অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে ডুবছে দেশের পূর্বাঞ্চল। গত ৩০ বছরের ইতিহাসে অল্প সময়ে এত অধিক বৃষ্টিপাত হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভারতের ত্রিপুরায় গোমতী নদীতে থাকা ডুম্বুর ড্যামের (বাঁধ) গেট খুলে দেওয়া। সব মিলিয়ে দেশের পূর্বাঞ্চলের নদীগুলোতে পানি বাড়ছে। নদীর ধারণক্ষমতা কম থাকায় লোকালয় ডুবিয়ে সাগরপানে ছুটেছে পানি। কালকের পর দেশের পূর্বাঞ্চল ও ত্রিপুরা এলাকায় বৃষ্টিপাত কমে গেলে বন্যার পানি দ্রুত নেমে যেতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা।
দেশের পূর্বাঞ্চলে গত ৩০ বছরের মধ্যে এমন বন্যা কেন হলো? এই ৩০ বছরেও তো বৃষ্টি হয়েছে, তাহলে বন্যা হয়নি কেন? গোমতী নদীর ওপর থাকা পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের ডু¤ু^র ড্যামের সিøপওয়ে খুলে দেওয়ার কারণে কি এ বন্যা দেখা দিয়েছে? এমন অসংখ্য মতের সঠিক কারণ খুঁজতে গিয়ে দেশ রূপান্তরের পক্ষ থেকে কথা হয় দেশসেরা পানিবিজ্ঞানী, পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলী ও আবহাওয়াবিদদের সঙ্গে। তাদের সবার অভিমত, কম সময়ে অতিবৃষ্টির কারণেই এ বন্যা। তবে এ বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হবে না। এ বন্যা পুরোপুরি প্রাকৃতিক উল্লেখ করে দেশসেরা পানিবিজ্ঞানী প্রফেসর ড. আইনুন নিশাত বলেন, ‘দেশের পূর্বাঞ্চল ও ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে অধিক বৃষ্টিপাতের কারণে পানি দ্রুত নেমে আসে। এর প্রভাবে ফেনী ও নোয়াখালীসহ পূর্বাঞ্চলের এলাকাগুলোতে বন্যা দেখা দিয়েছে।’
এ বন্যার সঙ্গে গোমতী নদীর উজানে ভারতের অংশে ডুম্বুর ড্যামের স্পিলওয়ে (পানি আটকে রাখার গেট) খুলে দেওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই বলে জানান ড. আইনুন নিশাত। তিনি বলেন, ‘গোমতী নদীর ওপরে থাকা ভারতের ড্যামের স্পিলওয়ে খুলে দেওয়া পুরোপুরি কারিগরি বিষয়। কাপ্তাই ড্যামের ভেতরে পানি বেড়ে গেলে যেমন স্পিলওয়ে খুলে দেওয়া হয়, তেমনিভাবে গোমতী নদীর ওপরে থাকা ড্যামের স্পিলওয়েও খুলে দেওয়া হবে, এটাই স্বাভাবিক। তবে এই স্পিলওয়ে খুলে দেওয়ার আগে সতর্কতা জারি করতে হয়। এই সতর্কতা ভারতের পক্ষ থেকে আমাদের জানানো হয়েছে কি না, সেটা বিবেচ্য বিষয়। বিষয়টি জানানো হয়েছে বলেই বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে কয়েক দিন ধরে বলা হচ্ছিল, নদীর পানি বাড়ছে এবং আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকেও ভারী বর্ষণের সতর্কতা দেওয়া হচ্ছিল।’
অতি বৃষ্টির কারণে ফেনী ও নোয়াখালী অঞ্চলে বন্যা হচ্ছে জানিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পূর্ব জোন) এনায়েত উল্লাহ বলেন, ‘উজানের বৃষ্টি এবং আমাদের স্থানীয় বৃষ্টির কারণে এ বন্যা। পাহাড়ি ঢলের মাধ্যমে নেমে আসা প্রবল পানির স্রোত আগে থেকে কোনো সতর্কতার জানান দেয় না। হঠাৎ নেমে আসে।’
গোমতী নদীর ওপর থাকা ডু¤ু^র ড্যামের স্পিলওয়ে খুলে দেওয়ার কারণে কোন এলাকায় প্রভাব পড়তে পারে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘গোমতী নদীর পানি বেড়ে যাবে। ইতিমধ্যে গোমতী নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একাংশে বন্যার পানি দেখা দিতে পারে।’
এ বছর আমাদের এলাকায় বৃষ্টিপাত বেশি হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে উল্লেখ করে সাউথ এশিয়ান মিটিওরোলোজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সম্পাদক ড. মোহন কুমার দাশ বলেন, ‘গত ৩০ বছরে যে বন্যা হয়নি তা এবার দেশের পূর্বাঞ্চলে দেখা দিয়েছে। অবশ্যই কম সময়ে অধিক বৃষ্টিপাত এর কারণ। কুমিল্লা, ফেনী, নোয়াখালীসহ ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টির পানি ভাটির দিকে নেমে আসায় পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে বন্যা দেখা দিয়েছে।’
বৃষ্টি কমবে কবে?
বৃষ্টি কমবে কবে? এ প্রশ্নের উত্তরে আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ড. সাদেকুল আলম বলেন, ‘দেশের পূর্বাঞ্চলে গত কিছুদিন ধরে ভারী বর্ষণ হচ্ছে। সেই সঙ্গে আমাদের দেশের বাইরে ভারতের ত্রিপুরা এলাকায়ও হচ্ছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে পূর্বাঞ্চলে বৃষ্টি কমে যাবে এবং বন্যার পানিও দ্রুত নেমে যাবে।’
পূর্বাঞ্চলে বৃষ্টি কমলেও দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ভারতের আসাম রাজ্যে (সিলেটের ওপারে) বৃষ্টির মাত্রা বাড়ছে বলে জানান সাদেকুল আলম।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের বক্তব্য
নদীর সমান্তরালে পানি উন্নয়ন বোর্ড যেসব বাঁধ তৈরি করেছিল, সেগুলোর অবস্থা খুবই নাজুক। ১৯৯৮ সালের বন্যার পর দেশের সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে তেমন একটা বন্যা দেখা যায়নি। ফলে নদীর উভয় তীরের বাঁধগুলোও পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি। নদীগুলোর গভীরতা কমে যাওয়া এবং নদীর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত খালগুলোও নালায় পরিণত হওয়া ঠেকাতে পারেনি সংস্থাটি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের পূর্ব জোনের অতিরিক্ত মহাপরিচালক এনায়েত উল্লাহ বলেন, ‘আমাদের নদীগুলোর গভীরতা বাড়ানো এবং বাঁধগুলো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একটি প্রকল্প তৈরি করছি। শিগগির তা মন্ত্রণালয়ে পাঠাব। দীর্ঘদিন বন্যা না হওয়ায় বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণ কাজে ধীরগতি দেখা দিয়েছিল। এ ছাড়া আমরা খালগুলোকেও পানি ধারণক্ষমতার উপযোগী করে গড়ে তুলব। বৃষ্টি কমে গেলেই বন্যার পানি নেমে যাবে। দেশের মধ্যাঞ্চলে বন্যা হলে দীর্ঘস্থায়ী হয় কিন্তু এই এলাকায় তা হওয়ার সুযোগ নেই।’
বাংলাদেশ নদী গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক (হাইড্রোলিক রিসার্চ) পিন্টু কানুনগো বলেন, ‘আমাদের পূর্ব সীমান্তের কুমিল্লা প্রান্ত দিয়ে গোমতী, সালদা, তিতাস, বিজলি, কাঁকড়ি, ঘুংঘুর ও ডাকাতিয়া নদী প্রবেশ করেছে এবং ফেনী প্রান্ত দিয়ে ফেনী নদী ও মুহুরী নদী প্রবেশ করেছে। এসব নদী দিয়ে উজানের পানি আমাদের দেশে নেমে আসে। তবে গোমতী বেসিনের পানি ফেনী এলাকায় আসার কোনো সুযোগ নেই। আবার ফেনী বেসিনের পানি কুমিল্লা এলাকায় যাওয়ার সুযোগ নেই। অতিবৃষ্টির কারণে ফেনীতে প্রবল বন্যা দেখা দিয়েছে। এলাকাটি ঢালু হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই বৃষ্টি কমে গেলে পানি দ্রুত নেমে যাবে।’
ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে গোমতী নদীর ওপর ডুম্বুর ড্যামটি বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত থেকে ১২০ কিলোমিটার উজানে। গোমতীর মতো ভারত থেকে ৫৪টি নদী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে এবং মিয়ানমার থেকে প্রবেশ করেছে দুটি নদী। দেশে ৫৬টি আন্তর্জাতিক নদী রয়েছে।