।

কিশোরগঞ্জ হাওর উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মতিউর রহমান বলেন, হাওরে তীব্রবেগে পানি ঢুকছে। এতে নদনদীর পানিও বাড়ছে। তবে এখনো কোনো বন্যার পরিস্থিতি হয়নি।

কক্সবাজার : টানা কয়েক দিনের বৃষ্টি ও উজানের ঢলে কক্সবাজারে দুই শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়ে অন্তত তিন লাখ মানুষ পানিবন্দি। এসব এলাকার আঞ্চলিক ও গ্রামীণ সড়ক পানিতে ডুবে যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এ ছাড়া পানিতে ভেসে গিয়ে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল তাদের মৃত্যু হয়। নিহতরা হলেন রামু উপজেলার সাচিং মারমা (২৬) ও আমজাদ হোছন (২২)।

পেকুয়া-চকরিয়ায় লক্ষাধিক পরিবার পানিবন্দি : কক্সবাজারের পেকুয়া-চাকরিয়ায় অন্তত ২০ ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। সকাল থেকে পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টির কারণে মাতামুহুরী নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। চকরিয়ার হারবাং ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড গাইনাকাটা এলাকায় ভারী বর্ষণের ফলে ২০-২৫টি কাঁচা ঘর ধসে পড়ে। তবে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। এলাকার লোকজনকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে পেকুয়া ও চকরিয়া উপজেলা প্রশাসন থেকে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পাহাড়ের ঢালুতে অবস্থান করা লোকজনকে সরে যেতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

উপকূলীয় এলাকার পাঁচ ইউনিয়ন, বদরখালী, কোনাখালী, পশ্চিম বড় ভেওলা ও ঢেমুশিয়া এলাকায় পানি নিষ্কাশনে জলমহালের সøুইসগেট খুলে দেওয়া হয়েছে। এসব এলাকায় মৎস্যঘের, ধান ও সবজিক্ষেত পানির নিচে তলিয়ে যায়।

 

পানিবন্দি আড়াই লক্ষাধিক মানুষ, ত্রাণের জন্য হাহাকার : মৌলভীবাজারের কুলাউড়া, জুড়ী, কমলগঞ্জ, রাজনগর ও সদর উপজেলার বেশ কয়েকটি ইউনিয়নের অসংখ্য ঘরবাড়ি, গ্রামীণ সড়ক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তলিয়ে গেছে। এতে কমপক্ষে আড়াই লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া সড়কপথে সিলেটের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থাও বন্ধ হয়ে পড়েছে। তবে পানি কমতে শুরু করেছে বলে আশার খবর দিয়েছে পাউবো।

মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, জেলার মনু নদী (রেলওয়ে ব্রিজ) বিপদসীমার ৮৫ সেন্টিমিটার, চাঁদনীঘাট এলাকায় ১১৮ সেন্টিমিটার, ধলাই নদীতে ৩০ সেন্টিমিটার ও জুড়ী নদীতে বিপদসীমার ১৯৩ সেন্টিমিটার এবং কুশিয়ারা নদীর পানি বিপদসীমার ৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বন্যায় ২১২টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে ১৬টি, এতে আশ্রয় নিয়েছে ৪ হাজার ৩২৫ জন, মেডিকেল টিম রয়েছে ২৫টি। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ ছাদু মিয়া জানান, এখন পর্যন্ত আশ্রয়কেন্দ্রে গেছে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ। বন্যার্তদের সহায়তায় ১ হাজার ৫০ টন চাল ও ২৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

বাঁশখালীতে বাড়িঘর ও ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত : চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে অতিবৃষ্টি পাহাড়ি ঢলে বাড়িঘর ও ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে সাধনপুর ইউনিয়নের বাণীগ্রামে কাঁচা ঘরের দেয়াল ভেঙে মো. আমির হোসেন ও তার স্ত্রী হোসনে আরা বেগম (৫০) গুরুতর আহত হয়েছে। এদিকে ভারী বর্ষণে ও পাহাড়ি ঢলে বাঁশখালীর আটটি ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে প্লাবিত হয়ে কিছু বাড়িঘরে পানি ঢুকেছে। তার মধ্যে পুকুরিয়া, সাধনপুর, কালীপুর, বৈলছড়ি, পুঁইছড়ি, শীলকুপ, শেখেরখীল ও চাম্বল এলাকায় ১ হাজার ৭৫০ মানুষ পানিবন্দি এবং ক্ষতিগ্রস্ত ৮ হাজার ৭৫০ জন বলে জানান উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. মাহবুব আলম শাওন ভুঞা।

খুলনায় বেড়িবাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত : খুলনার পাইকগাছা উপজেলার দেলুটি ইউনিয়নের কালীনগর গ্রামে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ২০ মিটার বেড়িবাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে পাঁচ-ছয়টি গ্রামের পাঁচ সহস্রাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট, আমন ধানের বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভেসে গেছে পুকুর ও মাছের ঘের। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুল ইসলাম জানান, ইতিমধ্যে এক্সকাভেটর নিয়ে অপেক্ষা করা হচ্ছে। ভাটা হলেই বাঁধ মেরামত শুরু করা হবে।

প্রতিবেদনটি সংশ্লিষ্ট এলাকার নিজস্ব প্রতিবেদক, প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো তথ্যে তৈরি